উত্তরাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ জেলা রংপুর-এ দিন দিন বাড়ছে বহুতল ভবন নির্মাণ ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন কার্যক্রম। ফলে নির্মাণসামগ্রী হিসেবে বালুর চাহিদা যেমন দ্রুত বাড়ছে, তেমনি উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে অবৈধ বালু উত্তোলন। জেলার বিভিন্ন নদ-নদী থেকে অনুমোদন ছাড়াই বালু উত্তোলনের কারণে পরিবেশ, কৃষি ও জনপদের ওপর পড়ছে মারাত্মক প্রভাব।
রংপুর অঞ্চল সূত্রে জানা গেছে, যমুনেশ্বরী নদী, ঘাঘট নদী ও করতোয়া নদীসহ বিভিন্ন নদী থেকে দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন চলছে। বিশেষ করে মিঠাপুকুর উপজেলা-এর পলিপাড়া, আটপুনিয়া, হাছিয়া এবং পায়রাবন্দ এলাকায় ড্রেজার ও ভেকু মেশিন ব্যবহার করে প্রতিদিন শত শত ট্রাক বালু তোলা হচ্ছে। একইভাবে বদরগঞ্জ উপজেলা-সহ বিভিন্ন এলাকায় নদী খননের নামে উত্তোলিত বালু অবৈধভাবে বিক্রির অভিযোগও রয়েছে।
অবৈধ বালু উত্তোলনের ফলে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে এবং তীরবর্তী এলাকায় ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করছে। এতে ফসলি জমি, বসতবাড়ি এবং গুরুত্বপূর্ণ সড়ক হুমকির মুখে পড়ছে। ইতোমধ্যে অনেক পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে রংপুর অঞ্চলের মানুষেরা জানিয়েছেন। কিছু ক্ষেত্রে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে এই অবৈধ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের প্রভাবের কারণে সাধারণ মানুষ প্রতিবাদ করেও কার্যকর প্রতিকার পাচ্ছেন না। প্রতিবাদ করা অনেক ব্যক্তিকে হত্যাও করেছে বালু সিন্ডিকেটেরা।
প্রশাসনের পদক্ষেপ থাকলেও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে নয় জেলা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে। বিভিন্ন স্থানে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে জরিমানা এবং ড্রেজার মেশিন জব্দ করা হলেও অবৈধ উত্তোলন পুরোপুরি বন্ধ করা যাচ্ছে না। বালু সিন্ডিকেটদের বিরুদ্ধে মামলাও দায়ের করা হচ্ছে, তবে বাস্তব পরিস্থিতিতে কাঙ্ক্ষিত ফল আসছে না বলে জানা গেছে।এই বালু সিন্ডিকেট থেকে রক্ষা পেতে হলে, বাংলাদেশে বালু উত্তোলন কার্যক্রম পরিচালিত হয় বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০ (সংশোধিত ২০২৩) অনুযায়ী। এই আইনে নির্ধারিত বালুমহাল থেকে উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে ইজারা দিয়ে বালু উত্তোলনের বিধান রয়েছে, যা জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিকল্পিতভাবে নির্দিষ্ট স্থানকে বালুমহাল ঘোষণা করে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় ইজারা প্রদান করলে অবৈধ উত্তোলন অনেকাংশে বন্ধ করা সম্ভব হবে। এতে একদিকে যেমন সরকারের রাজস্ব আয় বাড়বে, অন্যদিকে পরিবেশগত ক্ষয়ক্ষতি কমবে।বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড-এর রংপুর কার্যালয়ের মতে
“নদী ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশ সুরক্ষা আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা নিয়মিত মনিটরিং করছি এবং জেলা প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধে কাজ করছি। পরিকল্পিতভাবে বালুমহাল নির্ধারণ ও ইজারা প্রদান করা হলে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় থাকবে এবং ক্ষয়ক্ষতি কমে আসবে।”
তারা আরও জানান, বৈধভাবে বালু উত্তোলন নিশ্চিত করা গেলে অবৈধ সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য কমবে এবং সরকারের রাজস্ব আয় উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাবে।
স্থানীয় অভিজ্ঞমহল ও বিশ্লেষকরা দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছে। তাদের মতে
নির্ধারিত নদীখাতকে বালুমহাল ঘোষণা
স্বচ্ছ দরপত্র প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ইজারা প্রদান
কঠোর নজরদারি ও আইন প্রয়োগ করলে
জনসচেতনতা বৃদ্ধি পাবে অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ হবে। রংপুরে ক্রমবর্ধমান অবৈধ বালু উত্তোলন শুধু পরিবেশ নয়, জনজীবন ও অর্থনীতির জন্যও হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই পরিকল্পিতভাবে বালুমহাল ইজারা প্রদান, কঠোর আইন প্রয়োগ এবং প্রশাসনিক তদারকি জোরদার করা এখন সময়ের দাবি। এতে একদিকে যেমন নদী ও জনপদ রক্ষা পাবে, অন্যদিকে সরকারের রাজস্ব আয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।
Leave a Reply