1. admin@gmail.com : দৈনিক আমার সময় : দৈনিক আমার সময়
  2. admin@dailyamarsomoy.com : admin :
‎চবিতে নীতিমালার শর্ত ছাড়াই অধ্যাপক পদে শাহ আলমের পদোন্নতি বোর্ড, উঠেছে নানা প্রশ্ন - দৈনিক আমার সময়

‎চবিতে নীতিমালার শর্ত ছাড়াই অধ্যাপক পদে শাহ আলমের পদোন্নতি বোর্ড, উঠেছে নানা প্রশ্ন

জাকারিয়া হোসেন, চট্টগ্রাম
    প্রকাশিত : রবিবার, ২৩ আগস্ট, ২০২৬

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. শাহ আলম বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্ধারিত পদোন্নতি নীতিমালার একাধিক বাধ্যতামূলক শর্ত পূরণ না করেই অধ্যাপক পদে আপগ্রেডেশনের আবেদন করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এসব শর্ত পূরণ না হওয়ার মধ্যেই আগামী ২৪ আগস্ট বিকেল ৩টায় তার অধ্যাপক পদে পদোন্নতির বোর্ড সভা অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ফলে এ পদোন্নতি ঘিরে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মহলে নানা প্রশ্ন ও বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।

‎বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর পদে আপগ্রেডেশনের নীতিমালা (As on 26.08.2025) এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, মো. শাহ আলমের প্রয়োজনীয় চাকরির মেয়াদ পূর্ণ হয়নি, সহযোগী অধ্যাপক পদে থাকাকালীন নির্ধারিত গবেষণা প্রকাশনার শর্তও পূরণ হয়নি। পাশাপাশি অধ্যাপক পদে আপগ্রেডেশনের আবেদনের ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক বিভাগীয় প্ল্যানিং কমিটির যাচাই-বাছাই ও সুপারিশের প্রক্রিয়াও অনুসরণ করা হয়নি বলে নথিতে উঠে এসেছে।

‎চাকরির মেয়াদ পূর্ণ হয়নি

‎বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদিত নীতিমালার ১(ক) ধারায় মাস্টার্স ডিগ্রিধারী প্রার্থীর ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে মোট কমপক্ষে ২১ বছরের সক্রিয় চাকরির অভিজ্ঞতা এবং সহযোগী অধ্যাপক পদে কমপক্ষে ১০ বছরের সক্রিয় চাকরির অভিজ্ঞতা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

‎অন্যদিকে ১(গ) ধারায় পিএইচডি/ডি.এসসি./ডি.লিট ডিগ্রিধারী প্রার্থীর জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে কমপক্ষে ১২ বছরের সক্রিয় চাকরির অভিজ্ঞতা এবং সহযোগী অধ্যাপক পদে কমপক্ষে পাঁচ বছরের সক্রিয় চাকরির অভিজ্ঞতা নির্ধারণ করা হয়েছে।

‎নথিপত্রে মো. শাহ আলমকে বর্তমানে পিএইচডিতে অধ্যয়নরত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ তিনি এখনো পিএইচডি ডিগ্রিধারী নন। ফলে পিএইচডি ডিগ্রিধারীদের জন্য নির্ধারিত যোগ্যতার পরিবর্তে তার ক্ষেত্রে মাস্টার্স ডিগ্রিধারী প্রার্থীর শর্ত প্রযোজ্য হওয়ার কথা।

‎নথি অনুযায়ী, মো. শাহ আলম ২০২৩ সালের ৩০ অক্টোবর সহযোগী অধ্যাপক পদে যোগদান করেন। ২০২৫ সালের ২৬ আগস্ট কার্যকর হওয়া নীতিমালার সময় তার সহযোগী অধ্যাপক পদে চাকরির মেয়াদ দুই বছরও পূর্ণ হয়নি। অথচ মাস্টার্স ডিগ্রিধারী প্রার্থীর ক্ষেত্রে সহযোগী অধ্যাপক পদে কমপক্ষে ১০ বছরের সক্রিয় চাকরির অভিজ্ঞতা বাধ্যতামূলক। অর্থাৎ নির্ধারিত ১০ বছরের বিপরীতে তার সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে চাকরির মেয়াদ ছিল দুই বছরেরও কম।

‎গবেষণা প্রকাশনা নিয়েও প্রশ্ন

‎অধ্যাপক পদে আপগ্রেডেশনের ক্ষেত্রে সহযোগী অধ্যাপক পদে থাকাকালীন নির্দিষ্টসংখ্যক গবেষণা প্রকাশনার শর্ত রয়েছে। নীতিমালার ৪(খ) ধারায় বলা হয়েছে, সহযোগী অধ্যাপক পদে যোগদানের আগের কোনো প্রকাশনা অধ্যাপক পদে পদোন্নতি বা আপগ্রেডেশনের ক্ষেত্রে গণনা করা যাবে না।

‎শাহ আলমের আবেদনে উল্লিখিত গবেষণাপত্রগুলোর মধ্যে ২০১৯ ও ২০২২ সালে প্রকাশিত গবেষণাপত্র রয়েছে। অথচ তিনি সহযোগী অধ্যাপক পদে যোগ দেন ২০২৩ সালের ৩০ অক্টোবর। ফলে এসব গবেষণা সহযোগী অধ্যাপক পদে থাকাকালীন প্রকাশিত হয়নি।

‎নীতিমালার ১(ক) ধারায় সহযোগী অধ্যাপক পদে থাকাকালীন প্রকাশিত বা প্রকাশের জন্য গৃহীত ছয়টি গবেষণা প্রকাশনার শর্ত রয়েছে। এর মধ্যে অন্তত তিনটি গবেষণা প্রকাশিত হতে হবে এবং প্রার্থীকে অন্তত একটি গবেষণার প্রধান লেখক (Principal Author) হতে হবে।

‎কিন্তু শাহ আলমের আবেদনে সহযোগী অধ্যাপক হওয়ার আগের সময়ে প্রকাশিত গবেষণাপত্রই উল্লেখ রয়েছে বলে নথি পর্যালোচনায় দেখা গেছে। নীতিমালার বিধান অনুযায়ী এসব গবেষণা সহযোগী অধ্যাপক পদে থাকাকালীন প্রয়োজনীয় গবেষণা প্রকাশনা হিসেবে গণনা করার সুযোগ নেই বলে সংশ্লিষ্টদের মত।

‎প্ল্যানিং কমিটির অনুমোদন ছাড়াই আবেদন

‎অধ্যাপক পদে আপগ্রেডেশনের আবেদনের ক্ষেত্রে বিভাগীয় প্ল্যানিং কমিটির মাধ্যমে যাচাই-বাছাই ও সুপারিশও বাধ্যতামূলক। নীতিমালার ৭(ক) ধারায় আবেদন পাওয়ার পর বিভাগীয় সভাপতি বা ইনস্টিটিউটের পরিচালককে প্ল্যানিং কমিটির সভা আহ্বানের কথা বলা হয়েছে। ৭(গ) ধারায় প্রার্থীর শিক্ষাগত যোগ্যতা, শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা ও গবেষণা প্রকাশনা যাচাই করে আবেদন সুপারিশের বিধান রয়েছে।

‎কিন্তু মো. শাহ আলম অধ্যাপক পদে আপগ্রেডেশনের জন্য বিভাগীয় প্ল্যানিং কমিটির কাছে আবেদন করেননি বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে তার আবেদন প্ল্যানিং কমিটির মাধ্যমে নির্ধারিত যাচাই-বাছাই ও সুপারিশের ধাপ অতিক্রম করেনি।

‎নীতিমালার ৭(গ) ধারায় নির্ধারিত শর্ত পূরণ না হলে কোনো অবস্থাতেই প্ল্যানিং কমিটি কোনো প্রার্থীর আবেদন সুপারিশ করতে পারবে না বলে উল্লেখ রয়েছে। একই সঙ্গে নীতিমালার কোনো শর্ত শিথিল করারও সুযোগ নেই।

‎আগের পদোন্নতি ঘিরেও জটিলতা

‎মো. শাহ আলমের পদোন্নতি ঘিরে জটিলতা নতুন নয়। নথি অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ৩ এপ্রিল ও ২১ জুন ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক থেকে সহযোগী অধ্যাপক পদে পদোন্নতির জন্য দুটি বোর্ড সভা আহ্বান করা হয়। প্রথম সভায় প্রার্থী মো. শাহ আলম অনুপস্থিত ছিলেন।

‎পরবর্তীতে ২০২৩ সালের আগস্টে অনুষ্ঠিত চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫৪৪তম সিন্ডিকেট সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, দুটি পদোন্নতি সভায় উপস্থিত তিনজনকে সরাসরি এবং একজনকে শর্তসাপেক্ষে সহকারী অধ্যাপক থেকে সহযোগী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়।

‎জুনিয়র সহকর্মীরা পদোন্নতি পাওয়ার পর শাহ আলম নিজের শারীরিক অসুস্থতার কারণে পদোন্নতির বোর্ডে উপস্থিত হতে পারেননি উল্লেখ করে লিখিত আবেদন করেন। একই সময়ে নিজের অসুস্থতার ছবি ফেসবুকে প্রকাশ করে মানবিক বিবেচনায় পদোন্নতির আবেদন করেন তিনি।

‎তবে ৫৪৬তম সিন্ডিকেট সভায় অধিকাংশ সদস্যের আপত্তির কারণে সরাসরি সিন্ডিকেট সভা থেকে তাকে পদোন্নতি না দিয়ে তার ফাইল সিলেকশন বোর্ডে রেফার ব্যাক করা হয়। ওই সিন্ডিকেট সভায় শাহ আলমের পক্ষে সাবেক এক উপ-উপাচার্য সিলেকশন বোর্ডের সুপারিশের ভিত্তিতে তার পদোন্নতি ৫৪৪তম সিন্ডিকেট সভা থেকে কার্যকর করার দাবি করেন। এতে ২০২৩ সালের আগস্টে সহযোগী অধ্যাপক হওয়া শিক্ষকদের তুলনায় শাহ আলমের জ্যেষ্ঠতা এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।

‎শিক্ষা ছুটি নিয়েও প্রশ্ন

‎শাহ আলম ২০২৩ সালের ৪ এপ্রিল নিজের পদোন্নতির আবেদনপত্রের সঙ্গে শিক্ষা ছুটির কাগজ বিভাগে জমা দেন। তবে সে সময় তিনি অসুস্থতার কোনো ডকুমেন্ট জমা দেননি।

‎বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম অনুযায়ী, কোনো শিক্ষক শিক্ষা ছুটিতে গেলে তা বিভাগীয় প্ল্যানিং কমিটির মাধ্যমে অনুমোদন করতে হয়। বিদেশে অবস্থানরত সংশ্লিষ্ট শিক্ষককে প্রত্যেক শিক্ষাবর্ষ শেষে সুপারভাইজারের দেওয়া প্রগ্রেস রিপোর্টও বিভাগের প্ল্যানিং কমিটিতে উপস্থাপন করতে হয়।

‎কিন্তু নথি অনুযায়ী, শাহ আলম এসব প্রক্রিয়ার কোনোটি সম্পন্ন করেননি। বরং ভবিষ্যতে প্ল্যানিং কমিটিকে জানাবেন—এমন মর্মে ‘রিপোর্ট টু প্ল্যানিং’ উল্লেখ করে শিক্ষা ছুটির ফরম পদোন্নতির আবেদনপত্রের সঙ্গে সংযুক্ত করেন।

‎শিক্ষা ছুটি প্রতি এক বছর পর নবায়নের নিয়ম থাকলেও শাহ আলমের ছুটির মেয়াদ দুই মাসের বেশি সময় উত্তীর্ণ ছিল। তার শিক্ষা ছুটি শেষ হয় ২০২৩ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি। এরপর ৪ এপ্রিল তিনি ছুটি নবায়নের আবেদন করেন।

‎এ ছাড়া তার সুপারভাইজারের ছুটির জন্য সুপারিশ না থাকলেও শুধু পিএইচডি প্রপোজাল ডিফেন্সের কথা উল্লেখ করা হয়। এ অবস্থায় প্ল্যানিং কমিটির মাধ্যমে ছুটি বৃদ্ধির সুপারিশ না করেই তিনি কীভাবে চাকরিতে বহাল ছিলেন, তা জানতে চায় উচ্চশিক্ষা দপ্তর। নথি অনুযায়ী, এ বিষয়ে শাহ আলম সদুত্তর দিতে পারেননি।

‎মানবিক বিবেচনায় সিনিয়রিটি, এবার অধ্যাপক পদে আবেদন

‎পরবর্তীতে ৫৬৫তম সিন্ডিকেট সভায় শাহ আলমকে সহযোগী অধ্যাপক পদে যোগদানের প্রায় দুই বছর পর সিনিয়রিটি দেওয়া হয়। নথি অনুযায়ী, মানবিক কারণে তাকে এ সিনিয়রিটি দেওয়া হয়।

‎এরপর প্রায় দুই মাস আগে ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে বৈষম্যের শিকার হয়েছেন এবং মানবিক কারণে এমন দাবি করে তিনি পুনরায় অধ্যাপক পদে আপগ্রেডেশনের আবেদন করেন। শাহ আলমের আবেদন পাওয়ার পর বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আল ফোরকান তিন সদস্যের একটি মূল্যায়ন কমিটি গঠন করেন।

‎উক্ত কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, শাহ আলমের অধ্যাপক পদে পদোন্নতির বোর্ড সভা আগামী ২৪ আগস্ট বিকেল ৩টায় অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।

‎নিয়মিত একাডেমিক দায়িত্ব পালন নিয়েও প্রশ্ন

‎এদিকে বিভাগীয় ক্লাস রুটিন, উপস্থিতির তথ্য ও পরীক্ষার গার্ড ডিউটির তালিকা পর্যালোচনায় শাহ আলমের নিয়মিত একাডেমিক দায়িত্ব পালনে অনুপস্থিতির তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানা গেছে।

‎বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতিমালার ৫(ক) ধারায় অননুমোদিতভাবে অনুপস্থিত শিক্ষকের পদোন্নতির বিষয় বিবেচনা করা যাবে না বলে উল্লেখ রয়েছে। ফলে তার বিভাগে নিয়মিত উপস্থিতি, ক্লাস গ্রহণ এবং পরীক্ষার দায়িত্ব পালনের বিষয়টিও অধ্যাপক পদে আপগ্রেডেশনের যোগ্যতা যাচাইয়ের অংশ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

‎সব মিলিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদিত নীতিমালা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় চাকরির অভিজ্ঞতা পূর্ণ না হওয়া, সহযোগী অধ্যাপক পদে থাকাকালীন প্রয়োজনীয় গবেষণা প্রকাশনার শর্ত পূরণ না হওয়া এবং বিভাগীয় প্ল্যানিং কমিটির অনুমোদন না থাকার পরও কীভাবে তার অধ্যাপক পদে আপগ্রেডেশনের বোর্ড সভা অনুষ্ঠিত হচ্ছে—এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

‎বিশেষ করে নীতিমালার ৭(গ) ধারায় নির্ধারিত শর্ত পূরণ না হলে কোনো অবস্থাতেই আবেদন সুপারিশ করা যাবে না এবং নীতিমালার কোনো শর্ত শিথিল করার সুযোগ নেই—এমন বিধান থাকার পরও পদোন্নতি বোর্ড আহ্বানের সিদ্ধান্ত নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনা চলছে।

‎সর্বশেষ বিতর্কিত এ পদোন্নতি বোর্ডের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও পড়ুন
© All rights reserved © dailyamarsomoy.com