শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের রুটিন দায়িত্বে থাকা শ্রীপুর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো: মনিরুল হাসান মন্ডলের চাকরির মেয়াদ শেষ হতে যাচ্ছে আগামী ৩১ডিসেম্বর। এজন্য ওই স্কুলের প্রধানের পদে বসতে ইতোমধ্যেই দৌড়ঝাঁপ শুরু হয়েছে। এ দৌড়ে জ্যেষ্ঠতার তালিকায় এগিয়ে আছেন যথাক্রমে- সহকারী শিক্ষক মো: আলতাফ হোসেন,মো: আক্তারুজ্জামান, রাশিদা বেগম, ইসমত আরা,আবিদা সুলতানা,দিল মোহাম্মদ ও সাহাব উদ্দিন। তবে, নিয়ম ভেঙে ওই পদে বসানোর শঙ্কায় আছেন সবাই।
সোমবার (৩১ আগস্ট) দুপুরের দিকে সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে এসব তথ্য জানা যায়। ১৯৯১সালের ২৪ এপ্রিল ওই স্কুলে যোগদান করেন মনিরুল হাসান মন্ডল। সরকারি হওয়ার সুবাদে ২০১৮ সালের ১১অক্টোবর থেকেও প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন তিনি। ৩১ ডিসেম্বর উনার শেষ কর্মদিবস।
সুত্রে জানা যায়, সরকারি বিধিমতে উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধানের পদ শূন্য হওয়ার ৩মাস আগে শিক্ষার ডিজি বরাবর অবগত করতে হয়। পরে বিধি অনুযায়ী যিনি টিকবেন তিনি অবসরপ্রাপ্ত প্রধানের দায়িত্ব ছাড়ার অর্থাৎ শেষ কর্মদিবসে চলতি দায়িত্ব বা ভারপ্রাপ্ত প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। পরবর্তীতে সরকারি ভাবে প্রধান শিক্ষক নিয়োগ হলে চলতি দায়িত্বকালীন প্রধানের ক্ষমতা সয়ংক্রীয় ভাবে বিলুপ্ত হবে। এমন অবগতির চিঠি ইস্যূর খবরেই ওই পদের জন্য ইতোমধ্যেই কয়েকজন সহকারী শিক্ষক উর্ধতন কর্মকর্তা ও ক্ষমতাশীল দলের কেন্দ্রীয় পর্যায়ে দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন মর্মে গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। জ্যেষ্ঠতার তালিকায় প্রথমে থাকায় আলতাফ হোসেন ও আক্তারুজ্জামানের প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতি পাওয়ার কথা। কিন্তু সবার কনিষ্ঠ সাহাব উদ্দিন এ দৌড়ে এগিয়ে আছেন বলে নিশ্চিত করেছেন একটি সুত্র। থেমে নেই রাশিদা আক্তারও। নিজেদের কৌশলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাসহ রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গের সাথে চালিয়ে যাচ্ছেন যোগাযোগ। তবে, নিয়ম বহির্ভূত যেকোনো সিদ্ধান্ত হটকারিতায় উদ্বিগ্ন রয়েছেন সহকারী শিক্ষকগন। এতে আইনি জটিলতায় পড়ার শঙ্কার সম্ভবনা প্রকট। সুত্র আরও জানায়, একদিকে শিক্ষক সংকট ও পদের দৌড়ঝাঁপের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে শিক্ষার্থীদের ওপর।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় সুত্র বলছে, আত্ত্বীয় বিধি-২০২৪ অনুযায়ী প্রথমে শর্ত সবারই যোগদান। এক্ষেত্রে সমান হলে পরবর্তীতে কার্যকর চাকরি কাল। এটাও সমান হলে সকলের নূন্যতম শিক্ষাগত যোগ্যতা অর্জনের বয়স। উক্ত বছর একই হলে বয়সের ভিত্তিতে জ্যেষ্ঠতা নির্ধারন করা হবে।
শ্রীপুর সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় সুত্রে জানা যায়, প্রথম শর্তে চারজনেরই সমান হলেও কার্যকর চাকরি কাল অনুযায়ী প্রথমে আসেন মো: আলতাফ হোসেন। পরে যথাক্রমে মো: আক্তাররুজ্জামান,এরপর রাশিদা আক্তার ও সবশেষ শাহাব উদ্দিন।তৃতীয় শর্ত অনুযায়ী,নূন্যতম শিক্ষাগত যোগ্যতা অর্জনের বয়স বিবেচনায় প্রথমে আসেন মো: আলতাফ হোসেন যাহার এসএসসি ১৯৮৫ ইং, পরে যথাক্রমে আক্তারুজ্জামান দাখিল ১৯৮৫ইং, রাশিদা আক্তার ১৯৮৬ সাল এবংসাহাব উদ্দিন এসএসসি ১৯৮৬ ইং।
সবশেষ বয়সের দিক বিবেচনায় প্রথমে আসেন শাহাব উদ্দিন। পরে যথাক্রমে আক্তারুজ্জামান, আলতাফ হোসেন ও রাশিদা আক্তার।তবে, আলতাফ হোসেন ও শাহাব উদ্দিনের সার্টিফিকেট এবং যোগদান প্রশ্নবিদ্ধ।
জানা যায়,২০২৪ সালের ১১জানুয়ারি ওই স্কুলে পদ না থাকলেও সূজিত পদে সহকারী শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন শাহাব উদ্দিন। পরবর্তীতে কৌশলে সহকারী প্রধান শিক্ষক পথে এমপিও করে আনেন তিনি। কথিত আছে বিদ্যালয়ের চাপে পড়ে ইনডেক্স ঠিক রেখে বাম পাশের এএইচএম ডিলিট করে বর্তমান পর্যন্ত বেতন উত্তোলন করছেন। যে জটিলতায় এই স্কুলে অদ্যবদি সহকারী প্রধান পদে কোনো নিয়োগ দেওয়া সম্ভব হয়নি। ফলে শিক্ষক সংকট বিরাজমান।অন্যদিকে,সহকারী শিক্ষক আলতাফ হোসেনের কম্পিউটার সার্টিফিকেট নিয়ে অডিটে আপত্তি হয়।
এ বিষয়ে সহকারী শিক্ষক আলতাফ হোসেন বলেন,’ নিয়ম অনুযায়ী আমি-ই দায়িত্ব পাই। অনিয়ম হলে যারেতারেই দেওয়া যায়।’ সার্টিফিকেট সম্পর্কে তিনি বলেন,’গণ প্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার শিক্ষামন্ত্রণালয় নট্রামস বগুড়া স্মারক নং নট্রামস ৮৫৫ অনুযায়ী ২৫মে ১৯৯৬ মোতাবেক পেছনের ২৩ এপ্রিল ১৯৯৬ হতে নট্রামস সকল সনদ প্রদান স্থগিত করেন। আর নট্রামস হতে রেজিষ্ট্রেশন প্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান নিজ নামে সনদ প্রনয়ণের পর প্রদানের ক্ষমতা প্রদান করেন। পরে নং২১৭/৮৭-২১৩-০০(১১)/২১৬ স্মারকে ২৯ ডিসেম্বর ২০০১ মোতাবেক এর পেছনে ১২ ডিসেম্বর ২০০১ হতে সনদ ইস্যু স্থগিত করেন। সেই হিসেবে আমার সনদ বিষয়ে কোনো প্রশ্ন নেই।’
সহকারী শিক্ষক সাহাব উদ্দিন বলেন,’ বিদ্যালয় চালানোর মতো প্রশাসনিক ও দাপ্তরিক অভিজ্ঞতা আমার চেয়ে কার বেশী আছে। সে অনুযায়ী আমি-ই দায়িত্ব পাওয়ার কথা।’ সহকারী প্রধান শিক্ষকের পদে যোগদানের বিষয়ে তিনি বলেন,’আমি নিয়ম মেনেই হয়েছি। অন্যরা তো সার্টিফিকেট আপত্তি নিয়েও চাকরি করে।’
বাকি দুজন সহকারী শিক্ষক আক্তারুজ্জামান ও রাশিদা আক্তার বলেন,’নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব দেওয়ার পক্ষে আমরা। সেটা স্বচ্ছতার সাথে হোক।’
শ্রীপুর সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মনিরুল হাসান বলেন, ‘ সরকারি বিধি অনুযায়ী যে কয়দিন আছে সেই কয়দিনের বিষয় বলতে পারবো। পরবর্তীতে কে দায়িত্বে বসবে সেটা সরকারি বিধিই নির্ধারণ করবে। তবে স্কুলের স্বার্থে যে-ই আসুক আমার কোনো মন্তব্য নেই।’
মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম বলেন,’ বিধি অনুযায়ী সরকারি স্কুলের নিয়োগ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ডিজি স্যার বিষয়টি দেখে। অন্যান্য বিষয় গুলো প্রতিবেদন তৈরি হচ্ছে।’
শ্রীপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও স্কুলের সভাপতি মোঃ নাহিদ ভূঞা বলেন,’ নিয়ম অনুযায়ী দায়িত্ব অর্পণ করার সুপারিশ থাকবে। যদিও বিষয়টি দেখে ডিজি মহোদয়।’
এ বিষয়ে বক্তব্য নেওয়ার প্রয়োজনে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক প্রফেসর ড.খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেলের অফিসের ব্যবহৃত নাম্বারে ফোন দিলে অফিস সহায়ক পরিচয়ে একজন রিসিভ করে,’স্যার বাইরে আছেন’ বলে জানান।
প্রসঙ্গত, ১৯৪২ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মুঞ্জরী পেয়ে শ্রীপুরের মন্ডল বাড়ির কৃতি সন্তান হাজী হাছেন আলী মন্ডল কিছু শিক্ষানুরাগীর ১একর ৬০ শতাংশ জমির ওপর একটি মাটির ঘরে শ্রীপুর বাইলাটারেল হাইস্কুল নামে এর কার্যক্রম শুরু করেন। এটি পরে নামকরণ হয় শ্রীপুর বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়। পরবর্তী ১৯৮০ সালে শ্রীপুর পাইলট স্কিমে নামকরণ হয় শ্রীপুর পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় সবশেষে ২০১৮ সালের ১১অক্টোবর সরকারিকরণের মধ্য দিয়ে শ্রীপুর সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় হিসেবে নামকরন হয়। বর্তমানে ৮জন শিক্ষক,২ কর্মচারী মিলিয়ে ১০জন দায়িত্ব পালন করছেন। ৫টি পদে শিক্ষক শূন্য রয়েছে।
Leave a Reply