“সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং বিজ্ঞ আদালতে সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী; বাংলাদেশ সংবিধানের ২৭ ও ৩১ অনুচ্ছেদে এমনটিই বলা হয়েছে। কিন্তু দেশের দরিদ্র বিচারপ্রার্থীরা যখন নিজেদের অধিকার রক্ষার্থে অর্থের অভাবে আইনগত সহায়তা পান না, তখন মৌলিক অধিকারের এই সাংবিধানিক অঙ্গীকারটি অর্থহীন বলে মনে হয়। বাংলাদেশ সরকার দরিদ্র বিচারপ্রার্থীদের সাংবিধানিক এই অধিকার নিশ্চিতের লক্ষ্যে এবং আইনগত সহায়তা প্রদানের উদ্দেশ্যে ‘আইনগত সহায়তা প্রদান আইন- ২০০০’ পাশ করেন। অসহায় দরিদ্র জনগণ এখন বিনা পয়সায় বিচার পাওয়ার অধিকার রাখেন। আর এই বিষয়টি জনগণকে জানাতে এবং বিচারকার্যে সহায়তা করতে ২০১৩ সালে ২৮ এপ্রিলকে ‘জাতীয় আইনগত সহায়তা দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করেন। টাকার অভাবে এখন আর কেউ ন্যায়বিচার পাওয়া থেকে বঞ্চিত হবেন না।”
এমন বক্তব্যের মধ্য দিয়েই সকলের উদ্দেশ্যে বরগুনা জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিজ্ঞ সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ এবং জেলা লিগ্যাল এইড এর চেয়ারম্যান মোঃ সাইফুর রহমান এসব কথা বলেন।
তিনি আরও বলেন- “বাংলাদেশের প্রতিটি গরিব, সহায়-সম্বলহীন মানুষ সরকারের এই ইতিবাচক কর্মসূচির আওতায় এসে তাদের আইনী অধিকার প্রতিষ্ঠিত করতে পারবে, সে ব্যাপারে আমরা আশাবাদী। এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই ন্যায়বিচারকে আরও অধিকতর ত্বরান্বিত করা সম্ভব এবং সামাজিক ন্যায়বিচার পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে একটি উদার ও গণতান্ত্রিক এবং কল্যাণকতর রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ বিশে^র দরবারে একদিন মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে বলে আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ^াস করি।”
‘সরকারি খরচে বিরোধ শেষ, সবার আগে বাংলাদেশ’ এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে সারা দেশের ন্যায় বরগুনায় আইনগত সহায়তা প্রদান অধিদপ্তর, জেলা কমিটির আয়োজনে মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) সকাল ৯টার দিকে জেলা ও দায়রা জজ আদালত প্রাঙ্গণে বেলুন ও শান্তির প্রতীক সাদা পায়রা উড়িয়ে অনুষ্ঠানের সূচনা করেন। পরে আদালত চত্বর থেকে একটি র্যালি বের হয়ে শহরের প্রধান সড়কগুলো প্রদক্ষিণ শেষে জেলা ও দায়রা জজ আদালত চত্বরে শেষ করে আদালত প্রাঙ্গণে গাছের চারা রোপন করে জগন্নাথ পাঁড়ে স্মৃতি মঞ্চে আলোচনা সভায় মিলিত হন। আলোচনা সভা শেষে দিবসটিকে কেন্দ্র করে রক্ত দান কর্মসূচির উদ্বোধন করেন। এসময় জেলা ও দায়রা জজ আদালতের স্টেনো মোঃ আমান উল্লাহ্ -কে রক্ত দান করতে দেখা যায়।
জাতীয় আইনগত সহায়তা দিবসের আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন- সিনিয়র জেলা ও দায়রা জজ এবং জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থা’র জেলা কমিটি’র চেয়ারম্যান মোঃ সাইফুর রহমান।
অনুষ্ঠানের শুরুতে ‘জাতীয় আইনগত সহায়তা দিবসের’ উদ্দেশ্য বর্ণনা করে আলোচনা সভায় স্বাগত বক্তব্য রাখেন- বরগুনা জেলা লিগ্যাল এইড কমিটি’র সদস্য সচিব ও জেলা লিগ্যাল এইড কর্মকর্তা সিনিয়র সিভিল জজ এম. এ. আজহারুল ইসলাম।
বিজ্ঞ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মোঃ রানা শেখ -এর সঞ্চালনায় আলোচনা সভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন- বরগুনা জেলা ও দায়রা জজ আদালত’র নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল’র বিজ্ঞ বিচারক মোঃ ওসমান গণি, বিজ্ঞ চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মোঃ ইকবাল মাসুদ, বিজ্ঞ অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ শহিদুল ইসলাম, অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম ও রাজস্ব) সজল চন্দ্র শীল, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) মোঃ মুকিত হাসান খাঁন, জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি ও পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাড. মোঃ নুরুল আমিন, গভর্নমেন্ট প্লিডার (জিপি) অ্যাড. মোঃ আবদুল মজিদ তালুকদার ও জেলা আইনজীবী সমিতি’র সদস্য সচিব অ্যাড. মনোয়ারা আক্তার।
‘জাতীয় আইনগত সহায়তা দিবস’ উপলক্ষ্যে আয়োজিত র্যালি ও আলোচনা সভায় বিচার বিভাগ’র বিজ্ঞ বিচারকগণ, জেলার বিজ্ঞ আইজীবীগণ, সরকারি দপ্তর’র প্রধানগণ ও বেসরকারি দপ্তরের মধ্যে সংগ্রামসহ অন্যান্য দপ্তরের প্রতিনিধিগণ, বরগুনা প্রেসক্লাব’র সভাপতি মোঃ হাফিজুর রহমান, প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকবৃন্দ অংশগ্রহণ করেন।
এ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সভাপতি ‘জাতীয় আইনগত সহায়তা দিবস ২০২৬’ সালে সেরা প্যানেল আইনজীবী হিসেবে নির্বাচিত অ্যাড. এ, কিউ, ফারুক ও অ্যাড. মনোয়ারা আক্তার এর হাতে শুভেচ্ছা স্মারক ও অর্থ পুরস্কার তুলে দেন।
এ আলোচনা সভায় সুবিধাভোগী মোঃ মনিরুল ইসলাম ও মোসাঃ রেবা তাদের সমস্যা ও সমাধানের বিষয়টি সকলের সামনে উপস্থাপন করেন। একই সাথে সরাসরি মামলায় না গিয়ে লিগ্যাল এইড অফিসের মাধ্যমে অসহায়, নিপিড়ীত ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের সমস্যার সমাধান করার জন্য অনুরোধ করেন এই সুবিধাভোগী ব্যক্তিদ্বয়।
সর্বশেষ আশ্রয়স্থল হিসেবে একমাত্র আইন আদালতের মাধ্যমেই মানুষ তার ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারে। বিষয়টি মাথায় রেখেই গড়ে তোলা হয়েছে জাতীয় আইনগত সহায়তা কেন্দ্র। মামলার জটিলতা এড়াতে এই সংস্থাটি খুব সুন্দর ও সঠিকভাবে সমস্যা সমাধান করে থাকে। এর জন্য প্রতিটি জেলায় জেলা ও দায়রা জজ আদালতের একজন সিনিয়র সহকারী সিভিল জজকে নিয়োগ করা হয়ে থাকে।
এই কর্মকর্তার কাছে আসা অভিযোগের ভিত্তিতে উভয় পক্ষকে নোটিসের মাধ্যমে জেলা লিগ্যাল এইড অফিসে হাজির করে উভয় পক্ষের কথার উপরে ভিত্তি করে প্রয়োজনে সরেজমিনে গিয়ে উঠান বৈঠক করে স্থানীয়দের উপস্থিতিতে সমস্যার সমাধান করা হয়। জাতীয় আইনগত সহায়তা দিবস পালন করেই নয়, বরং এর মূল লক্ষ্য অর্জণে আইনের সাথে জড়িত সকল ব্যক্তিকে এগিয়ে আসতে হবে। সমস্যা সমাধানে নিজ উদ্যোগে কাজ করতে হবে। জেলা আইনগত সহায়তা অফিসের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাকে সচেষ্ট থেকে কাজ করতে হবে। সকলের সহযোগিতাই পারবে এ সংস্থার মূল লক্ষ্যে পৌঁছাতে। এমনটাই আশা করছেন সুশীল সমাজের মানুষ।
Leave a Reply