1. admin@gmail.com : দৈনিক আমার সময় : দৈনিক আমার সময়
  2. admin@dailyamarsomoy.com : admin :
বেকার প্রেমিক - দৈনিক আমার সময়

বেকার প্রেমিক

আমার সময় ডেস্ক
    প্রকাশিত : শনিবার, ১৯ আগস্ট, ২০২৩

অর্থশালী না হলে নিছক সুপুরষ হয়ে লাভ নেই। রোমান্সে একমাত্র অধিকার রয়েছে ধনীদের। বেকারদের এটা পেশা হতে পারে না। দরিদ্রদের থাকা চাই বাস্তবমুখী বুদ্ধি। তাদের সাংসারিক মনোহর হওয়ার চেয়ে স্থায়ী রোজগারী হওয়া অনেক ভালো। আধুনিক জীবনের এই মহান সত্য কথাগুলি রানা বর্তমানের মাথায় ঢুকত না। বেচারা রানার স্বীকার করতেই হবে সে বুদ্ধিবৃত্তির দিক থেকে কিছুই নয়। মানুষকে চমকে দিতে পারে জীবনে এমন একটা উঁচু দরের অথবা নীচু দরের কথাও রানা কখনো বলেনি। কিন্তু তাহলেও একথা আমাদের বলতে হবে যে চুলগুলো তার ঝাঁকড়া ও বেশ বড়, মাঝামাঝি মিষ্টি চেহারা, আর ধূসর নয় ঠিক কালো টাইপের চোখ নিয়ে তাকে দেখতে সত্যিই বড়ো চমৎকার। পুরুষ অথবা নারী সকলেই তাকে বেশ প্রশংসা করত, গুণ ছিল তার অনেক দোষ ছিল তার একটি–সে খুব একটা রোজগার করতে জানত না তবে অন্যায় দেখলে সত্যকে সত্য বলা আর খারাপকে খারাপ বলাই তার প্রথম কাজ । উত্তরাধিকারসূত্রে তার বাবা তাকে দিয়ে গিয়েছিলেন বাবার ব্যাবহারিত জামা আর সস্তা দামের জুতো। রানা খুব সম্মানের সহিত যত্ন করে তুলে রেখেছিল। বৃদ্ধাবস্থায় ব্যাবসায়ী বাবা তার জন্যে কিছু জমি ও ব্যাংকে নগদ কিছু টাকা ব্যবস্থা করেছিলেন তারই ওপরে নির্ভর করে সে জীবিকা নির্বাহ করছে। তবে রোজগারের চেষ্টা সে যে একেবারে করেনি তা নয়, অনেক করেছে– ছ’মাস ধরে সে স্টক এক্সচেঞ্জ-এ ঘুরেছে কিন্তু সিংহ আর বাঘের দলে সে একটা ছাগল ছাড়া আর কিছুই নয়? বেশ কিছুদিন ধরে সে নাটকে পডিউসে,র ব্যবসা করেছে কিন্তু রানা কিছুই করতে পারেনি। গোটা কয়েক নিউজ আর কিছু নতুন ছেলে মেয়েদের আবদার ছাড়া। তারপরে চেষ্টা করেছে মডেলিং, অভিনয় করার। তাতেও ফায়দা হয়নি কিছু। অবশেষে অভিমান করে সে সব কিছু করা ছেড়ে দিয়েছে। বর্তমানে একটি পরিপূর্ণ বেকার সুন্দর যুবক ছাড়া সে আর কিছু নয় মিষ্টার রানা বর্তমান।
বিপদের ওপরে বিপদ, এর মধ্যে রানা আবার প্রেমে পড়েছে মেয়েটির নাম কনা, অবসরপ্রাপ্ত আর্মির কর্নেলের একমাত্র মেয়ে। আরমিতে চাকরি করার ফলে ভদ্রলোক তাঁর মেজাজ আর হজমশক্তি দুটিই হারিয়েছেন আর তাদের হজম করার শক্তি ফিরে পাননি। কনা সত্যিই রানাকে বড়ো ভালোবাসে আর রানাও তার কপালে চুমু খাওয়ার জন্যে সব সময় প্রস্তুত হয়ে থাকত। আমার গল্পের চোখে এই ঢাকার শহরে রানা কনা তারাই ছিল সবচেয়ে সুন্দর নর আর নারী কিন্তু রানাকে ছেলে হিসেবে কর্নেল খুবই ভালোবাসতেন, আদরও করতেন তবে একমাত্র মেয়ের এই বিয়ের ব্যাপারে ছিল তাঁর ঘোরতর আপত্তি। তিনি বল্লেন: প্রিয় রানা বাবা!  তোমার নিজের ৩০/৫০ লাক্ষ টাকা ব্যাংকে জমলে আমার কাছে এসো। তখন ভেবেচিন্তে দেখা যাবে, আমার একমাত্র মেয়ে তোমার হাতে তুলে দেওয়া যায় কিনা। তবে হাতে সময় তোমার গোটা ৬মাস, এর মধ্যে কিছু একটা না করতে পারলে আমার মেয়েকে নিয়ে সোজা কানাডা চলে যাব। এই কথাই তিনি বলতেন আর রানা চিন্তিত হতেন।
একদিন বেসরকারী টিভি চ্যানেলের ইউটিউবে ব্যাতিক্রম ধর্মী মিউজিক ভিডিও দেখে চমকে গিয়েছিল রানা। সঙ্গীত শিল্পীর গায়কি, সুরের মধ্যে অন্যরকম উন্মাদনা ছিলো। রানা ভালো লাগাতে সঙ্গে সঙ্গে সঙ্গীত শিল্পী সামস ভাইকে রিকুয়েষ্ট পাঠালেন এবং একসেপ্ট করলেন। দুজনার সঙ্গে বেশ চ্যাট হয়, কথা হয় হঠাৎ একদিন তার বাসায় ইনভাইট করলেন সামস ভাই। রানাও হিসেব ছাড়া হাজির হলেন সামস ভাইয়ের গুলশান ২ এর বাসায়। লিফ্টে লেবেল ৪ এ পৌঁছানোর সাথে সাথে দুজন কেয়ারটেকার আমাকে রিসিভ করলো এবং একটি রুমে নিয়ে গেল। রুমে প্রবেশ করে দেখি পরিচিত একটি মেয়ে আর সামস ভাই। মেয়েটি স্বপ্নবাজ মিডিয়ায় ভাল একটি অবস্থান তৈরী করতে বেশ মরিয়া। পরিচয় করিয়ে দিলো সামস ভাই রানাকে, ভাই ও হচ্ছে আমার বান্ধবী এবং আমার প্রিয় কুকার। অসাধারণ রান্না করে। রানাও হায় দিয়ে বললো আপু আমার পূর্বের পরিচিতা তারপর বেশ আড্ডা হচ্ছে আমাদের দুজনার কথাকোপথন চলছে এর মধ্যেই কেয়ারটেকার একটি শুকনো নারকেলের মধ্যে বরফের টুকরো নিয়ে আসলো বিআর পান করার জন্য। সামস ভাই বল্লো এটা আমার আইডিয়া, এখানে আইচ একদমই গলে না। আমরা সবাই মিলে পান করছি। ঘন্টাখানেক পর দেখলাম আসলেই বরফের টুকরো গুলো একদমই গলেনি। বিআরটা নরমাল ডিংক্স ছিলো, অনেকে ভাবছেন এটা নেশাজাতীয় কোন পানিয়। অবশ্যই না, ১০০% নরমাল পানিয় । যেযারমত করে পান করছে আর গল্প হচ্ছে সবার সঙ্গে, মাঝে মাঝে সামস ভাইয়ের গাওয়া চমৎকার কিছু ইংলিশ গান বাজানো হলো। গান গুলো রানার ভিষন ভালো লাগলো, আর ড্রিংক করার পর তার সুর আর গায়কি অন্য একমাত্র যোগ করে অবশ্য এখনো তার গানের মূচ্ছনায় রানা বিভোর। এরপর রাতের ডিনার শেষে বের হয়ে পরলো সামস ভাইয়ের বাসা থেকে অর্থাৎ গুলশান ২ থেকে সরাসরি নিকেতনে চলে এলেন রানা। নিকেতন থেকে হাতিরঝিল যাচ্ছে, হাতিরঝিলের দিকে যাওয়ার পথে বিপাশার সঙ্গে দেখা করার জন্যে সে নেমে পড়ল। বিপাশা ছিল তার প্রাণের বন্ধু আর বিপাশা এই রাজধানীর একজন নামকরা ফটোগ্রাফার। অবশ্য আজকাল অনেকেই ছবি তোলে কিন্তু সে ছিল একজন চৌকস আর্টিস্ট।
এমন গুনি আর্টিস্টরা সচরাচর বড়োই বিরল। ব্যক্তিগতভাবে বিপাশাকে অত্যন্ত রুষ্ক প্রকৃতির বলে মনে হবে। ভুরু ডোড়াটা থাকত তার সব সময় কুঞ্চিত চোখদুটো ছিল লাল–আর অযত্নবর্ধিত। সে যাই হোক, একবার লেন্স আর ক্যামেরা হাতে নিলে ব্যস, একেবারে দুহষ্ক ফটোগ্রাফার সে। সে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে চ্যাম্পিয়ন ফটোগ্রাফার তা ছাড়া কর্পোরেট পাবলিকের বাজারে তার ছবির-ও বেশ কদর ছিল, একথা অনস্বীকার্য । রানার মাঝামাঝি সুন্দর চেহারার জন্যে প্রথম প্রথম সে রানার প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিল। সে বলত–একমাত্র মূর্খ আর সুন্দর মানুষদেরই ফটোগ্রাফারদের চেনা উচিত। ফুলবাবু আর মনোহরণকারীরাই পৃথিবী শাসন করে অন্তত করা উচিত। তারপরে রানার সঙ্গে ভালোভাবে পরিচয় হওয়ার পর থেকেই তার উচ্ছল স্বভাবের জন্যে তাকে তার ভালো লাগত। কিন্তু রানা ভেতরে ঢুকেই দেখল বিপাশা একটি অপরূপ প্ৰমাণ মাপের ভিক্ষুকের ছবির তুলছে স্টুডিয়োর এক কোণে একটি উঁচু বেদীর ওপরে স্বয়ং ভিক্ষুক মডেল হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। তার মুখের চামড়া চুপসে গিয়েছে, বার্ধক্যের ছাপ পড়েছে তার সর্বাঙ্গে, তার সারা দেহের ওপরে করুণ আর্তির একটা মূৰ্জনা ছড়িয়ে পড়েছে। তার কাঁধের ওপরে চাপা রয়েছে একটা ডো ময়লা চাদর। তার মোটা কুর্তা তালি আর তাপ্তিতে ভরে উঠেছে। একটা হাত দিয়ে সে ছবির ওপরে ভর করে রয়েছে, আর একটা হাতে ডো টুপিটা বাড়িয়ে দিয়েছে ক্যামেরা লেন্সের ভ্যাল্কির আশায়। বন্ধুর সঙ্গে করমর্দন করে রানা বলল–কী অদ্ভুত মডেল! খুব জোরে চিৎকার করে উঠল বিপাশা–অদ্ভুত মডেল? আমারও তাই ভাবা উচিত। এইরকম ভিক্ষুকের দেখা রোজ পাওয়া যায় না। এটাই আমার নতুন আবিষ্কার! হায় মহান, সম্মানিত সুনিল কুমার দত্ত এনাকে পেলে কী অদ্ভুত ছবিই না তুলতেন?
রানা বলল: হতভাগ্য মানব! কী করুণই না দেখাচ্ছে ওকে। কিন্তু মনে হচ্ছে তোমার মতো ফটোগ্রাফারের কাছে ওর মুখটাই ওর সৌভাগ্য বয়ে আনবে।
বিপাশা বলল: নিশ্চয়! কোনো ভিক্ষুক সুখী হোক তা তুমি নিশ্চয় চাও না! চাও কি?
আরাম করে বসে রানা জিজ্ঞাসা করল–এইরকম মডেল হওয়ার জন্যে ওরা কত করে পায়?
পায় ৫/৬ শত টাকা সঙ্গে এক প্যাকেট সিগারেট।
রানাঃ এই ছবিটার জন্যে তুমি কত পাবে?
তা বলা মুশকিল তবে ৫০’হাজার থেকে ১ লাখ?
জনপ্রিয় অভিনয় শিল্পী, চিত্রকর, কবি, আর ডাক্তাররা সব সময় একটু বেশি পায়।হাসতে-হাসতে রানা বলল–আমার মনে হয় তার একটা ভাগ অভিনয় শিল্পী ও মডেলদেরও পাওয়া উচিত। তাদেরও তোমাদের মতো কঠোর পরিশ্রম করতে হয়। বোকা কোথাকার! সারাদিন  ক্যামেরার সামনে দাঁড়িযে লেন্স, লাইট, মেকআপ নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করাটা যে কী কষ্টকর সেটা তোমার ভেবে দেখা উচিত। আমার মনে হয় বন্ধু রানা, ফটোগ্রাফী মাঝে মাঝে মাটি কোপানোর মতো পরিশ্রম পরিণত হয়। কিন্তু এখন আর বকবক করো না। চুপচাপ সিগারেট খাও। বর্তমানে খুব ব্যস্ত রয়েছি আমি।
কিছুক্ষণ পরে চাকর এসে সংবাদ দিল একজন ছবি বাঁধাইকারী তার সঙ্গে দেখা করতে চায়।
বেরিয়ে যেতে-যেতে বিপাশা বলল–বন্ধু রানা, তুমি পালিয়ে যেও না-আমি এখুনি আসছি।
বিপাশা বেরিয়ে যেতেই বৃদ্ধ ভিক্ষুকটি একটু বিশ্রাম নেওয়ার জন্যে তার পেছনে রাখা একটা বেঞ্চের ওপরে একটু বসল। তাকে এত দুঃখী আর অবসন্ন মনে হল যে তার ওপরে কেমন যেন মায়া হল রানার। সঙ্গে সঙ্গে সে তার পকেটে হাত দিয়ে দেখল মাত্র একটি ১০০টাকার নোট আর কিছু চকলেট রয়েছে তার পকেটে। নিজের মনে-মনেই সে বলল–বৃদ্ধ দরিদ্রর আমার চেয়ে ওর প্রযোজনটাই বেশি–যদিও এর অর্থ হচ্ছে হেঁটেই আমাকে বাড়িতে ফিরতে হবে।
এই ভেবে তার দিকে এগিয়ে গিয়ে ভিক্ষুকের হাতে ১০০টাকা গুঁজে দিল সে। বৃদ্ধটি চমকে উঠল, একটা ছোট্ট হাসি খেলে গেল তার শুকনো ঠোঁটের ওপরে। সে বলল–ধন্যবাদ স্যার, ধন্যবাদ! অবশেষে রানা পকেটের সবশেষ থাকা ১০০ টাকা ভিক্ষুক কে দেওয়াতে পকেট শূন্য তাই পায়ে হেঁটে বাসায় ফিরতে হয়।
কয়েক দিন পর, সেইদিনেই সন্ধের সময় প্রায় এগারোটা নাগাদ সে বেড়াতে-বেড়াতে গুলশানের প্রেসিডেন্ট ক্লাবে হাজির হল। দেখল, ধূমপানের ঘরে বিপাশা বসে মদ খাচ্ছে।
একটা সিগারেট ধরিযে রানা বলল–ছবিটা বাঁধানো হয়ে গিয়েছে তো হে?
বিপাশা বলল–হয়েছে। হ্যাঁ শোন, তোমারই তো লাভ হয়েছে বেশি। সেই বৃদ্ধ মডেলটির খুব ভালো লেগেছে তোমাকে। তাকে তোমার বিষযে সব কথাই আমাকে বলতে হয়েছে। তোমার আয় কত, ভবিষ্যৎ কী-ইত্যাদি ইত্যাদি…

চেঁচিয়ে উঠল রানা-বল কী হে? বাড়ি গিয়ে আমি হয়তো দেখব আমার জন্যে সে অপেক্ষা করে বসে আছে। অবশ্য তুমি ঠাট্টা করছ। হতভাগ্য বৃদ্ধ! ইচ্ছে যায় তার জন্যে আমি কিছু করি। আমার ধারণা, এই রকম দারিদ্র যে-কোনো মানুষের পক্ষেই বিপজ্জনক। বাড়িতে আমার অনেক পুরনো পোশাক রয়েছে। তোমার কি মনে হয় সেগুলোর কিছু তার পছন্দ হবে? ওর পোশাক ছিঁড়ে একেবারে কুটিকুটি হয়ে গিয়েছে।
বিপাশা বলল–কিন্তু ওই পোশাকেই ওকে বড়ো চমৎকার দেখায়। ফ্ৰককোট পরলে কেনো। কিছুর মোহেই আমি ওর ছবি তুলতে যেতাম না। তুমি যাকে ডো পোশাক বল তাকেই আমি বলি রোমান্স। তোমার কাছে যেটাকে দারিদ্র্য বলে মনে হয় আমার কাছে সেইটাই অপরূপ সুন্দর। যাই হোক, তোমার এই প্রস্তাব তাকে জানাব।
রানা বেশ গম্ভীরভাবেই বলল– ফটোগ্রাফাররা বড়োই নিষ্ঠুর।
বিপাশা বলল–আর্টিস্টের হৃদয় হচ্ছে তাদের মাথা। আর তাছাড়া, আমাদের ব্যবসাটাই হচ্ছে পৃথিবীটি যে রকম ঠিক সেই রকম ভাবেই তাকে দেখা। তাকে সংস্কার করা আমাদের কাজ না। প্রত্যেক মানুষকেই তার নিজের নিজের ব্যবসা দেখতে হবে। এখন বল, তোর প্রেমিকা কেমন আছে। বৃদ্ধ মডেলটি তার সম্বন্ধে অত্যন্ত উৎসুক হয়ে উঠেছে তার কাছে  তোমার প্রেমিকা সম্বন্ধে তুমি আলোচনা করে একথা নিশ্চয়ই তুমি বলছ না?
নিশ্চয় বলছি। দুর্দান্ত কর্নেল, সুন্দরী কনা, আর করনেলের  শর্তানুযায়ী ২০/৩০ লাক্ষ টাকার কথা –এই সমস্ত কথা সে জানে।
রেগে লাল হয়ে উঠল রানা–আমার সব ঘরোয়া কথা তুমি একজন ভিক্ষুক কে বলেছ? এটা তোর বলা ঠিক হলো! রানা রেগেমেগে একাকার।
বিপাশা হেসে বলল–প্রিয় বৎস, ওই বৃদ্ধ ভিক্ষুকটি হচ্ছেন বিশ্বের একজন শ্রেষ্ট ধনী। ব্যাঙ্কের কাছ থেকে কোনো ধার না করেই কালই তিনি গোটা ঢাকার শহরটা কিনে ফেলতে পারেন। প্রতিটি বিভাগে তাঁর একটি করে বিলাস বহুল বাড়ি রয়েছে, সোনার প্লেটে তিনি খান এবং ইচ্ছা হলে রাশিয়াকে যুদ্ধ থেকে নিবৃত্ত করাতে পারেন।
বিস্ময়ে চিৎকার করে উঠল রানা-কী বলছ তুই?
বিপাশা বলল–আমি বলতে চাই আজ সকালে আমার স্টুডিওতে যে ভিক্ষুকটিকে তুমি দেখছিলে তিনি হচ্ছেন সুলতান বিন সমশের। তিনি আমাকে ও আমার কাজকে ভিষন পছন্দ করেন। তিনি আমার খুবই ভালো বন্ধু, আমার প্রায় সব ছবিই তিনি কেনেন; কানাডায় তার স্টুডিও আছে সেখানে বিক্রি হলে তার ওপরে একটা ভাগ কমিশন হিসাবে আমাকে তিনি দেন। মাসখানেক আগে ভিক্ষুকের বেশে তাঁর কিছু ছবি তোলার কথা তিনি আমাকে বলেছিলেন। লাখপতির একটা খেয়াল বলতে পার। তাঁর ওই ছিন্ন পোশাকে তাঁকে বেশ চমৎকারই দেখাচ্ছিল, অথবা, বলতে পার আমারই দেওয়া ছিন্ন পোশাক। ওগুলো আমি গুলিস্তান থেকে সংগ্রহ করেছিলাম।
চিৎকার করে উঠল রানা– সুলতান বিন সমশের! সেতো পৃথিবীর ১০ জন ধনির মধ্যে একজন, হায় আল্লাহ! তাঁকেই আমি একটা ১০০ টাকা দিয়েছি? এই বলেই হতাশায় সে চেয়ারের উপরে ঢলে পড়ল।
চিৎকার করেই হো-হো হেসে উঠল বিপাশা বল কী হে! তাঁকে দিয়েছিস ১০০ টাকা! ওটিকে তুমি আর দেখতে পাবে না। তাঁর কাজই হলো অন্য মানুষের টাকা নিয়ে কারবার করা।
একটু বিমর্ষ হয়ে রানা বলল–একথা আমাকে তোমার আগেই বলা উচিত ছিল বিপাশা। তাহলে এরকম বোকা বনে যেতে হত না আমাকে।
বিপাশা বলল–প্রথমত আমি জানতাম না এইভাবে বেপরোয়া তুমি অর্থনষ্ট করো। একটি সুন্দরী মডেলকে টাকা না দিয়ে, তুমি চুমু না খেয়ে- তুমি একটা কুৎসিত ভিক্ষুককে ১০০ টাকা দান করবে! ছি ছি! তাছাড়া, আজকে কেউ আমার সঙ্গে দেখা করুক তা আমি চাইনা, তুমি আসার পরে সমশের তাঁর নাম তোমার কাছে প্রকাশ করতে চান কিনা তাও আমি জানতাম না।
রানা বলল–আমাকে তিনি কী মনে করলেন বল তো?

কিছুই মনে করেননি। তুমি চলে যাওয়ার পরে তাঁকে বেশ স্ফুর্তি করতে দেখলাম। তিনি তোমার সম্বন্ধে এত কথা জানতে চাইলেন কেন তা আমি বুঝতে পারলাম না কিন্তু এখন আমি সব বুঝতে পারছি। তিনি তোমার ওই ১০০টাকা ব্যবসায় খাঁটিয়ে প্রতি দু’মাস অন্তুর তোমাকে তার সুদ দিয়ে যাবেন আবার ডিনারের পরে এই নিয়ে বেশ মুখরোচক গল্প বলতে বসবেন।
রানা গড়গড় করে বলল–হা হতোস্মি! এখন সবচেয়ে বড়ো কাজ হচ্ছে বাড়ি গিয়ে ঘুমিয়ে পড়া। কিন্তু ভাই, একথা তুমি যেন আর কাউকে বলো না। তাহলে আমি লজ্জায় একেবারে মারা যাব। বোকা কোথাকার! পরোপকার করার সহযোগিতা করা যে কত বড়ো ইবাদত তা এই ঘটনা থেকেই প্রমাণ পাওয়া যাবে। পালিয়ে যেওনা। আর একটা সিগারেট ধরাও। সিগারেট খেতে-খেতে কনা সম্বন্ধে যত ইচ্ছা বলে যাও।
কিন্তু রানাকে ধরে রাখা গেল না। বিপাশা হো-হো করে হাসতে লাগল। তাকে সেই অবস্থায় হোটেলে ফেলে রেখে সে দুঃখিত মনে বাড়ি গেল। পরের দিন সকালে সে ব্রেকফাস্টের টেবিলে বসেছিল এমন সময় চাকর একটা কার্ড নিয়ে হাজির হল। কার্ডের ওপরে চোখ বুলিয়ে সে বুঝতে পারল সুলতান বিন সমশেরের কাছ থেকে একটি ভদ্রলোক তার সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন। সোনার চশমা পরা শ্বেত মস্তকের একটি বৃদ্ধ ভদ্রলোক তার ঘরে এসে জিজ্ঞাসা করলেন–আমি কি রানা বর্তমানের সঙ্গে কথা বলছি?
রানা তার মাথা নোয়াল।
আমি সুলতান বিন সমশেরের কাছ থেকে এসেছি। আমি রাফি…
রানা আমতা আমতা করে বলল–আপনি দয়া করে সমশেরকে বলবেন যে আমি অত্যন্ত দুঃখিত…বৃদ্ধ ভদ্রলোক একটু হেসে বললেন–সুলতান বিন সমশের স্যার আমাকে এই চিঠিটি দিয়ে আপনার কাছে পাঠিয়েছেন–এই বলে বন্ধ করা খামখানা তার দিকে এগিয়ে দিলেন। খামের বাইরে লেখা ছিল–”একটি বৃদ্ধ ভিক্ষুকের কাছ থেকে রানা বর্তমান ও কনার বিবাহে কন্যার বাবার শত দেওয়া যৌতুক”। ভেতরে ছিল ২০ লাক্ষ টাকা-এর একটি চেক। রানার চোখ গড়িয়ে পানি পড়ছে ….
রানা বর্তমান
সাহিত্যিক ও নির্মাতা

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও পড়ুন
© All rights reserved © dailyamarsomoy.com