টানা কয়েক দিনের অতিবৃষ্টি ও বন্যায় রংপুরের বিভিন্ন এলাকায় কৃষিজমি পানিতে তলিয়ে গেছে। এতে আমনের বীজতলা, সদ্য রোপণ করা ধানের চারা, গ্রীষ্মকালীন সবজিখেত ও অন্যান্য ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ভেসে গেছে মাছের ঘের। বিপাকে পড়েছেন পোলট্রি ও গবাদিপশুর খামারিরাও।আবহাওয়া অধিদপ্তরের রংপুর আঞ্চলিক কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী গত জুন মাসে রংপুরে বৃষ্টিপাত হয়েছে ৩৩০ মিলিমিটার এর গত তারিখ পর্যন্ত বৃষ্টিপাত হয়েছে ৩০২ মিলিমিটার।
অন্যদিকে, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত রোববার পর্যন্ত রংপুরে মোট ৮ হাজার ৩৫০ হেক্টর জমিতে আমনের বীজতলা রয়েছে এর মধ্যে ৬৬৮০ হেক্টর জমিতে এখন পর্যন্ত ধান রোপন করা হয়েছে চলতি মৌসুমে রংপুর জেলায় ১ লাখ ৬৬৯৫০ হেক্টর জমিতে আমন চাষের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে।
রংপুরের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, অনেক কৃষিজমিতে হাঁটুপানি জমে আছে। কোথাও তলিয়ে গেছে আমনের বীজতলা, আবার কোথাও সদ্য রোপণ করা ধানের চারা পানির নিচে ডুবে আছে। কয়েক দিনের মধ্যে পানি না নামলে এসব ফসলের ক্ষতি আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন কৃষকরা।
রংপুর সদর উপজেলার এক কৃষক বলেন, ‘অনেক কষ্ট করে বীজতলা তৈরি করেছিলাম। ধান রোপণের প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। কিন্তু কয়েক দিনের বৃষ্টিতে সব পানির নিচে চলে গেছে। পানি দ্রুত না নামলে নতুন করে বীজ কিনে বীজতলা তৈরি করতে হবে। এতে বাড়তি খরচ হবে, আবার ধান রোপণেও দেরি হবে।’
মিঠাপুকুর উপজেলার আরেক কৃষক বলেন, ‘সবজি চাষ করে সংসারের খরচ চালাই। বৃষ্টির পানিতে লাউ, পটোল, মরিচসহ বিভিন্ন সবজির খেত নষ্ট হয়েছে। জমিতে পানি জমে থাকায় গাছগুলো পচে যাচ্ছে। এখন ফসলের ক্ষতি যেমন হচ্ছে, তেমনি বাজারে সবজির দাম বাড়ারও আশঙ্কা আছে।’
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত রোববার পর্যন্ত রংপুরে ৮ হাজার ৩৫০ হেক্টর জমিতে আমনের বীজতলা ছিল। এর মধ্যে ৬ হাজার ৬৮০ হেক্টর জমিতে ধান রোপণ করা হয়েছে। চলতি মৌসুমে রংপুর জেলায় ১ লাখ ৬৬ হাজার ৯৫০ হেক্টর জমিতে আমন চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে কৃষি উৎপাদনে ক্ষতির পরিমাণ দ্রুত বাড়তে পারে। এর প্রভাব পড়তে পারে কৃষিপণ্যের সরবরাহ, বাজারব্যবস্থা ও খাদ্যপণ্যের দামে। তাই দ্রুত ক্ষয়ক্ষতির মূল্যায়ন, কৃষকদের পুনর্বাসন এবং বীজ ও কৃষি উপকরণ সহায়তা দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তারা।
কৃষি অর্থনীতিবিদরা বলছেন, অনেক কৃষক নিজেদের জমিতে চাষের পাশাপাশি বিক্রির উদ্দেশ্যেও ধান ও বিভিন্ন সবজির বীজতলা তৈরি করেন। ফলে বীজতলা নষ্ট হলে তারা সরাসরি আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়বেন। তবে ক্ষতির প্রকৃত মাত্রা নির্ভর করবে বন্যার পানি কতদিন স্থায়ী হয় তার ওপর।
ধান গবেষকদের মতে, আমনের বীজতলা ক্ষতিগ্রস্ত হলে নতুন করে বীজতলা তৈরি করা সম্ভব হলেও ডুবে যাওয়া আউশ ধানের ক্ষতি অনেক ক্ষেত্রে পুষিয়ে নেওয়া কঠিন। বিশেষ করে ধান যদি মিল্ক স্টেজে থাকে, তখন ক্ষতির মাত্রা সবচেয়ে বেশি হয়। দীর্ঘ সময় পানির নিচে থাকলে অপরিপক্ব ধান ও দানা পচে যেতে পারে।
ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) রংপুর আঞ্চলিক কার্যালয়ের প্রিন্সিপাল সায়েন্টিফিক অফিসার ও অফিস প্রধান ড. মো. রকিবুল হাসান বলেন, প্লাবিত জমির পানি নামলে সংরক্ষিত চারা রোপণ করতে হবে। চারা নষ্ট হয়ে থাকলে শ্রাবণের ১০–১৫ তারিখের মধ্যে আগাম জাতের (যেমন: ব্রি ধান ৭৫, বিনা ধান ১৭ বা হাইব্রিড) বীজতলা তৈরি করে ২০–২৫ দিন বয়সের চারা রোপণ করা সম্ভব।
নিচু এলাকার জন্য আলোক সংবেদনশীল বিআর ২২, ব্রি ৩৪ এবং স্থানীয় গাঞ্জিয়া, মালশিরা ও নাজিরশাইল উপযোগী।
রংপুর অঞ্চলের জন্য নতুন উদ্ভাবিত ব্রি ধান ১১০ জাতটির জীবনকাল ১২২ দিন। রোপণের পর টানা ২১ দিন পানিতে নিমজ্জিত থাকলেও এটি ১০০% বেঁচে থাকে, যা বন্যার আর্থিক ক্ষতি কমাবে বলে জানান তিনি।
গঙ্গাচড়া উপজেলার এক কৃষক বলেন, ‘বন্যার পানি বাড়লে শুধু ধান বা সবজির ক্ষতি হয় না, মাছের ঘেরও ভেসে যায়। এবার অনেকের পুকুর ও ঘেরের মাছ বের হয়ে গেছে। কৃষকের ক্ষতি হলে শুধু ফসলের ক্ষতি হয় না, পুরো পরিবারের আয়-রোজগারে টান পড়ে।’
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় অতিবৃষ্টি ও দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতার প্রবণতা বাড়ছে। ফলে কৃষি উৎপাদনের ঝুঁকিও বাড়ছে। প্রতি বছর বন্যা ও অতিবৃষ্টিতে ফসলের ক্ষতি হলেও এর প্রভাব শুধু মাঠে সীমাবদ্ধ থাকে না; পরবর্তী সময়ে খাদ্য উৎপাদন, সরবরাহব্যবস্থা ও বাজারেও এর প্রভাব পড়ে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, কোনো ফসল আক্রান্ত হলেই তা সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে—এমনটি ধরে নেওয়া ঠিক নয়। ক্ষতির প্রকৃত মাত্রা নির্ভর করবে জমিতে পানি কতদিন স্থায়ী থাকে তার ওপর। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় কৃষকদের সঙ্গে কাজ করে দ্রুত পরিস্থিতি মোকাবিলার চেষ্টা চলছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বন্যাকে এখন আর শুধু প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে দেখলে চলবে না; কৃষি পরিকল্পনার স্থায়ী বাস্তবতা হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। আগাম সতর্কবার্তা জোরদার, জলবায়ু-সহনশীল জাতের সম্প্রসারণ, দ্রুত পুনর্বাসন এবং ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সহজ শর্তে আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত করাই হতে পারে ক্ষতি কমানোর কার্যকর উপায়।
Leave a Reply