জাতীয় বাজেটে হরিজন জনগোষ্ঠীর জন্য শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসস্থান, কর্মসংস্থান ও সামাজিক সুরক্ষা খাতে বিশেষ বরাদ্দ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে জাগ্রত হরিজন মানব কল্যাণ সংগঠন। সংগঠনটির নেতারা বলেছেন, দেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও হরিজন জনগোষ্ঠী এখনও সামাজিক বৈষম্য, অর্থনৈতিক বঞ্চনা এবং মৌলিক অধিকার থেকে পিছিয়ে রয়েছে।
বুধবার (৪ জুন) সকালে রংপুর নগরীর কামাল কাছনা এলাকায় অবস্থিত ইনস্পায়ার ট্রেনিং অ্যান্ড রিসোর্স সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি তুলে ধরা হয়। “সম-অধিকারভিত্তিক বাজেট গড়ে বৈষম্যমুক্ত বাংলাদেশ” শীর্ষক এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে জাগ্রত হরিজন মানব কল্যাণ সংগঠন।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে সংগঠনের নেতারা বলেন, স্বাধীনতার ৫৫ বছরেরও বেশি সময় পরও দেশের হরিজন জনগোষ্ঠীর বড় একটি অংশ নানা ধরনের সামাজিক বৈষম্য ও বঞ্চনার মধ্যে জীবনযাপন করছে। সমাজের পরিচ্ছন্নতা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও তাদের অবদান যথাযথ মূল্যায়ন পায় না।
বক্তারা জানান, অর্থনৈতিকভাবে অধিকাংশ হরিজন পরিবার এখনও দুর্বল অবস্থায় রয়েছে। সীমিত কয়েকটি পেশার মধ্যে আবদ্ধ থাকায় এবং আধুনিক শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ না পাওয়ায় তারা বিকল্প কর্মসংস্থানে প্রবেশ করতে পারছে না। ক্ষুদ্র ঋণ, উদ্যোক্তা উন্নয়ন কর্মসূচি ও সরকারি কর্মসংস্থান প্রকল্পেও তাদের অংশগ্রহণ খুবই সীমিত।
শিক্ষা খাতে পিছিয়ে পড়ার বিষয়টি তুলে ধরে তারা বলেন, দারিদ্র্য, সামাজিক বৈষম্য, শিক্ষা উপকরণের অভাব এবং অনেক ক্ষেত্রে বৈষম্যমূলক আচরণের কারণে হরিজন সম্প্রদায়ের বহু শিশু প্রাথমিক স্তরেই ঝরে পড়ে। উচ্চশিক্ষায় অংশগ্রহণের হারও অত্যন্ত কম, যা তাদের ভবিষ্যৎ উন্নয়নের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্বাস্থ্য খাতের চিত্র তুলে ধরে বক্তারা বলেন, অনেক হরিজন পরিবার এখনও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বসবাস করছে। নিরাপদ পানি, উন্নত স্যানিটেশন ও পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসেবার অভাবে তারা বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে। একই সঙ্গে চিকিৎসা ব্যয় বহন করতে না পারায় অনেকেই প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হন।
বাসস্থান সংকটকে অন্যতম প্রধান সমস্যা উল্লেখ করে তারা বলেন, দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে সরকারি বা পৌরসভার জমিতে গড়ে ওঠা কলোনিতে বসবাস করলেও অধিকাংশ পরিবারের জমির মালিকানা বা স্থায়ী বসবাসের নিশ্চয়তা নেই। ফলে উচ্ছেদের আশঙ্কা এবং অনিরাপদ পরিবেশে জীবনযাপন তাদের নিত্যসঙ্গী হয়ে উঠেছে।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, জাতীয় বাজেট দেশের উন্নয়নের প্রধান নীতিগত ও আর্থিক দলিল হলেও হরিজন জনগোষ্ঠীর বাস্তব চাহিদা ও উন্নয়ন অগ্রাধিকার অধিকাংশ সময় সেখানে যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয় না। ফলে রাষ্ট্রীয় উন্নয়নের সুফল থেকে তারা অনেকাংশে বঞ্চিত থেকে যায়।
এ অবস্থায় আসন্ন জাতীয় বাজেটে হরিজন জনগোষ্ঠীর জন্য শিক্ষা বৃত্তি, দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ, স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপদ বাসস্থান, কর্মসংস্থান, সামাজিক সুরক্ষা এবং নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন খাতে বিশেষ বরাদ্দের দাবি জানানো হয়। পাশাপাশি জাতীয় বাজেট প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় তাদের দৃশ্যমান ও অর্থবহ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়।
সংগঠনের নেতারা বলেন, “হরিজন জনগোষ্ঠী কোনো করুণা বা দয়া চায় না। তারা চায় সংবিধান স্বীকৃত অধিকার, সমান সুযোগ, মর্যাদাপূর্ণ জীবন এবং উন্নয়নের সমান অংশীদারিত্ব।”
তারা সরকার, জনপ্রতিনিধি, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা, গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, হরিজন জনগোষ্ঠীসহ সকল প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য ন্যায্য বাজেট বরাদ্দ ও সমঅধিকার নিশ্চিত করা গেলে একটি মানবিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বৈষম্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
Leave a Reply