৩০ টনের কন্টেইনারে ৩৫ টন পণ্য; নেপথ্যে শিপিং এজেন্টের জালিয়াতি ও বন্দর কর্তৃপক্ষের নজরদারির অভাব
চট্টগ্রাম বন্দরের চিটাগাং কন্টেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) জেটিতে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া কন্টেইনার ধসের ঘটনার নেপথ্যে বেরিয়ে এসেছে গা শিউরে ওঠার মতো চাঞ্চল্যকর তথ্য। নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে ধারণক্ষমতার চেয়ে অতিরিক্ত পণ্য বোঝাই এবং কন্টেইনারের ভেতরে ওজনের ভারসাম্যহীনতার কারণেই মূলত এই দুর্ঘটনা ঘটেছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ৪০ ফুটের যে কন্টেইনারটির সর্বোচ্চ ধারণক্ষমতা ৩০ টন, সেটিতে বোঝাই করা হয়েছিল প্রায় ৩৫ টন পণ্য। আর এই ভয়াবহ জালিয়াতির দায় সরাসরি চেপেছে শিপিং এজেন্ট ‘সী কনসোর্টিয়াম’ এবং ‘মায়েরস্ক লাইনে’র ঘাড়ে।
গত শনিবার রাত ৮টায় সিসিটি’র ৩ নম্বর জেটিতে নোঙর করা ‘চেং হাই’ জাহাজ থেকে ৪ নম্বর কি গ্যান্ট্রি ক্রেনের (কিউজিসি) মাধ্যমে কন্টেইনার নামানোর সময় এই দুর্ঘটনা ঘটে। কন্টেইনারটি বেসরকারি ডিপো ‘ইনকনট্রেড’-এ নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রাইম মুভারে তোলার কথা ছিল। কিন্তু লরিতে তোলার আগেই বিকট শব্দে কন্টেইনারটি ছিঁড়ে পণ্য ধসে পড়ে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ অনুযায়ী, কন্টেইনারটি একপাশ থেকে ঠিক ‘কাপড় ছেঁড়ার মতো’ ফেটে যায়। কন্টেইনার ধরে নামানোর জন্য স্প্রেডারে থাকা চারটি হুকের একটি ছিঁড়ে গেলেও বাকি তিনটি সঠিক অবস্থানে ছিল।
কাগজের হিসাব বনাম বাস্তব: ১৫ টনের শুভঙ্করের ফাঁকি!
নথিপত্র ঘেঁটে দেখা যায়, মায়েরস্ক লাইনের ওই ৪০ ফুট দীর্ঘ কন্টেইনারটিতে আমদানিকারক পৌনে ২০ টন পণ্য আনার ঘোষণা দিয়েছিলেন। কিন্তু দুর্ঘটনার পর রবিবার চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ওজন মেপে দেখতে পায় সেখানে পণ্য রয়েছে ৩৫ টন। অর্থাৎ, কাস্টমস ও বন্দর কর্তৃপক্ষকে ফাঁকি দিয়ে কোনো ঘোষণা বা অনুমতি ছাড়াই অতিরিক্ত ১৫ টন পণ্য আনা হয়েছে। কন্টেইনারটিতে মোট ৭টি বড় গাছের গুঁড়ি (লগ) ছিল, যার মধ্যে শুধু একটি গাছের ওজনই ছিল ৭ টন।
গ্যান্ট্রি ক্রেনের দায় নেই, গলদ ভারসাম্যহীনতায়!
বন্দরের একজন অভিজ্ঞ গ্যান্ট্রি ক্রেন চালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, “স্প্রেডারের প্রতিটি হুক ১০ টন করে মোট ৪০ টন ওজন বহনে সক্ষম। তাই ক্রেনের যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে এটি হয়নি। কন্টেইনারের ভেতরে গাছের গুঁড়িগুলো ভারসাম্য বজায় রেখে (ব্যালান্সড) রাখা হয়নি। ক্রেন দিয়ে তোলার সাথে সাথেই ভার একদিকে বেশি হওয়ায় কন্টেইনারটি কাত হয়ে ছিঁড়ে যায়।”
তদারকিহীন বন্দর: দুর্ঘটনার পর ‘হইচই’
অনুসন্ধানে জানা গেছে, চট্টগ্রাম বন্দরে ৪০ ফুটের কন্টেইনারে সর্বোচ্চ ৩০ হাজার ৪৮০ কেজি পণ্য পরিবহনের নিয়ম রয়েছে। আগে মুচলেকা দিয়ে বাড়তি পণ্য আমদানির সুযোগ থাকলেও কয়েক বছর আগে সেই নিয়ম বাতিল করা হয়। নিয়ম বাতিলের পর থেকে বন্দর কর্তৃপক্ষ কন্টেইনারের ধারণক্ষমতা যাচাইয়ের বিষয়টি পুরোপুরি ছেড়ে দিয়েছে কন্টেইনার পরিবহনকারী কোম্পানির ওপর। ফলে, কন্টেইনারে অতিরিক্ত পণ্য আছে কি না, তা জাহাজ থেকে নামানোর আগে কেউ যাচাই করে না। কেবল বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটলেই টনক নড়ে কর্তৃপক্ষের।
অলৌকিকভাবে রক্ষা পেল ৫ প্রাণ!
দুর্ঘটনাস্থলে উপস্থিত এক ট্রাকচালক জানান, দুর্ঘটনার সময় গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি থাকায় গ্যান্ট্রি ক্রেনের নিচে দায়িত্বরত অন্তত পাঁচজন কর্মী একটু দূরে সরে দাঁড়িয়েছিলেন। অন্যথায় কন্টেইনারটি সরাসরি তাদের গায়ের ওপর পড়ত। অন্যদিকে, কন্টেইনারটি যখন প্রাইম মুভারের চেসিসের ওপর ধসে পড়ে, তখন চালক ভেতরে বসা থাকলেও অলৌকিকভাবে অক্ষত অবস্থায় বেঁচে যান।
এই গুরুতর অনিয়ম ও গাফিলতির বিষয়ে অভিযুক্ত শিপিং এজেন্ট ‘সী কনসোর্টিয়াম’ এবং ‘মায়েরস্ক লাইনে’র কর্মকর্তাদের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা গণমাধ্যমের সামনে কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করতে রাজি হননি।
এদিকে, দুর্ঘটনা তদন্তে টার্মিনাল ম্যানেজার মুহাম্মদ আনিস উদ্দিন আহমদকে প্রধান করে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। তবে তদন্তের অগ্রগতি এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, সে বিষয়ে জানতে তার মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি কোনো সাড়া দেননি।
বন্দর ব্যবহারকারীদের দাবি, এই ঘটনায় জড়িত শিপিং এজেন্ট ও আমদানিকারকের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হলে ভবিষ্যতে চট্টগ্রাম বন্দরের ভেতরে আরও বড় ধরনের প্রাণহানির আশঙ্কা থেকে যাবে।
Leave a Reply