নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার ২ নম্বর বালাপাড়া ইউনিয়নে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী মনোনীত চেয়ারম্যান প্রার্থীর নাম ঘোষণার পর দলীয় সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে স্থানীয় পর্যায়ে উত্তেজনা ও বিরোধের সৃষ্টি হয়েছে। এ ঘটনায় সংগঠন থেকে বহিষ্কৃত কর্মী হিসেবে পরিচিত হাফিজুল ইসলাম নেজামীর বিরুদ্ধে দলীয় প্রার্থী ও সংগঠনের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয় জামায়াত নেতাকর্মীদের অভিযোগ, জামায়াত মনোনীত চেয়ারম্যান প্রার্থী মশিউর রহমানের নাম ঘোষণার পর থেকেই হাফিজুল ইসলাম নেজামী দলীয় সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে বিভিন্ন কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছেন। গত শুক্রবার তিনি উপজেলা আমিরের কাছে অভিযোগ করেন, জামায়াত মনোনীত চেয়ারম্যান প্রার্থী তাকে মারধরের হুমকি দিয়েছেন। বিষয়টি জানার পর উপজেলা আমির চেয়ারম্যান প্রার্থীকে সতর্ক করেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
অভিযোগ রয়েছে, ওই ঘটনার সুযোগ নিয়ে হাফিজুল ইসলামসহ কয়েকজন চেয়ারম্যান প্রার্থী দোকানে বসে থাকা অবস্থায় সেখানে গিয়ে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করেন এবং তাকে বিভিন্নভাবে অপমান করেন। এ সময় হাফিজুল ইসলাম বলেন, ‘জামায়াত কেন তোমাকে মনোনয়ন দিয়েছে, আমাকে কেন মনোনয়ন দেয়নি? আমি বড় জামায়াতি, আমি তোমাদের দেখে নেব।’
স্থানীয়দের ভাষ্য, পরিস্থিতি উত্তপ্ত হলেও চেয়ারম্যান প্রার্থী মশিউর রহমান ধৈর্যের পরিচয় দেন এবং দলের উপজেলা দায়িত্বশীলের প্রতি আনুগত্য দেখিয়ে কোনো ধরনের পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় যাননি।
স্থানীয় নেতাকর্মীদের অভিযোগ, ওই রাতেই হাফিজুল ইসলাম বিভিন্ন স্থানে গিয়ে জামায়াত মনোনীত প্রার্থীকে নিয়ে নানা ধরনের বক্তব্য দেন। পরে গোপনে ধারণ করা একটি মোবাইল ভিডিওর বিশেষ অংশ কেটে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। এতে চেয়ারম্যান প্রার্থী ও জামায়াত সংগঠনের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় নেতাকর্মীরা।
পরদিন বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে উত্তেজনা আরও বাড়ে। অভিযোগ রয়েছে, হাফিজুল ইসলাম বিভিন্ন ধরনের উস্কানিমূলক বক্তব্য দিতে থাকলে একপর্যায়ে জামায়াতের কয়েকজন কর্মীর সঙ্গে তার বাকবিতণ্ডা হয়। এতে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে তিনি একটি দোকানঘরে আশ্রয় নেন। পরে পরিস্থিতি নিয়ে ফেসবুক লাইভে গিয়ে জামায়াত মনোনীত চেয়ারম্যান প্রার্থীকে নিয়ে বিভিন্ন বক্তব্য দেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
পরিস্থিতি আরও অবনতির আশঙ্কায় জামায়াত মনোনীত চেয়ারম্যান প্রার্থী মশিউর রহমান দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে দলীয় নেতাকর্মীদের সেখান থেকে সরিয়ে নেন বলে স্থানীয়রা জানান।
এদিকে স্থানীয় পর্যায়ে খোঁজ নিয়ে কয়েকজন জামায়াত নেতাকর্মীর সঙ্গে কথা বলে হাফিজুল ইসলাম নেজামীকে ঘিরে বিভিন্ন অভিযোগের কথা জানা গেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক জামায়াত কর্মী অভিযোগ করে বলেন, ‘হাফিজুল সংগঠনের আনুগত্য করেন না। দায়িত্বশীলদের সঙ্গে তিনি বরাবরই অসৌজন্যমূলক আচরণ করতেন।’
ওই কর্মীর আরও অভিযোগ, ‘কর্জে হাসানার নামে মানুষের কাছ থেকে হাজার হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। ৫ আগস্টের পর টুনিরহাট ও খগারহাট এলাকার বিভিন্ন দোকানদারের কাছে টাকা চাইলে তারা দিতে অপারগতা প্রকাশ করলে দোকানপাট ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।’
স্থানীয়দের ভাষ্য, এসব বিষয়ে মানুষ উপজেলা পর্যায়ের দায়িত্বশীলদের অবগত করলে তারা ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেন। তখন হাফিজুল ইসলাম নিজেকে জামায়াত কর্মী নন বলেও দাবি করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয় জামায়াত নেতাকর্মীদের দাবি, হাফিজুল ইসলাম দীর্ঘদিন ধরে সংগঠনের সঙ্গে বিরোধে জড়িয়ে রয়েছেন। দলীয় বিধি-বিধান, নিয়ম-কানুন ও নীতি অনুসরণ না করে তিনি নিজের অবস্থান প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছেন বলেও অভিযোগ তাদের।
এছাড়া হাফিজুল ইসলাম নেজামীকে চেয়ারম্যান পদে মনোনয়ন না দেওয়ায় ক্ষুব্ধ হয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লাইভে এসে জামায়াত মনোনীত চেয়ারম্যান প্রার্থীকে আওয়ামী লীগের ‘দোসর’ এবং স্থানীয় জামায়াতের কিছু নেতাকর্মীকে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে মন্তব্য করার অভিযোগও উঠেছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় এক দায়িত্বশীল বলেন, ‘সে যদি বর্তমানে সংগঠনের সঙ্গে আনুষ্ঠানিকভাবে সম্পৃক্ত না থাকে, তাহলে তার ব্যক্তিগত কর্মকাণ্ডের দায় পুরো জামায়াতে ইসলামী বা স্থানীয় সংগঠনের ওপর বর্তানো উচিত নয়। দলীয় সিদ্ধান্ত নিয়ে আপত্তি থাকলে সাংগঠনিকভাবে তা জানানোই নিয়ম।’
স্থানীয় একজন জামায়াত সমর্থক বলেন, ‘যাকে চেয়ারম্যান প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে, তার প্রতি দলীয় নেতাকর্মীদের আনুগত্য থাকা উচিত। ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের কারণে সংগঠনের সিদ্ধান্তের বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই।’
স্থানীয় একনিষ্ঠ জামায়াত সমর্থকদের আশঙ্কা, এ ধরনের পাল্টাপাল্টি বক্তব্য ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার-প্রচারণার কারণে ব্যক্তির পাশাপাশি জামায়াতে ইসলামীরও ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হতে পারে।
তারা বলেন, জামায়াত মনোনীত চেয়ারম্যান প্রার্থী মশিউর রহমান একজন ভালো মানুষ হিসেবে এলাকায় পরিচিত। তিনি রংপুর স্টার ক্যাডেট কোচিংয়ের পরিচালক এবং দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষকতা পেশার সঙ্গে যুক্ত। স্থানীয়দের ভাষ্য, তিনি একজন ‘মানুষ গড়ার কারিগর’ এবং জামায়াতে ইসলামীর একজন আদর্শ নেতা হিসেবে এলাকায় পরিচিত। তার মাধ্যমে এলাকার উন্নয়ন ও মানুষের জন্য ভালো কিছু প্রত্যাশা করছেন তারা।
আরেক স্থানীয় ব্যক্তি বলেন, ‘জামায়াতের প্রার্থী নিয়ে কারও আপত্তি থাকলে দলীয় ফোরামে তা বলা উচিত। আবার প্রার্থীর বিরুদ্ধেও যদি কোনো অভিযোগ থাকে, সেটিও প্রমাণসহ তুলে ধরা উচিত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে। কোনো আদর্শ নেতার ভাবমূর্তি নষ্ট করা ঠিক নয়।’
প্রার্থীর বক্তব্য
হাফিজুল ইসলাম নেজামীর বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগের বিষয়ে তার বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। মুঠোফোনে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।
এদিকে জামায়াত মনোনীত চেয়ারম্যান প্রার্থী মশিউর রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করলে তিনি বলেন, দলীয় সিদ্ধান্ত হাফিজুল ইসলাম নেজামী মেনে নিতে না পারায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন মিথ্যা, বানোয়াট ও বিভ্রান্তিকর বক্তব্য ছড়ানো হচ্ছে বলে তিনি মনে করেন।
মশিউর রহমান বলেন, ‘আমাকে দল মনোনয়ন দিয়েছে। সেটা মেনে নিতে না পেরে উদ্দেশ্যমূলকভাবে এসব কাজ করা হচ্ছে। আমি বিষয়টি দলের ঊর্ধ্বতন দায়িত্বশীলদের জানিয়েছি। তারা বিষয়টি নিয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমি দলকে ভালোবাসি, দলের আদর্শকে লালন করি এবং দলের প্রতি পূর্ণ আস্থা রেখে কাজ করে যাব। আপনারা সকলে জানেন, ছাত্রজীবন থেকেই আমি জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। আপনারা এটাও জানেন, আমি শিক্ষকতা পেশায় আছি এবং রংপুরের স্বনামধন্য স্টার ক্যাডেট কোচিংয়ের পরিচালক।’
মশিউর রহমান বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে জামায়াতে ইসলামী ও এলাকার সেবামূলক কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত আছি। এলাকার জন্য কিছু করতে চাই। জামায়াতে ইসলামী আমাকে মনোনয়ন দিয়েছে। দলের জন্য নিজেকে উজাড় করে দিয়েছি এবং সামনেও জামায়াতে ইসলামী দলের জন্যই কাজ করে যাব।’
তিনি বলেন, ‘দলের সিদ্ধান্ত ও সংগঠনের আনুগত্য করে যাব। দলের প্রয়োজনে দল যদি আরও কাউকে ভালো অপশন মনে করে, সেক্ষেত্রেও দলের প্রতি আনুগত্য থাকবে।’
নির্বাচনের বিষয়ে মশিউর রহমান বলেন, ‘নির্বাচন করতেই হয়, তাহলে এলাকার মানুষ আমাকে ভালোবাসে—তারা ভোটের মাধ্যমে রায় দেবেন। এ বিষয়ে আমি বিশ্বাস রাখি।’
Leave a Reply