চট্টগ্রাম নগরীর ইপিজেড থানা এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, ক্যাসিয়ার মারফত অবৈধ ব্যবসা থেকে মাসোহারা আদায়, পুলিশ সদস্যদের মধ্যে বৈষম্য সৃষ্টিসহ নানান ধরনের অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুর রহমানের বিরুদ্ধে।
ওসি আতিকুর রহমান ইপিজেড থানায় যোগদানের পর থেকে এলাকায় আইনশৃঙ্খলা সন্তোষজনক পরিস্থিতির চেয়ে অবনতির পাল্লাই বেশি ভারী এবং থানায় ঘনিষ্ঠ ও নিজ জেলার অফিসারদের প্রতি সহানুভূতি ও ডিউটির সুযোগ সুবিধাকে বেশী দেওয়াকে কেন্দ্র করে থানার অফিসারদের অভ্যন্তরে অসন্তোষ্টসহ নানান ধরনের অভিযোগ উঠেছে।
নাম প্রকাশ না করা শর্তে সংশ্লিষ্ট পুলিশ এবং বিভিন্ন মহলের পক্ষ থেকে এসব অভিযোগ তোলা হয়।
ইপিজেড থানা এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে, স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের অভিযোগ, সিমেন্ট ক্রসিং, বন্দরটিলা, ব্যারিস্টার কলেজ, মাইলের মাথা, সি-ম্যাস হোস্টেল ও সল্টগোলা এলাকায় দিনে-দুপুরে মোবাইল ছিনতাই, চুরি এবং কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা বেড়েছে উদ্বেগজনক হারে।
এ ছাড়া বিমানবন্দর সড়কে এবং এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে (ফ্লাইওভারের) ওপরে রাতে মোবাইল ছিনতাই, চুরি, রাতের আঁধারে বিভিন্ন এলাকায় বৈদ্যুতিক কেবল চুরি এবং ব্যারিস্টার কলেজ থেকে মাইলের মাথা এলাকায় রাস্তার পূর্ব পাশে সড়কে সকাল ৭ টা থেকে ১১ টা এবং বিকাল তিনটার মধ্যে পৃথক পৃথক সময়ে ১০ থেকে ১২জনের একটি গ্রুপ তিন তাসের আসর বসিয়ে সাধারণ পথ যাত্রী ও গার্মেন্টস শ্রমিকদের কাছ থেকে মোবাইল ফোন ও টাকা-পয়সা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে এলাকাবাসীর।
অন্যদিকে, সড়কে স্হায়ী ব্যবসায়ীরা জানান, ব্যারিস্টার কলেজের প্রধান সড়কসংলগ্ন এস এ পরিবহনের পাঁচতলা ফরিদা ম্যানশনে ও ফরিদা ভবনের পাশের গলিতে ইয়াবা ও গাঁজার ব্যবসাসহ কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা ব্যাপক আকারে বেড়ে গেছে। পাশাপাশি আবাসিক বাসা – বাড়ির মোটর ও মোটর তার চুরির ঘটনাও তুলনামূলকভাবে বেড়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। যেমন- সাম্প্রতিক সময়ে চৌধুরী মার্কেটের সামনে ক্ষুদে চা দোকানদার সাইফুলের লক্ষাধিক টাকার মালামাল নিয়ে গেছে চুরি করে। এবং গতকাল দিবাগত রাত আনুমানিক তিনটার সময় ফ্রি – পোর্ট সৈকত মার্কেট (মধুবন মিষ্টি দোকানের) ছাদে উঠে ৩ থেকে ৪ জনের চোর চক্র ইন্টারনেট ও বিদ্যুৎ লাইনের তার চুরির সময় সৈকত মার্কেট ও গাজী কমপ্লেক্সে দারোয়ান বাবু ও বাবুর ভাই দেখে ফেলে। এসময় তাদের ধরতে এগিয়ে গেলে চোর সদস্যরা চাকু হাতে নিয়ে ভয় দেখায় ও ইটপাটকেল ছুঁড়ে মারতে মারতে পালিয়ে যায়। বিগত ১৮/১০/ ২৬ তারিখ আকমলআলী এক সাওয়াদ বিল্ডিং ইনচার্জ রহমত জানায় – তার সংস্কার কাজ করা বিল্ডিং থেকে রাতে প্রায় এক লক্ষ লক্ষ টাকার ওয়ারিং তার নিয়ে যায় চুরি করে।
এসব ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন এলাকাবাসী ও সচেতন মহল।
(ইপিজেড থানায় অদৃশ্য ‘কুমিল্লার টিম সিন্ডিকেট!)
নাম প্রকাশ না করা শর্তে, পুলিশ-সংশ্লিষ্ট কয়েকজন জানায়, ওসি আতিকুর রহমান ইপিজেড থানায় যোগদানের পর থানার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব ও ডিউটি বণ্টনের ক্ষেত্রে তাঁর নিজ জেলার বেশ কয়েকজন অফিসারকে থানায় ভার্তী সুযোগ সুবিধা দৃষ্টিতে দেখা ও প্রধান্য দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ তুলেছেন।
থানায় এ ধরণের সুবিধার তালিকায়, এসআই সাহিন মিয়া, এসআই মামুন, এএসআই আবু সাঈদ চৌধুরী, এএসআই আব্দুর রহমান পাটেয়ারী, এএসআই পলাশ কুমার হাজারী এবং ইপিজেড পুলিশ ফাঁড়ির এসআই আব্দুল ওদুদ চৌধুরীসহ আরও বেশ কয়েকজন অফিসার রয়েছে।
(তদন্ত কর্মকর্তার শূন্য পদ নিয়ে প্রশ্ন?)
তদন্ত কর্মকর্তা বদলির পর থানায় তদন্ত ওসি পদায়ন নিয়োগের ক্ষেত্রেও রয়েছে ওসি আতিকুর রহমানের অনিহা এবং ওসির ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত এসআই সাহিন মিয়াকে সেকেন্ড অফিসারের দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়টি নিয়েও নানান প্রশ্নের জন্ম এবং এসআই সাহিন মিয়াকে থানায় সেকেন্ড অফিসারের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তদন্ত ওসির দায়িত্বও দেখবাল করছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।
(বদলি আদেশ আসাশর্তেও ওসির নিজস্ব শুভাকাঙ্ক্ষী হিসাবে বদলির আদেশ নিয়ে তদবির)
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, অফিসারদের বদলির আদেশ আসা শর্তেও অদৃশ্য শক্তির জোরে অথবা থানার লোকবল সংকট বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে এ বদলি আদেশ ঠেকিয়ে দেন। তাছাড়া থানায় ওসির সু নজরের আওতায় থাকলে তো কথা নেই!
বন্দর জোনের বদলি আদেশ অনুযায়ী ১৬ এপ্রিল ২০২৬ তারিখের ২২৮/২৬ নম্বর আদেশে এএসআই আবু সাঈদ চৌধুরীকে, বন্দর জোনে পতেংগা থানায় এবং স্মারক নং- সিএমপি/আরও (সিআরও)/বদলী/আদেশ ২৭৭/১(১২), তারিখ- ১১/০১/২৫ইং এ এস আই আব্দুর রহমান পাটোয়ারী উত্তর বিভাগে এবং ১৯ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখের ৪৩/২৬ নম্বর আদেশে এসআই কামরুজ্জামানকে ইপিজেড থানা থেকে পতেঙ্গা মডেল থানায়, এবং তিনি চলে গেলেও
ওসির ঘনিষ্ঠ জন হিসেবে পরিচিত এএসআই আবু সাঈদ চৌধুরী ও এএস আই আব্দুর রহমান পাটোয়ারী ইপিজেড থানায় রয়ে গেছেন এখনো ।
এ ছাড়া এএসআই আবু সাঈদ চৌধুরীর দীর্ঘদিন ধরে বন্দর জোনে কর্মরত থাকা নিয়েও জনমনে নানা প্রশ্নের দানা বেঁধেছে? অভিযোগকারীদের দাবি, সাবেক ফ্যাসিবাদী আমল থেকে শুরু করে প্রায় এক যুগেরও বেশি সময় ধরে বিভিন্ন সময়ে এ এস আই আবু সাইদ চৌধুরী বন্দর থানা, দক্ষিণ মধ্যম হালিশহর পুলিশ ফাঁড়ি, ইপিজেড পুলিশ ফাঁড়ি কিংবা ইপিজেড থানায় কীভাবে এবং কার প্রভাবে কর্মরত রয়েছেন, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। তা ছাড়া ইপিজেড – বন্দর দুই পুলিশ ফাঁড়ি ও দুই থানার মধ্যে চাকরির ন্যায় কর্মরত থাকাও রহস্যময়!
বদলির আদেশ ও সিন্ডিকেট টিম সম্পর্কে, বন্দর জোনের ডিসি -মোহাম্মদ আমিরুল ইসলামের মুঠোফোনে জানতে চাইলে তিনি বলেন,
যদি থানায় কোন কর্মকর্তাকে বদলির আদেশ দেওয়া হয় তাহলে নিয়ম অনুযায়ী এ আদেশ পালন করা ও মান্যকরা জরুরি। থানায় লোকবল সংকট দেখিয়ে তাদের রাখা হয়েছে। এবং ওসির নিজ জেলার এস আই, এ এস আই নিয়ে থানা পরিচালনা করা প্রশ্ন”র জবাব তিনি বলেন, আমি নতুন এসেছি অনেকের বাড়ি সম্পর্কে আমার ধারণা নেই এ বিষয়ে আমাকে আগে জানালে ভালো হতো। আমাকে একটা whatsapp এ নোট দিয়েন বিষয়টি দেখবো। তদন্ত কর্মকর্তা চেয়ার শূন্য ও পদায়ন নিয়ে কথা বলতে চাইলে তিনি বলেন, তদন্ত কর্মকর্তা মাননীয় কমিশনার স্যার থানায় পদায়ন করেন। ইপিজেড থানা তদন্ত কর্মকর্তা শূন্য চেয়ার পদায়নে ওসির অনিহা সম্পর্কে জানতে চাইলে, অনিহা যদি থাকে সেটা ওসি পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকবে।
”আবুসাইদ এর বিরুদ্ধে বিধবা নারীর অভিযোগ ও থানায় করা অভিযোগ প্রত্যাহারের চাপ”
এএসআই আবু সাঈদ চৌধুরীর বিরুদ্ধে স্বপ্না আক্তার নামে এক অসহায় বিধবা নারী মাননীয় পুলিশ কমিশনার বরাবর লিখত
অভিযোগ দিয়েছেন।
স্বপ্না আক্তারের অভিযোগ বিবরণিতে বলা হয়, ইপিজেড থানায় দায়ের করা নারী নির্যাতনসংক্রান্ত ( চমেক,র মেডিকেল সার্টিফিকেট যুক্ত) একটি অভিযোগ সরেজমিনে তদন্ত করতে গিয়ে এএসআই আবু সাঈদ চৌধুরী অভিযুক্ত হোটেল ও রেস্টুরেন্টে মালিক নয়নের কাছ থেকে বাদীনীর সম্মুখে ১০ হাজার টাকা নেন এবং ওই অর্থ থেকে সাত হাজার টাকা বাদীনী স্বপ্না আকতারকে দিয়ে নয়নের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ প্রত্যাহারের জন্য চাপ দেয় এএসআই আবু সাইদ। এতে বাদীনী এএসআই আবু সাইদের কথা কর্ণপাত না করে ঘটনা স্থল ত্যাগ করেন।
স্বপ্না আক্তার অভিযোগে আরও লিখেন, সঠিক বিচার না পেয়ে রাতে ওসির সঙ্গে দেখা করতে থানায় গেলে তাঁকে ভেতরে প্রবেশ করতে দেয়নি ওসির ঘনিষ্ঠভাজন এএস আই আবু সাইদ বরং হুমকি-ধমকি দিয়ে থানা থেকে বের করে দেওয়া হয় অভিযোগকারী অসহায় নারী স্বপ্না আকতারকে। এবিষয়ে ঘটনার দিন তারিখে সত্যতা যাচাই করতে বাদীনি থানার সিসিটিভি ফুটেজ পরীক্ষা করারও দাবী জানিয়েছেন।
এ ঘটনায় এএসআই আবু সাঈদ চৌধুরী ও হোটেল মালিক নয়নের বিরুদ্ধে ১ নভেম্বর ২০২৬ তারিখে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) পুলিশ কমিশনার বরাবর লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন স্বপ্না আক্তার।
(থানা এলাকায় অবৈধ ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ক্যাশিয়ারের মাধ্যমে মাসোহারা আদায়ের অভিযোগ)
ইপিজেড থানার আওতাধীন,চৌধুরী মার্কেট থেকে পুরনো ইপিজেড থানা পর্যন্ত ফুটপাতে বসা দোকান প্রতি দেড় হাজার, তিন হাজার দোকানের প্রকারভেদে মাসিক ( ক্যাসিয়ার মারফত) টাকা আদায়সহ আকমল আলী বেড়িবাঁধ এলাকায় , কালো তেলসহ বিভিন্ন অবৈধ পণ্য পাচারের সঙ্গে জড়িত তাহের নামে ব্যক্তিদের সংগেও ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের অভিযোগ উঠেছে ওসি আতিকুর রহমানের বিরুদ্ধে।
এ ছাড়া থানার মেস ম্যানেজার খ্যাত ক্যাশিয়ার পরিচয় ব্যবহার করে জুয়া ও বিভিন্ন অবৈধ ব্যবসার স্পট থেকে চুক্তিভিত্তিক মাসিক অর্থ আদায়ের অভিযোগও উঠে এসেছে থানার এ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে।
অন্যদিকে, কর্ণফুলী সিইপিজেড থেকে ঝুট ব্যবসায়ীদের ঝুট ও স্ক্র্যাপ লোহা পরিবহনের অনুযায়ী ট্রাক ও ডেলিভারী প্রতি ৩০০ (তিনশ) ২০০০( দুইহাজার) ৫০০০ (পাঁচ হাজার) টাকা পর্যন্ত আলাদা অঙ্কের টাকা নেওয়ার সর্বজনিন অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।
২০১৫-১৬ সালে বন্দর থানায় সেকেন্ড অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করে যাওয়া সুবাদে ওসি আতিকুর রহমানের বন্দর ইপিজেডে এলাকা সম্পর্কিত ধারণা নকদর্পনে। তাছাড়াও রয়েছে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা ও ঝুট ব্যবসায়ীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগসূত্রর কথাও বিভিন্ন সূত্রে থেকে জানা যায়।
এ বিষয়ে কথা বলতে – ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুর রহমান সাথে মুঠো ফোনে যোগাযোগ করতে চাইলে তিনি ফোন রিসিভ করেনি।
সচেতন মহল ও এলাকার সাধারণ মানুষ ইপিজেড থানার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, থানায় কথিত টিম সিন্ডিকেট, ক্যাশিয়ার দিয়ে অবৈধ ব্যবসা থেকে মাসোহারা আদায়, অফিসারদের মধ্যে বৈষম্য, বদলি আদেশ কার্যকরে ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন? এবং অসহায় নারীকে হয়রানিসহ বিভিন্ন অভিযোগ নিরপেক্ষ তদন্ত করতে সংশ্লিষ্টদের প্রতি জোর দাবি জানিয়েছেন।
(পণ্য আটক ও নানান বিষয়ে ধারাবাহিক প্রতিবেদন পরবর্তী পর্বে)
Leave a Reply