হিমাগারে আলু সংরক্ষণের ভাড়া কমিয়ে প্রতি কেজি সর্বোচ্চ ৬ টাকা নির্ধারণের সরকারি সিদ্ধান্ত দ্রুত বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন রংপুরের আলুচাষি ও আলু ব্যবসায়ীরা। একই সঙ্গে অতীতে নির্ধারিত হারের চেয়ে অতিরিক্ত আদায় করা হিমাগার ভাড়া কৃষক ও ব্যবসায়ীদের ফেরত দেওয়ারও দাবি জানানো হয়েছে।
আলুচাষি ও ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, উৎপাদন খরচ, সার-বীজ, কীটনাশক, সেচ, শ্রমিক, পরিবহন ও বস্তার ব্যয়ের সঙ্গে হিমাগার ভাড়া যুক্ত হওয়ায় আলু সংরক্ষণে ব্যয় অনেক বেড়ে গেছে। এর ফলে বাজারে কাঙ্ক্ষিত দাম না পেয়ে ২০২৫-২৬ মৌসুমে অনেক কৃষক লোকসানে পড়েছেন।
কৃষকদের ভাষ্য, একদিকে উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে, অন্যদিকে বাজারে আলুর দরপতন হয়েছে। ফলে আলু সংরক্ষণ করে উপযুক্ত সময়ে বাজারজাত করার ক্ষেত্রেও অতিরিক্ত হিমাগার ভাড়া বড় ধরনের চাপ তৈরি করেছে।
আলুচাষি ও ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রতি কেজি আলুর হিমাগার সংরক্ষণ ভাড়া সর্বোচ্চ ৬ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। ৩১ আগস্ট ২০২৬ তারিখে স্বাক্ষরিত এ সিদ্ধান্ত রংপুর জেলা ও রংপুর বিভাগে অবিলম্বে কার্যকর করার জন্য সংশ্লিষ্ট হিমাগার মালিকদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে। নির্ধারিত ৬ টাকার চেয়ে কেউ কম ভাড়া নিলে তাতেও কোনো আপত্তি নেই বলে জানিয়েছেন তারা।
আলুচাষি ও ব্যবসায়ীদের প্রতিনিধিদের বক্তব্য অনুযায়ী, এর আগে হিমাগার মালিকদের পক্ষ থেকে প্রতি কেজি ৬ টাকা ৭৫ পয়সা, পরে ৬ টাকা ৩৮ পয়সা এবং ৬ টাকা ১০ পয়সা ভাড়ার প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়। পরে আলোচনার মাধ্যমে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট পর্যায়ে বিষয়টির সুরাহা হয় এবং সর্বোচ্চ ৬ টাকা ভাড়া নির্ধারণ করে কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের মাধ্যমে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।
তাদের দাবি, এটি কোনো ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নয়; সরকারি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে নির্ধারিত ভাড়া। তাই এর বাইরে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের কোনো সুযোগ নেই। রংপুরের কয়েকটি হিমাগারে এখনো নির্ধারিত ৬ টাকা ভাড়া কার্যকর করতে অনীহা দেখানোর অভিযোগও করেছেন তারা।
আলুচাষি ও ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে আরও বলা হয়, তারা হিমাগার মালিকদের সঙ্গে কোনো ধরনের সংঘাত বা বিশৃঙ্খলা চান না। সরকারি নির্দেশনা স্বাভাবিকভাবে মেনে নিয়ে হিমাগার মালিকরা সহযোগিতা করবেন—এমন প্রত্যাশাই করছেন তারা। আলোচনার মাধ্যমে যে সমাধানে পৌঁছানো হয়েছে, সেটি শান্তিপূর্ণভাবে বাস্তবায়ন করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
এদিকে আগামী বছরের জন্য আরও নিখুঁতভাবে হিমাগার ভাড়া নির্ধারণের লক্ষ্যে সরকার একটি শক্তিশালী কমিটি গঠন করেছে বলেও জানানো হয়েছে। চলতি সিদ্ধান্ত ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত কার্যকর থাকবে এবং পরবর্তী সময়ে নতুন কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে আগামী বছরের জন্য ভাড়া নির্ধারণের উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
আলুচাষিদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, হিমাগার মালিকদের অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের কারণে কৃষক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা দীর্ঘদিন ধরে আর্থিক ক্ষতির মুখে রয়েছেন। ২০২৫-২৬ মৌসুমের আলুর লোকসানে অনেক কৃষকের অর্থনৈতিক অবস্থা অত্যন্ত করুণ হয়ে পড়েছে। তাই আগে অতিরিক্ত আদায় করা অর্থ কৃষক ও ব্যবসায়ীদের ফেরত দেওয়ার জন্য হিমাগার মালিকদের প্রতি বিশেষ অনুরোধ জানানো হয়েছে।
তারা আরও বলেন, অতিরিক্ত আদায় করা অর্থ কৃষকের ঘাম, শ্রম ও কষ্টার্জিত অর্থ। এ অর্থ ফেরত দিতে গড়িমসি করা হলে ক্ষুব্ধ কৃষক ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়তে পারে। এতে হিমাগারে বিশৃঙ্খলা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কা তৈরি হতে পারে। তবে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা বা আইনবহির্ভূত কর্মকাণ্ড না করে শান্তিপূর্ণভাবে দাবি বাস্তবায়নের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
আলুচাষি ও ব্যবসায়ীরা বলেন, দেশের বিভিন্ন আলু উৎপাদনকারী জেলার কৃষক ও ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো তাদের আন্দোলন ও দাবির সঙ্গে পাশে না থাকলে হিমাগার ভাড়া নিয়ে এভাবে সম্মিলিতভাবে দাবি তোলা কঠিন হতো। এজন্য তারা দেশের বিভিন্ন এলাকার আলুচাষি ও ব্যবসায়ীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
সাংবাদিকদের প্রতিও সহযোগিতার আহ্বান জানিয়ে তারা বলেন, আলুচাষিদের ন্যায্য দাবির বিষয়ে সাংবাদিকরা সবসময় পাশে ছিলেন এবং ভবিষ্যতেও থাকবেন বলে তারা প্রত্যাশা করেন। সাংবাদিকদের মাধ্যমে কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের মহাপরিচালকসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে রংপুর জেলা ও পুরো রংপুর বিভাগে প্রতি কেজি সর্বোচ্চ ৬ টাকা হিমাগার সংরক্ষণ ভাড়া দ্রুত কার্যকর করার আহ্বান জানানো হয়।
অন্যদিকে আলুর দরপতন ঠেকাতে দেশের অতিরিক্ত আলু ত্রাণ বা সহায়তা হিসেবে নেপালে পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হলে কৃষকদের লোকসান কিছুটা কমতে পারে বলেও মত দিয়েছেন আলুচাষি ও ব্যবসায়ীদের প্রতিনিধিরা। তাদের মতে, শুধু ভর্তুকি বা প্রণোদনার চেয়ে উৎপাদিত অতিরিক্ত আলুর বাজার সৃষ্টি করা গেলে কৃষক সরাসরি বেশি উপকৃত হতে পারেন।
আলুচাষি ও ব্যবসায়ীরা মনে করেন, উৎপাদন, সংরক্ষণ ও বাজারজাত ব্যবস্থার মধ্যে সমন্বয় না থাকলে কৃষকের লোকসান কমানো কঠিন হবে। তাই সরকারি নির্ধারিত হিমাগার ভাড়া বাস্তবায়ন, অতিরিক্ত আদায় বন্ধ ও পূর্বে আদায় করা অতিরিক্ত অর্থ ফেরতের পাশাপাশি আলুর বাজার স্থিতিশীল রাখতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
তাদের প্রত্যাশা, সরকারি প্রজ্ঞাপনের সিদ্ধান্ত হিমাগার মালিকরা মেনে নিয়ে কোনো ধরনের বাকবিতণ্ডা বা বিশৃঙ্খলা ছাড়াই ৬ টাকা ভাড়া কার্যকর করবেন। এতে কৃষকের সংরক্ষণ ব্যয় কমবে, লোকসানের চাপ কিছুটা হলেও কমবে এবং উপযুক্ত সময়ে আলু বাজারজাত করে ন্যায্যমূল্য পাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
Leave a Reply