বেসরকারী টিভি চ্যানেল একাত্তর টেলিভিশন ও বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কমের জামালপুর ডিস্ট্রিক্ট করেসপন্ডেন্ট গোলাম রাব্বানী নাদিমকে নৃশংস হত্যার ঘটনায় বকশীগঞ্জ সদর উপজেলার সাধুরপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান ও আওয়ামীলীগের বহিস্কৃত নেতা মাহমুদুল আলম বাবুসহ ২২ জনের নাম উল্লেখপূর্বক মামলা হয়েছে বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
শনিবার (১৭ জুন) বকশীগঞ্জ থানায় নিহত সাংবাদিক নাদিমের স্ত্রী মনিরা বেগম এ মামলা দায়ের করেন।
এদিকে, গোলাম রাব্বানী নাদিমকে নৃশংস ভাবে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় তীব্র নিন্দা, প্রতিবাদ ও দ্রুত আইনের আওতায় এনে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার দাবিতে গর্জে উঠেছে সারাদেশের গণমাধ্যমকর্মীরা।
এর আগে প্রধান অভিযুক্ত ইউপি চেয়ারম্যান ও সদ্য বহিষ্কৃত আওয়ামী লীগ নেতা মাহমুদুল আলম বাবু পঞ্চগড় এলাকা থেকে আটক করে র্যাব।
মাহমুদুল আলম বাবুকে আটকের বিষয়টি নিশ্চিত করে র্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন সাংবাদিকদের বলেন, র্যাব-১৪ ও র্যাব সদর দপ্তরের গোয়েন্দা শাখার নেতৃত্বে বাবুকে আটক করা হয়েছে। এ বিষয়ে পরবর্তী আইনানুগ ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে বলেও তিনি নিশ্চিত করেন।
উল্লেখ্য, সংবাদ প্রকাশকে কেন্দ্র করে সাংবাদিক গোলাম রাব্বানী নাদিম বুধবার রাত ১০টার দিকে বকশীগঞ্জ বাজারের পাটহাটি এলাকায় সাধুরপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মাহমুদুল আলম বাবুর সশস্ত্র সন্ত্রাসী বাহিনীর হাতে হামলার শিকার হন।
বৃহস্পতিবার বিকেল পৌনে ৩টার দিকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। ময়নাতদন্ত শেষে রাত ১০টায় তার মরদেহ পৌর শহরের বাসায় আসে।
শুক্রবার সকাল ১০টায় বকশীগঞ্জ নুর মুহাম্মদ উচ্চবিদ্যালয় মাঠে প্রথম জানাজা ও গুমেরচর জিগাতলা ঈদগাহ মাঠে দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে গ্রামের বাড়ি নিলাক্ষিয়া ইউনিয়নে গুমেরচরে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে সমাহিত করা হয়।
এদিকে, সাংবাদিক নাদিম হত্যার ঘটনায় সারাদেশ জুড়ে তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ জানিয়ে মানববন্ধন সহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করছে বিভিন্ন সাংবাদিক-সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সংগঠন। এসব কর্মসূচি থেকে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, নিহত নাদিম সহ পূর্বে নিহত সাংবাদিকদের হত্যাকারীদের দ্রুত গ্রেফতার ও কঠোর শাস্তির দাবি জানান সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।
এরআগে গতকাল ১৬ জুন (শুক্রবার) টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, বিচারহীনতা ভোগ করবেন, এমন পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে। মুক্ত সাংবাদিকতার এই সংকট নিরসনে সরকারের যদি সদিচ্ছা থাকে তবে তার দৃষ্টান্ত হিসেবে সুষ্ঠু তদন্তপূর্বক সরাসরি জড়িতদের পাশাপাশি যাদের নির্দেশে, যোগসাজসে ও যাদের স্বার্থ সুরক্ষায় সাংবাদিক গোলাম রব্বানিকে হত্যা করা হয়েছে, তাদের সবার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম স্বাধীনতা সূচক ২০২৩-এ ১৮০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান আগের বছর থেকে এক ধাপ নেমে ১৬৩ হয়েছে উল্লেখ করে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক আরও বলেন, গত দুই বছরে বাংলাদেশ ১১ ধাপ ও ১৪ বছরে ৪২ ধাপ নিচে নেমেছে। যে বিষয়গুলোর ওপর এই সূচক নির্ধারিত হয়, তার অন্যতম একটি হলো সাংবাদিকের নিরাপত্তা। আর ঠিক সেখানেই বাংলাদেশের স্কোর হতাশাজনকভাবে কম। সূচকের পাশাপাশি প্রায় নিয়মিতভাবে সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনা প্রমাণ করে বাংলাদেশ মুক্ত সাংবাদিকতা ও সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতের মাধ্যমে কী ধরনের বিব্রতকর অবস্থানে রয়েছে।
তিনি বলেন, সাংবাদিক নির্যাতন করলে এমনকি হত্যা করলে যে কোনো শাস্তি হয় না, এমন ধারণা এক প্রকার প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ড থেকে শুরু করে সর্বশেষ জামালপুরে গোলাম রব্বানি হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে এমন ধারণাও প্রতিষ্ঠিত হওয়া অমূলক নয় যে, গণমাধ্যমের কণ্ঠস্বর রোধে যে কোনো কিছুই করা যায়। যার মোক্ষম হাতিয়ার হিসেবে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন তো রয়েছেই। এমন অবস্থা থেকে উত্তরণের দায় সরকারের।
ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, গোলাম রব্বানিসহ সব সাংবাদিক হত্যা ও নির্যাতনের সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে, অবিলম্বে অভূতপূর্ব নিবর্তনমূলক ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিল করতে হবে।
Leave a Reply