চট্টগ্রামের বন্দর এলাকায় নেশার টাকার জন্য স্ত্রীকে নির্মমভাবে মারধরের ঘটনায় পপি তালুকদার (২২) নামের এক গৃহবধূর মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় ঘটনার মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই তার স্বামী উজ্জ্বল চন্দ্র মিত্র (২৯)-কে গ্রেফতার করেছে পুলিশ, যা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তাৎক্ষণিক ও কার্যকর অভিযানের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, নিহত পপি তালুকদার সিইপিজেডস্থ ইয়ং ওয়ান গার্মেন্টসে কর্মরত ছিলেন। তার স্বামী উজ্জ্বল চন্দ্র মিত্র পূর্বে চাকরি করলেও বর্তমানে বেকার এবং দীর্ঘদিন ধরে মাদক ও জুয়ায় আসক্ত ছিল। নেশা ও জুয়ার টাকার জন্য সে প্রায়ই স্ত্রীকে শারীরিকভাবে নির্যাতন করতো।
ঘটনার দিন ১ মে ২০২৬ তারিখ রাত আনুমানিক ৯টা ৩০ মিনিটে চট্টগ্রাম মহানগরের বন্দর থানাধীন তাদের বাসায় উজ্জ্বল তার স্ত্রীর কাছে নেশার টাকা দাবি করে। পপি তালুকদার টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাদের মধ্যে বাকবিতণ্ডা শুরু হয়। একপর্যায়ে ক্ষিপ্ত হয়ে উজ্জ্বল চন্দ্র মিত্র পপির শরীরের বিভিন্ন স্থানে এলোপাতাড়ি কিল-ঘুষি ও লাথি মারতে থাকে। এতে পপি তালুকদার গুরুতর আহত হয়ে ঘটনাস্থলেই অচেতন হয়ে পড়েন।
রাত আনুমানিক ১১টা ৫০ মিনিটে অভিযুক্ত উজ্জ্বল স্থানীয় চিকিৎসক মোঃ আবুল খায়েরকে বাসায় নিয়ে আসে। চিকিৎসক পপির শারীরিক অবস্থা পরীক্ষা করে তার হৃদস্পন্দন বন্ধ হয়ে গেছে বলে জানান এবং দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেন। তবে অভিযুক্ত স্বামী তাকে হাসপাতালে না নিয়ে ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়।
পরে খবর পেয়ে অভিযুক্তের বোন তৃপ্তি (৪৫) ও ভাগিনা সুব্রত সরকার (২১) স্থানীয় লোকজনের সহায়তায় পপিকে উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে কর্তব্যরত জরুরি বিভাগের চিকিৎসক ডা. নিবেদিতা ঘোষ পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে পপি তালুকদারকে মৃত ঘোষণা করেন।
এ ঘটনায় বন্দর থানায় হত্যা মামলা রুজু করা হয়। চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) বন্দর বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার মোঃ আমিরুল ইসলামের সার্বিক দিকনির্দেশনায়, অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (বন্দর) এবং সহকারী পুলিশ কমিশনার (বন্দর জোন)-এর তত্ত্বাবধানে বন্দর থানার অফিসার ইনচার্জ মোঃ আবদুর রহিমের নেতৃত্বে একটি চৌকস টিম দ্রুত অভিযান পরিচালনা করে। বিশ্বস্ত গুপ্তচর সূত্র ও তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় ঘটনার পরপরই আসামির অবস্থান শনাক্ত করা হয় এবং টানা অভিযান চালিয়ে ২ মে ২০২৬ রাত ১০টা ২০ মিনিটে নগরীর ২ নম্বর মাইলের মাথা এলাকা থেকে উজ্জ্বল চন্দ্র মিত্রকে গ্রেফতার করা হয়। দ্রুততম সময়ে এ গ্রেফতার অভিযানে পুলিশের পেশাদারিত্ব ও তৎপরতা বিশেষভাবে প্রশংসিত হচ্ছে।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতারকৃত আসামি ঘটনার সাথে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে। সে জানায়, নেশার টাকা না পেয়ে ক্ষোভে স্ত্রীকে মারধর করে এবং পরবর্তীতে তার অবস্থা গুরুতর দেখে ভয় পেয়ে পালিয়ে যায়।
গ্রেফতারকৃত উজ্জ্বল চন্দ্র মিত্র (২৯), পিতা-মৃত সুভাষ চন্দ্র মিত্র, মাতা-আরতি রানী, স্থায়ী ঠিকানা বরগুনা জেলার পাথরঘাটা থানার রূপধন এলাকায়। বর্তমানে তিনি চট্টগ্রাম মহানগরের বন্দর থানাধীন ওয়াশিল চৌধুরীপাড়া এলাকার আব্বাস মিয়ার বিল্ডিংয়ের ৪র্থ তলায় বসবাস করতেন। তার বিরুদ্ধে বন্দর থানার মামলা নং-০১, তারিখ: ০২/০৫/২০২৬, ধারা ৩০২ পেনাল কোড ১৮৬০ অনুযায়ী মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং তাকে বিজ্ঞ আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে।
এই মর্মান্তিক ঘটনা আবারও প্রমাণ করে, মাদক ও জুয়া শুধু ব্যক্তিজীবন নয়, পারিবারিক নিরাপত্তা ও সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্যও মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, এ ধরনের অপরাধ প্রতিরোধে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি জরুরি।
Leave a Reply