1. admin@gmail.com : দৈনিক আমার সময় : দৈনিক আমার সময়
  2. admin@dailyamarsomoy.com : admin :
ধৈর্য ও সহনশীলতার প্রতীক : বঙ্গমাতা - দৈনিক আমার সময়

ধৈর্য ও সহনশীলতার প্রতীক : বঙ্গমাতা

এইচ এম মেহেদী হাসান
    প্রকাশিত : মঙ্গলবার, ৮ আগস্ট, ২০২৩
মহীয়সী নারী বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা। যাঁর ডাক নাম ছিল রেণু। রেণু নামেই প্রিয়জনেরা ডাকতেন।
স্বাধীন বাংলাদেশের মহান স্হপতি, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনসঙ্গিনী শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছায়াসঙ্গী ছিলেন বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব। বঙ্গবন্ধুর   জাতি রাষ্ট্রের মহান স্রষ্টা হয়ে ওঠার নেপথ্যকারিগর শেখ ফজিলাতুন্নেছা। তিনি বঙ্গবন্ধুর সাহস, অনুপ্রেরণা, সুখ-শান্তি, ভালোবাসার এক অনন্য সহযাত্রী হয়ে ছিলেন সারাটা জীবন।
ভাষা আন্দোলন এবং মহান মুক্তিযুদ্ধে বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের বলিষ্ঠ ভূমিকা ছিল। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী,  আমার দেখা নয়াচীন, কারাগারের রোজনামচা এবং গোয়েন্দা খন্ড
( সিক্রেট ডকুমেন্ট) ‘ থেকে জানতে পাড়ি।
শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব ( রেণু)  নিজের জীবনে চাওয়া – পাওয়াকে তুচ্ছজ্ঞান করে, সমস্ত লোভ- লালসার ঊর্ধ্বে ওঠে স্বামী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শকেই বুকে ধারণ করে জীবনযাপন করেছিলেন।
তিনি নিজেকে সঁপে দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন- স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের অর্জনে। তাঁর আত্মত্যাগ সমস্ত দুনিয়ার নারী জাতির জন্য এক বিরল ঘটনা।
ইতিহাসের পাতায় আমরা দেখি পুরুষ সংগ্রাম করে সাফল্য অর্জন করে। কিন্তু তার সাফল্যের পিছনে কী কী শক্তি কাজ করে, তার তেমন উল্লেখ থাকে না। আর এ বিষয়টি নিয়ে তেমন গবেষণা বা লেখালেখিও হয় না। যে কোনো সংগ্রাম ও সাফলতা অর্জনের সঙ্গে যাঁরা শক্তি, সাহস ও প্রেরণা দিয়ে থাকেন, যাঁরা মহান ত্যাগ স্বীকার করেন, তাঁদের বিষয়ে খুব বেশি আলোচনাও হয় না। (মুজিব বাংলার বাংলা মুজিবের – শেখ হাসিনা) ।
আমাদের স্বাধীনতা একদিনে আসেনি। এই জন্য দীর্ঘ সময়, বহু ত্যাগ-তীতিক্ষা, এক সাগর রক্ত দিতে হয়েছিল। আর এ স্বাধীনতা অর্জনের পথে অনেকগুলো বাঁধা-বিপত্তি অতিক্রম করতে হয়েছে।
বিশেষ করে এক একটি সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাইট টাইমে রাইট ডিসিশন  নিতে না পারলে সাকসেস অ্যাসিভ করা অসম্ভব। আর এজন্য প্রয়োজন হয় বিশ্বস্ত বন্ধু/ সঙ্গীর। বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একান্ত বিশ্বস্ত বন্ধু / সঙ্গী / সাথী, পরামর্শক।
মহীয়সী নারী শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব নিজের জীবনকে সম্পূর্ণভাবে উৎসর্গ করেছিলেন দেশমাতৃকার মুক্তির সংগ্রামে।
শেখ হাসিনা রচিত ‘ মুজিব বাংলার বাংলা মুজিবের গ্রন্থতে উল্লেখ করেছেন –
‘ তাঁর ছোটবেলার কথাই যদি ধরি – সে এক দুঃখের কাহিনী। খুব ছোট বয়সে পিতা-মাতা ও দাদাকে হারিয়ে আশ্রয় পেয়েছিলেন শ্বশুরবাড়ি। তিন বছর বয়সে বাবাকে এবং পাঁচ বছর বয়সে মা’কে হারিয়েছেন। বাবা-মাকে হারাবার পর দাদার কোলে আশ্রয় পান। দাদা দুই নাতনিকে বিয়ে দিয়ে তাঁর সমস্ত সম্পত্তি তাঁদের দান করে দেন।কিন্তু সাত বছর বয়সে দাদাও চলে যান না ফেরার দেশে। ছোট রেণুকে কোলে তুলে নেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের মা, তাঁর শাশুড়ি।
বাড়িতেই গৃহ শিক্ষকের কাছেই তাঁর পড়ালেখা শুরু। সে যুগে টুঙ্গিপাড়া গ্রামে মেয়েদের স্কুলে যাওয়ার সুযোগ ছিল না। ধারে-কাছে স্কুলও ছিল না। কিন্তু পড়ালেখার প্রতি ছিল রেণুর প্রচণ্ড আগ্রহ। সারা জীবন তিনি জ্ঞান অর্জনের চেষ্টা চালিয়ে গেছেন। তিনি প্রচুর বই পড়তেন, বই কিনতেন। ‘
সংসারের সমস্ত কাজের শিক্ষা পেয়েছেন শাশুড়ি ( শেখ সায়েরা খাতুনের)  কাছ থেকে। বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব ছিলেন অসীম ধৈর্য, সৎ সাহস, বলিষ্ঠ নেতৃত্বগুণ এবং সহনশীলাতার প্রতীক।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সহযোগিতা করা শুরু করেন জীবনের সূচনালগ্ন থেকে। নিজের জমি থেকে প্রাপ্ত অর্থ জমিয়ে রেখে স্বামী শেখ মুজিবের হাতে তুলে দিতেন, নিজের জন্য খরচ করতেন না। কারণ, তিনি দেখেছেন স্বামী শেখ মুজিবুর রহমান ছাত্রজীবন থেকে রাজনীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আর সে রাজনীতি এ দেশের জনগণের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য।
বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব ( রেণু) নিজের সন্তানদের নিয়ে গ্রামের বাড়িতেই শ্বশুর -শাশুড়ির সঙ্গে থাকতেন।
১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে তথাকথিত দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে ভারত পাকিস্তান দেশ ভাগ হয়। তখন তরুণ নেতা শেখ মুজিবুর রহমান
 কলকাতা থেকে দেশে ফিরে আসেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে ভর্তি হন। ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দের ৪ জানুয়ারি তিনি ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠা করেন এবং ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দের ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। উল্লেখ পূর্বক বলতে হয় ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপট তরুণ নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বেই সংগঠিত হয়।
শেখ মুজিবের নির্দেশনায় ছাত্রলীগ অগ্রণী ভুমিকা পালন করে।
১৯৫৪ খ্রিস্টাব্দের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যুক্তফ্রন্টের প্রার্থী হয়ে প্রাদেশিক পরিষদে বিপুল ভোটে বিজয়ী হন। শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের মন্ত্রিসভার সদস্য হন  শেখ মুজিবুর রহমান। তিন সন্তানসহ বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব ( রেণু) কে ঢাকায় নিয়ে আসেন। স্বামী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব এই প্রথমবারের মতো সংসার পাতার সুযোগ পান। মিন্টু রোডের সরকারি বাড়িতে উঠেন সপরিবারে। বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের জীবনের স্বপ্ন পূরণের অধ্যায় শুরু। তবে সেই সুখ বেশিদিন তাঁর ভাগ্যে রইলো না। জরুরী ঘোষণা, ৯২ক ধারা জারি করে, মন্ত্রিসভা ভেঙে দিয়ে পাকিস্তানি শাসকেরা পূর্ব বাংলায় কেন্দ্রের শাসন বলবৎ করে।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেফতার করা হয়। মাত্র পনেরো দিনের নোটিশে সরকারি বাড়ি ছাড়তে হলো। সে এক কঠিন সময়ের সম্মুখীন হয় বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব। অসীম ধৈর্য এবং সাহস নিয়ে তিনি ঢাকায় থাকার সিদ্ধান্ত নিলেন। কারাগারে বন্দি স্বামী শেখ মুজিবুর রহমানকে অন্তত পনেরো দিন পর পর দেখতে পাবেন।
১৯৬২ খ্রিষ্টাব্দে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেন। সশস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমে দেশ স্বাধীন করার সংকল্প গ্রহণ করেন এবং এ বিষয়ে কিছু উদ্যোগও নেন। কিন্তু তিনি গ্রেফতার হয়ে যান। একমাত্র বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব ( রেণুই) এ বিষয়ে সব জানতেন। স্বামী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যেদিন এ সংকল্প নিয়ে ঘর ছেড়ে চলে যান তখনও তিনি তাঁকে বাধা দেননি। বরং সবকিছু গোপন রেখেছিলেন। কারণ বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব জানতেন তাঁর স্বামী শেখ মুজিবুর রহমান যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন সেই সিদ্ধান্ত মোতাবেকই একদিন দেশ স্বাধীন হবে, এতে বিন্দু পরিমাণও ঘাটতি নেই।
বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের বিশ্বাসই পরবর্তীতে অক্ষরে অক্ষরে সত্যি প্রমাণিত হয়।
বাঙালির প্রাণের দাবি ছয়-দফা নিয়ে যখন আন্দোলন শুরু হয়, এর এক পর্যায়ে পাকিস্তান থেকে কিছু নেতা ও পূর্ব বাংলার কয়েকজন নেতা মিলে ৬- দফার পরিবর্তে ৮-দফা প্রস্তাব নিয়ে তোড়জোর শুরু করেন। তখন ইস্পাত কঠিন দৃঢ়তা দেখিয়ে বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব ( রেণু) ৬- দফার পক্ষে দাঁড়ান। তাঁর যুক্তি ছিল এই ৬- দফা দিয়েই শেখ মুজিবুর রহমান কারাগারে। এই ৬-দফার জন্য শ্রমিক – জনতা রক্ত দিয়েছে। কাজেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে জেলে বন্দি রেখে
 ৬- দফার দাঁড়ি, কমা, সেমিকোলনও পরিবর্তন করা যাবে না। ৮- দফাকে কিছুতেই সামনে নিয়ে আসা যাবে না।
 (মুজিব বাংলার বাংলা মুজিবের – শেখ হাসিনা) ।
কারাগারে বন্দি থাকাবস্হায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা দেওয়া হয়। তাঁকে কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মুক্তি দিয়ে পুনরায় জেল গেট থেকে গ্রেফতার করে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে বন্দি করা হলো।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তি এবং বাঙালির মুক্তির সনদ ৬-দফা দাবির পক্ষে তীব্র গণ-আন্দোলন গড়ে তোলার জন্য বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব দিনরাত পরিশ্রম করতেন। আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগকে সব ধরণের সহযোগিতা দিতেন এবং সংগঠন যাহাতে ঝিমিয়ে না যায় তার জন্য সবসময় উৎসাহ উদ্দিপনা দিতেন।
ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠনেও বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব অগ্রণী ভূমিকা পালন করে ছিলেন। এদিকে আন্দোলন চলছে, অন্যদিকে ক্যান্টনমেন্টের ভেতরে আদালত বসিয়ে বঙ্গবন্ধুসহ ৩৫ জনের বিরুদ্ধে মামলার শুনানি চলছে। আন্দোলন যখন তীব্র আকার ধারণ করল, তখন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খান সমস্ত দলের সঙ্গে আলোচনার ডাক দিলেন। বন্দি শেখ মুজিবুর রহমানকে সাময়িক মুক্তি দিয়ে অর্থাৎ প্যারোলে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে গিয়ে আলোচনা করার উদ্যোগ গ্রহণ করে।
কিন্তু এই প্যারোলে মুক্তির তীব্র বিরোধিতা করলেন বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব
 ( রেণু)। তাঁর এক কথা – মামলা প্রত্যাহার করে মুক্ত মানুষ হিসেবে শেখ মুজিবুর রহমান আলোচনায় যোগ দিতে পারেন – প্যারোলে যাবেন না। শেষ পর্যন্ত আইয়ুব খান বাধ্য হলো মামলা প্রত্যাহার করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে মুক্তি দিতে। অন্য বন্দিরাও মুক্তি পেলেন।
১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দের ৭ মার্চ। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিকেলে রেসকোর্স ময়দানে ঐতিহাসিক ভাষণ দিবেন। ভাষণের পূর্বে ৩২ নম্বরের বাড়িতে অনেক মানুষের অনেক ধরণের পরামর্শ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে কী বলতে হবে সে সম্পর্কে। বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের একটাই পরামর্শ। তা হলো ঃ ” কারও কথা শুনতে হবে না,  তোমার মনে যে কথা
 আছে তা-ই বলবা।”
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সেটাই করেছিলেন। তাঁর মনে যা ছিল সে কথাই বলেছিলেন। সে ভাষণ বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভাষণ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে।
১৯৭১ খ্রিস্টাব্দের ২৫ মার্চ। বিভিন্ন সূত্রে খবর এলো  পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী বাঙালির উপর হামলা করবে। ধানমন্ডিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বাড়ি আক্রমণ করবে।
সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের সমস্ত প্রস্তুতি ইতিমধ্যেই নেওয়া ছিল। আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের নির্দেশ দিয়ে সবাইকে যাঁর যাঁর দায়িত্ব পালনে চলে যেতে বললেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। প্রতিরোধ গড়ে তুলতে বললেন। বাড়িতে বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, শেখ রাসেল আর কেবল শেখ জামাল থাকলেন। স্বামী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ছেড়ে শেখ ফজিলাতুন্নেছা রেণু কোথাও যাবেন না।
যে মুহূর্তে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী সারা ঢাকা শহরে গণহত্যা শুরু করল, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ২৫ মার্চ দিবাগত রাত অর্থাৎ ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে স্বাধীনতার ঘোষণা দিলেন। এর পরই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেফতার করে পাকিস্তানে নিয়ে গেল। আর এদিকে বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিবও  ( রেণু) পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাতে বন্দি হলেন।
দীর্ঘ নয় মাস সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দের ১৬ ডিসেম্বর মিত্র বাহিনীর কাছে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী আত্মসমর্পণ করল। চূড়ান্তভাবে যুদ্ধে বিজয়ী হলো বাংলাদেশ। দেশ হলো শত্রুমুক্ত।
বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব মুক্তি পেলেন ১৭ ডিসেম্বর। যে বাড়িতে তাঁদের বন্দি করে রাখা হয়েছিল সেখানে পাকিস্তানি পতাকা টাঙানো ছিল। সে পতাকা নামিয়ে বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব ছিঁড়ে ফেললেন। সেখানে বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়ে দেন।
এরপর বেগম ফজিলাতুন্নেছা রেণুর জীবনে সবচেয়ে আনন্দের দিন এলো যেদিন তিনি ফিরে পেলেন তাঁর স্বামী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। সেদিনটি ছিল ১০ জানুয়ারি ১৯৭২ খ্রিস্টাব্দ। স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্হপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে এদিন দেশের মাটিতে ফিরে আসেন।
বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব ( রেণু) তাঁর জীবনের শেষ অগ্নিপরীক্ষা দিলেন ১৯৭৫ খ্রিস্টাব্দের ১৫ আগস্ট। স্বাধীনতাবিরোধীচক্র ঘাতকের নির্মম বুলেট কেড়ে নিল বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে।
বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিবকে ঘাতকেরা বলল : আমাদের সাথে চলেন। তিনি বললেন : ‘ তোমাদের সাথে কোথাও যাব না। তাঁকে মেরেছ, আমাকেও গুলি কর। আমি এক পা-ও নড়ব না। ‘ ঘাতকের হাতের বন্দুক গর্জে উঠলো।
৩২ নম্বরের মেঝেতে লুটিয়ে পড়ল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আমৃত্যু জীবন সাথী বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের দেহ। তাঁর শরীরের রক্ত গড়িয়ে গিয়ে মিশে যায় সিঁড়িতে পড়ে থাকা স্বামী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রক্তের সঙ্গে। আর সে রক্তের স্রোতধারা গড়িয়ে মিশে যায় বাংলার মাটিতে।
নিজেদের জীবনের সব চাওয়া -পাওয়া বিসর্জন দিয়ে যে মাটিকে শত্রুমুক্ত করেছিলেন, স্বাধীন করেছিলেন প্রিয় বাংলাদেশ, আর সেই স্বাধীন বাংলাদেশের মাটি ভিজে যায় তাঁদের শোণিতধারায়।
এভাবেই মহীয়সী নারী বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব (রেণু) তাঁর অমরত্বের মধ্য দিয়ে পৃথিবীর সকল নারীদের অনুকরণীয় হয়ে থাকবেন। তাঁর মৃত্যু নেই। তিনি অমর, অবিনশ্বর। তিনি পৃথিবীর আলোকিত বাতিঘর।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও পড়ুন
© All rights reserved © dailyamarsomoy.com