1. admin@gmail.com : দৈনিক আমার সময় : দৈনিক আমার সময়
  2. admin@dailyamarsomoy.com : admin :
নির্বাচনি প্রচারণায় অসহিষ্ণুতা বাগযুদ্ধে তপ্ত হচ্ছে রাজনীতি - দৈনিক আমার সময়

নির্বাচনি প্রচারণায় অসহিষ্ণুতা বাগযুদ্ধে তপ্ত হচ্ছে রাজনীতি

অনলাইন ডেক্স
    প্রকাশিত : রবিবার, ২৫ জানুয়ারী, ২০২৬

“ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের রাজনীতি কিছুটা অসহিষ্ণু হয়ে উঠছে। নির্বাচনি প্রচারের সময় প্রার্থীদের বক্তব্যে প্রকাশ পাচ্ছে এই অসহিষ্ণুতা। বিভিন্ন ইস্যুতে শুরু থেকেই রাজনৈতিক দলের নেতাদের মধ্যে বাগযুদ্ধ শুরু হয়। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপিসহ অন্যান্য দলের শীর্ষ নেতা ও প্রার্থীরা একে অন্যকে নিশানা করে ছুড়ছেন নানা অভিযোগের তির।”

কড়া ভাষায় প্রতিপক্ষের নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির সমালোচনা করছেন তারা। টেনে আনা হচ্ছে ধর্ম এবং মহান স্বাধীনতা যুদ্ধকেও। দিন যতই যাচ্ছে এই কথার লড়াই আরও তীব্র হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ব্যক্তিগত আক্রমণও। সরাসরি না হলেও ইঙ্গিতপূর্ণ হুমকি-ধমকির ঘটনাও ক্রমশ বাড়ছে। কেউ কেউ তুলছেন ষড়যন্ত্রের অভিযোগও।

এছাড়া প্রচারণাকে কেন্দ্র করে কেরানীগঞ্জে গোলাগুলি এবং ঢাকায় প্রার্থীর ওপর ডিম ও ময়লা পানি নিক্ষেপের ঘটনায় রাজনৈতিক বৈরিতার নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

রাজনীতি বিশ্লেষকরা বলছেন, ভোটের মাঠে প্রতিশ্রুতির প্রতিযোগিতায় একে অন্যের বিরুদ্ধে বিষোদগার করতেও ছাড়ছে না। তারা আরও বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক নেতাদের দায়িত্বশীল আচরণ ও বক্তব্যের প্রত্যাশা ছিল। কিন্তু প্রচারণার প্রথম দু-তিন দিনে যেটা হলো তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। আসলে ভোটের পরিবেশটা আগের মতোই হতে যাচ্ছে। এই ধারা থেকে বেরিয়ে না এলে সামনের দিনগুলোর ভোটের পরিবেশ নিয়ে খুব বেশি আশাবাদী হতেও পারছেন না তারা।

জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ আইনুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, ভোটের মাঠে নানা বিষয়কে কেন্দ্র করে সবাই অসহিষ্ণু হয়ে উঠছে কিংবা একে অন্যের বিরুদ্ধে বিষোদগার করছে। জুলাইয়ের পরে যে ধরনের সহযোগিতা বা ঐক্য আমরা দেখতে পেয়েছিলাম, সেটা এখন আর নেই। ভোটের পরিবেশটা আগের মতোই হতে যাচ্ছে। গণতন্ত্রকে সুদৃঢ় করার যে প্রত্যয় কিংবা জুলাইয়ের যে সনদ সেটি অনেকেই এখন ভুলতে বসেছে বলে মনে হয়। অর্থাৎ যেসব প্রত্যাশা জাতি করেছিল, এখন নির্বাচনি প্রচারণায় সেটা আর দেখা যাচ্ছে না। প্রত্যেকেই আলাদা আলাদাভাবে তাদের এজেন্ডাগুলো সেট করছে।”

তিনি আরও বলেন, আগে হয়তো একটা পার্টি ছিল, যেটা এখন নেই। কিন্তু এখন বিএনপি এবং জামায়াতের মধ্যেই ইস্যুগুলোকে ডিভাইড করে একটা উত্তপ্ত রাজনৈতিক ক্যাম্পেইন শুরু হয়ে গেছে। আমরা আরও সামনে গেলে হয়তো এগুলো আরও দেখব।”

নির্বাচন কমিশনের সাবেক অতিরিক্ত সচিব এবং নির্বাচন বিশ্লেষক জেসমিন টুলী যুগান্তরকে বলেন, আমরা তো আসলে কোনো ক্ষেত্রেই পুরোনো ধারা থেকে বের হতে পারিনি। আমার মনে হয়, আমাদের রাজনৈতিক দলের নেতাদের কাছ থেকে আরও দায়িত্বশীল বক্তব্য সবাই আশা করছিল। একে অন্যকে নোংরা কাদা ছোড়াছুড়ি না করে তারা তাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ভোটারের কাছে নিয়ে আসবে, এটাই প্রত্যাশিত ছিল। সবাই আশা করেছিল বড় দলগুলোর নেতারা দায়িত্বশীল হবেন এবং একে অন্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে বক্তব্য রাখবেন। কিন্তু শুরুতে প্রথম দু-তিন দিনে যেটা হলো তা তো আর বলার অপেক্ষা রাখে না।”

এখন সামনের দিকে কি হয় সেটা দেখতে হবে। এত মানুষকে কিভাবে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হবে? কিভাবে দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নেওয়া হবে? এটা স্পষ্ট না করে যদি সেই পুরোনো পথেই আমরা হাঁটি, তাহলে সবাই আশাহত হবে। জনগণ ভাববে নতুন কিছু তো পেলাম না।

ভোটের প্রচারের শুরু থেকেই নিজের নানা প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি প্রতিপক্ষকে ইঙ্গিত করে নানা সমালোচনাও করছেন জামায়াতের শীর্ষ নেতারা। শনিবার বগুড়ার ঐতিহাসিক আলতাফুন্নেছা খেলার মাঠে আয়োজিত জনসভায় জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘জামায়াতের লোকেরা অতীতে কখনো চাঁদাবাজি করেনি, বর্তমানে করে না এবং ভবিষ্যতেও করবে না। আমাদের পরিষ্কার ঘোষণা হলো আমরা চাঁদাবাজি করব না, কাউকে করতেও দেব না।”

এর আগে শুক্রবার পঞ্চগড়ের চিনিকল মাঠের জনসভায় বিএনপির নাম উল্লেখ না করলেও ‘ফ্যামিলি কার্ডের’ বিষয়ে ইঙ্গিত করে বক্তব্য রেখেছিলেন জামায়াত আমির। তিনি বলেছিলেন, ‘ভাই, আমাদের কাছে কোনো কার্ড নেই। আপনারা সবাই ভাইবোনেরা আমাদের কার্ড। আপনাদের বুকে আমরা একটা ভালোবাসার কার্ড চাই।”

সরাসরি নাম উল্লেখ না করলেও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ দলটির শীর্ষ নেতাদের নিয়েও ইঙ্গিতপূর্ণ বক্তব্য দিচ্ছেন জামায়াত ও এনসিপির নেতারা। শুক্রবার খুলনায় জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার তারেক রহমানের বক্তব্যের প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন, ‘আমরা ধারণা করেছিলাম, উনি লন্ডনে গেছেন, পড়াশোনা করেছেন, কিছুটা পলিটিক্যাল ম্যাচিউরিটি হয়তো আছে। কিন্তু দেখি যে উনি তো এখন বড় মুফতি হয়ে গেছেন। বিলেত থেকে এসে ফতোয়া দিচ্ছেন, কে মুসলমান আর কে কাফের। এটা বলার তার কোনো অধিকার নেই। রাজনৈতিক নেতা হিসাবে সৌজন্যতা, শিষ্টাচার বোধের জায়গা থেকেও এই কথা বলা যায় না।”

শনিবার সকালে রাজধানীর শাহজাদপুরে নির্বাচনি প্রচারণাকালে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বিএনপির প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন, ‘ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ডের কথা বলে ভোট কেনার এক ধরনের কৌশল তারা করছেন।’ এর আগে নির্বাচনি প্রচারের প্রথম দিন বৃহস্পতিবার ‘ফ্যামিলি কার্ডের বিষয়ে বিএনপির প্রতিশ্রুতির’ সমালোচনা করে তিনি বলেছিলেন, ‘একদিকে তারা কার্ড দেওয়ার কথা বলছেন, আরেক দিকে ঋণখেলাপিদের মনোনয়ন দিচ্ছেন।’ আর শুক্রবার বাড্ডার বাঁশতলা এলাকায় সমাবেশে তিনি বলেছিলেন, ‘১০ দলীয় জোটের গণজোয়ার দেখে একটি বড় দল ভয় পেয়ে বিভ্রান্তি ও আতঙ্ক ছড়াচ্ছে।”

বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর শনিবার নির্বাচনি প্রচারে আবারও স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রসঙ্গ টেনে জামায়াতের তীব্র সমালোচনা করেছেন। ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার আউলিয়াপুর ইউনিয়নে গণসংযোগকালে তিনি বলেন, ‘যারা আজ দাঁড়িপাল্লা নিয়ে ভোট চাইছে, তারা বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল।’ এ সময় জামায়াতকে নিয়ে হিন্দু ভোটাররা ভয়ে আছে বলেও অভিযোগ তোলেন মির্জা ফখরুল।

তিনি বলেন, ‘হিন্দু ভাইদের মধ্যে ভয়-আতঙ্ক কাজ করে। তারা মনে করেন, আমরা যদি অন্য কাউকে ভোট দেই, তাহলে ওরা যদি আমাদের ক্ষতি করে? অনেকে আমাকে বলেছেন, আমরা ধানের শীষে ভোট দিলাম, কিন্তু তারপর তো আপনারা থাকবেন না। তখন যদি দাঁড়িপাল্লার লোকজন আমাদের কিছু করে?”

এদিকে শুক্রবার চকরিয়ায় এক পথসভায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ কোনো দলের নাম উল্লেখ না করে বলেন, ‘যারা ভারতের পক্ষের শক্তি ছিল তারা ভারতে পালিয়েছে। আরেকটি শক্তি বিদেশি শক্তির গোলামি করে, তারা বাংলাদেশে বিভিন্ন রকম বিভ্রান্তি করে রাজনীতি করছে। আমরা বাংলাদেশের শক্তি, বাংলাদেশের মানুষের পক্ষের শক্তি। আমাদের স্লোগান হচ্ছে সবার আগে বাংলাদেশ।”

শনিবার বিকালে মুন্সীগঞ্জের টঙ্গিবাড়ী উপজেলার সোনারং আমতলি মাদ্রাসা মাঠে এক নির্বাচনি জনসভায় বক্তব্য রাখেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মাদ রেজাউল করীম। এ সময় তিনি জামায়াতে ইসলামীকে ইঙ্গিত করে বলেন, ‘ইসলামী আন্দোলন এখন একা নয়, ওরা একা হয়ে গেছে। যারা ইসলামের সাইনবোর্ড লাগিয়ে ষড়যন্ত্র করেছিল, শরিয়া আইনে তারা দেশ পরিচালনা করবে না। তারা ইসলাম থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। ইসলামপ্রিয় মানুষ তাদের ছেড়ে আমাদের সঙ্গে চলে এসেছে। তারা একা হয়ে গেছে।”

এদিকে শুধু শীর্ষ নেতারাই নন, ভোটের মাঠের দল বা জোটের প্রার্থীরাও প্রতিপক্ষকে নিশানা করে দিচ্ছেন নানা বক্তব্য। ঢাকা-৭ আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ইঞ্জিনিয়ার ইশরাক হোসেন সূত্রাপুর এলাকায় এক সভায় সরাসরি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ‘বিএনপি চাইলে ঢাকায় জামায়াত-শিবিরকে রাস্তায় নামতে দেওয়া হবে না।’ তিনি দলটিকে তাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে ‘সাবধান’ হওয়ার আহ্বান জানান। অন্যদিকে আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরু হওয়ার আগে এক ভিডিওতে ঢাকা-১৭ আসনের জামায়াতের সংসদ-সদস্য প্রার্থী ডা. এসএম খালিদুজ্জামানকে বলতে শোনা যায়, ‘সব সাইজ হয়ে যাবে, ঢাকায় কোনো সিট দেব না।”

শুধু কথার লড়াই নয়, নির্বাচনি প্রচারে নেমে অসহিষ্ণু আচরণের শিকার হওয়ার ঘটনাও ঘটতে দেখা গেছে। ঢাকা-৮ আসনের ১০ দলীয় ঐক্যের প্রার্থী নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী শুক্রবার সন্ধ্যায় সিদ্ধেশ্বরী এলাকায় গণসংযোগে গেলে এক অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির শিকার হন। প্রচারণার সময় একটি ভবনের ওপর থেকে তাকে লক্ষ্য করে ডিম ও নোংরা পানি নিক্ষেপ করে অজ্ঞাত ব্যক্তিরা। এ ঘটনার পরে কারও নাম উল্লেখ না করে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী গণমাধ্যমকে বলেন, আমি চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কথা বলছি। যাদের চাঁদাবাজির সাম্রাজ্য ভেঙে পড়ছে, তারাই ময়লা পানি ও ডিম নিক্ষেপের ঘটনার সঙ্গে জড়িত।”

এর আগের দিন বৃহস্পতিবার রাতে ঢাকা-২ আসনের কেরানীগঞ্জে নির্বাচনি কার্যালয়ের পাশে হযরতপুর ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হাসান মোল্লাকে গুলি করে দুর্বৃত্তরা। গুরুতর অবস্থায় তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হলে শনিবার তিনি মারা যান।”

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও পড়ুন
© All rights reserved © dailyamarsomoy.com