সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চরিত্রহননের নীরব মহামারি, কঠোর আইনের প্রয়োগ ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি।
প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে সাইবার অপরাধ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে ব্যবহার করে এক শ্রেণির অসাধু ও বিকৃত মানসিকতার ব্যক্তি নারীদের বিরুদ্ধে চরিত্রহনন, ব্ল্যাকমেইল ও মানহানিকর অপপ্রচারের ভয়ংকর জাল বিস্তার করছে। ভুয়া ফেসবুক আইডি, ভুয়া পেজ, ভুয়া মেসেঞ্জার গ্রুপ, ইমু ও হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ খুলে ব্যক্তিগত ছবি, ভিডিও ও মোবাইল নম্বর প্রকাশ করে নারীদের সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন করা যেন একটি সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রের কর্মকাণ্ডে পরিণত হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, অধিকাংশ ঘটনায় পূর্বশত্রুতা, প্রেমের সম্পর্ক ভেঙে যাওয়া, দাম্পত্য কলহ, বিবাহবিচ্ছেদ কিংবা প্রতিশোধ নেওয়ার মানসিকতা থেকেই এসব অপরাধ সংঘটিত হয়। কোনো নারীর ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিও সংগ্রহ করে তা বিকৃত করা, ভুয়া ক্যাপশন সংযুক্ত করা, এমনকি তার মোবাইল নম্বর প্রকাশ করে অশ্লীল ও ভিত্তিহীন মন্তব্য ছড়িয়ে দেওয়া হয়। কোথাও তাকে দেহব্যবসার সঙ্গে জড়িত বলে অপপ্রচার চালানো হয়, আবার কোথাও প্রতারণা, অসামাজিক কর্মকাণ্ড বা অনৈতিক সম্পর্কের মতো সম্পূর্ণ মিথ্যা অভিযোগ তুলে সম্মানহানির চেষ্টা করা হয়।
এসব পোস্ট প্রকাশের পর ভুক্তভোগীর মোবাইল নম্বরে দেশ-বিদেশ থেকে অশ্লীল ফোনকল, কুরুচিপূর্ণ বার্তা এবং নানাভাবে হয়রানি শুরু হয়। এতে একজন নারীর ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও পেশাগত জীবন ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অনেকেই চাকরি, শিক্ষা ও পারিবারিক সম্পর্কেও সংকটে পড়েন।
পরিচয় গোপন রাখার শর্তে এক ভুক্তভোগী বলেন,
একটি ভুয়া আইডি থেকে আমার ছবি ও নম্বর ছড়িয়ে দেওয়া হয়। এরপর শত শত অশ্লীল ফোন আসে। বাসা থেকে বের হওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে। আমি এমন মানসিক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে গেছি, যা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়।
আরেক নারী বলেন,
আমার বিরুদ্ধে এমন সব মিথ্যা অভিযোগ ছড়ানো হয়েছে, যা আমি কল্পনাও করিনি। আত্মীয়-স্বজন পর্যন্ত আমাকে ভুল বুঝেছেন। অপরাধীরা শুধু আমার নয়, পুরো পরিবারের সম্মান নিয়ে খেলেছে।
এক কলেজছাত্রী বলেন,
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমার ছবি ব্যবহার করে অশ্লীল পোস্ট করা হয়। কয়েকদিন আমি আতঙ্কে ক্লাসে যেতে পারিনি। মনে হচ্ছিল সবাই আমাকে নিয়েই কথা বলছে।
সাইবার নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, এসব অপরাধের পেছনে অনেক সময় সংঘবদ্ধ চক্র কাজ করে। তারা ভুয়া পরিচয়ে একাধিক অ্যাকাউন্ট পরিচালনা করে এবং একই কনটেন্ট বিভিন্ন গ্রুপে ছড়িয়ে দিয়ে দ্রুত ভাইরাল করার চেষ্টা করে। অনেক ক্ষেত্রেই উদ্দেশ্য থাকে ব্ল্যাকমেইল করে অর্থ আদায়, প্রতিশোধ নেওয়া অথবা সামাজিকভাবে ধ্বংস করে দেওয়া।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলেন, কারও সম্মতি ছাড়া ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিও প্রকাশ, ছবি বিকৃত করে প্রচার, ভুয়া পরিচয়ে অপপ্রচার চালানো, মোবাইল নম্বর প্রকাশ করে হয়রানি করা কিংবা ব্ল্যাকমেইল করা, এসব বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে শাস্তিযোগ্য অপরাধ। সাইবার নিরাপত্তা আইন, ২০২৩, দণ্ডবিধি এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১২ অনুযায়ী অপরাধের ধরনভেদে কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কোনো ব্যক্তির সম্মান নষ্ট করার প্ল্যাটফর্ম নয়। অথচ বিকৃত রুচির কিছু মানুষ এটিকে প্রতিশোধের অস্ত্রে পরিণত করেছে। এ ধরনের অপরাধীরা শুধু আইন ভঙ্গই করছে না, একজন নারীর জীবন, পরিবার ও ভবিষ্যৎ ধ্বংস করে দিচ্ছে।
সচেতন নাগরিকদের মতে, যে ব্যক্তি একজন নারীর ছবি বা ভিডিও ব্যবহার করে তাকে সমাজের কাছে হেয় প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করে, সে শুধু একজন ব্যক্তির নয়, পুরো সমাজের বিরুদ্ধে অপরাধ করছে। এমন সাইবার সন্ত্রাসীদের কোনো ছাড় দেওয়া উচিত নয়। দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলেন, ভুক্তভোগীরা যেন ভয় বা লজ্জায় নীরব না থাকেন। প্রমাণ সংরক্ষণ করে দ্রুত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাইবার ইউনিটে অভিযোগ করলে অপরাধীদের শনাক্ত ও বিচারের আওতায় আনা সহজ হয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একজন নারীর সম্মান নিয়ে ছিনিমিনি খেলা কোনো মতেই মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নয়, এটি একটি গুরুতর সাইবার অপরাধ। এই অপরাধ বন্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ, দ্রুত বিচার, প্রযুক্তিগত নজরদারি এবং সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির বিকল্প নেই। অন্যথায় প্রতিদিনই নতুন নতুন নারী এই নৃশংস ডিজিটাল হয়রানির শিকার হবেন, যা একটি সভ্য সমাজের জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয়।
Leave a Reply