ফুসফুসে সংক্রমণ নিয়ে গত ২৩ নভেম্বর রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি হন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। হাসপাতালের করোনারি কেয়ার ইউনিটে (সিসিইউ) মেডিকেল বোর্ডের দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে তার চিকিৎসা চলছে। নানা রোগে আক্রান্ত ৮০ বছরের সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী এখন চিকিৎসকদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রয়েছেন। চিকিৎসকদের উদ্ধৃতি দিয়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানিয়েছেন, তার (খালেদা জিয়া) শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত সংকটময়। শারীরিক অবস্থা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার জন্য দেশবাসীর কাছে দোয়া চেয়েছেন। এদিকে সুস্থতা কামনা করে শুক্রবার সারা দেশের মসজিদে মসজিদে দোয়া ও মোনাজাতের আয়োজন করে বিএনপি।”
শুক্রবার রাতে ফেসবুক স্ট্যাটাসে বিএনপি মহাসচিব লেখেন, ‘পুরো দেশ প্রার্থনায়। ইনশাআল্লাহ আপনি সুস্থ হয়ে উঠবেন।’ এর আগে বিকালে খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্যের খোঁজ নিতে হাসপাতালে যান বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তারা সিসিইউ’র ভেতরে যাননি। গ্লাসের বাইরে থেকে দেখে এসেছেন বলে জানান আমির খসরু। তিনি বলেন, ‘আমরা দূর থেকে দেখেছি। সিসিইউতে তো যাওয়া যায় না। ইনফেকশনের ঝুঁকি আছে। আমরা চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলেছি। ম্যাডামের অবস্থার উন্নতি নেই। মেডিকেল বোর্ড চেষ্টা করছে। প্রতিদিন বৈঠক করে চিকিৎসায় পরিবর্তন আনছে।’
খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার খোঁজ নিতে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস শুক্রবার রাতে আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল ও তার (প্রধান উপদেষ্টা) বিশেষ সহকারী মনির হায়দারকে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে পাঠান। তারা সাবেক প্রধানমন্ত্রীর চিকিৎসার খোঁজ নেন। এ সময় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও উপস্থিত ছিলেন।
প্রতিদিন নিয়ম করে হাসপাতালে যাচ্ছেন বিএনপি চেয়ারপারসনের একান্ত সচিব এবিএম আব্দুস সাত্তার। শুক্রবার সন্ধ্যায় তিনি যুগান্তরকে বলেন, ‘ম্যাডামের অবস্থা আগের মতোই। তেমন কোনো উন্নতি নেই। এখনো সিসিইউতেই আছেন। ব্যক্তিগত চিকিৎসক ডা. জাহিদ হোসেন হাসপাতালে আছেন সার্বক্ষণিক। আমার সঙ্গে চিকিৎসকদের যতটা কথা হয়েছে-তারা জানিয়েছেন ম্যাডামের অবস্থা ভালো নয়। সবাই দোয়া করবেন।’ তিনি বলেন, চিকিৎসকদের পরামর্শে ম্যাডামের জন্য প্রতিদিন গুলশানের বাসা থেকেই খাবার পরিবেশন করা হচ্ছে। ম্যাডামের সঙ্গে তার ছোট পুত্রবধূ সৈয়দা শর্মিলা রহমান সার্বক্ষণিক থাকছেন। এছাড়া গৃহপরিচালিকা ফাতেমা ও স্টাফ রূপা আক্তার সঙ্গে আছেন।”
শুক্রবার রাজধানীর নয়াপল্টন জামে মসজিদে দোয়া মাহফিলে অংশ নিয়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল বলেন, ‘গণতন্ত্র উত্তরণে সবচেয়ে বড় অবদান খালেদা জিয়ার। গণতন্ত্রকে প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি লড়াই-সংগ্রাম করেছেন, কারাবরণ করেছেন, নির্যাতিত হয়েছেন। আল্লাহ যেন তাকে সুস্থ করে দেন। সুস্থ অবস্থায় আবার জনগণের মধ্যে ফিরে এসে দেশের মানুষের জন্য কাজ করার সুযোগ করে দেন। এ সময় দোয়া মোনাজাতে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীসহ দল এবং বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরাও অংশ নেন।”
চিকিৎসায় প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত সরকার-ড. ইউনূস : খালেদা জিয়ার জন্য দেশবাসীর কাছে দোয়া চেয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। শুক্রবার সন্ধ্যায় প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে এক বার্তায় এ তথ্য জানানো হয়। এতে বলা হয়, প্রধান উপদেষ্টা নিয়মিতভাবে খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্যের অগ্রগতি সম্পর্কে খোঁজখবর রাখছেন এবং প্রয়োজনীয় সব চিকিৎসা সহায়তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি নির্দেশ দিয়েছেন।”
প্রেস উইংয়ের বার্তায় বলা হয়, প্রধান উপদেষ্টা তিনবারের এই সাবেক প্রধানমন্ত্রীর দ্রুত সুস্থতা কামনা করে দেশবাসীর কাছে দোয়া প্রার্থনা করেছেন। তিনি খালেদা জিয়ার চিকিৎসায় যেন কোনো ধরনের ঘাটতি না থাকে, প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহযোগিতা দিতে সরকার প্রস্তুত বলে জানিয়েছেন। গণতন্ত্রে উত্তরণের এই সময়ে খালেদা জিয়া জাতির জন্য ভীষণ রকম অনুপ্রেরণা উল্লেখ করে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘তার সুস্বাস্থ্য দেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’ তিনি সংশ্লিষ্ট সবাইকে প্রয়োজনীয় সব সহায়তা ও সমন্বয়ের মাধ্যমে সার্বক্ষণিক প্রস্তুত থাকারও নির্দেশনা দিয়েছেন।;;
প্রধান উপদেষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ তারেক রহমানের : এদিকে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। শুক্রবার রাতে দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে জানানো হয়, হাসপাতালে চিকিৎসাধীন খালেদা জিয়াকে নিয়ে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বিবৃতিতে যে সৌজন্য ও মানবিক অনুভূতির প্রকাশ ঘটেছে সেজন্য তারেক রহমান আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন। বিবৃতিতে বলা হয়, প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রীর নিয়মিত স্বাস্থ্যের অগ্রগতি সম্পর্কে খোঁজখবর রাখছেন এবং তার সুচিকিৎসায় প্রয়োজনীয় সব সহায়তা ও সমন্বয়ে সার্বক্ষণিক প্রস্তুত থাকার জন্য সংশ্লিষ্ট সবাইকে নির্দেশ প্রদান করেছেন। ”
সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া দীর্ঘদিন ধরে হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, আর্থ্রাইটিস, লিভার সিরোসিস, কিডনি জটিলতাসহ নানা শারীরিক অসুস্থতায় ভুগছেন। গত ৮ জানুয়ারি উন্নত চিকিৎসার জন্য লন্ডনে যান বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। লন্ডন ক্লিনিকে টানা ১৭ দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর ২৫ জানুয়ারি ছেলে তারেক রহমানের বাসায় লন্ডনের ক্লিনিকের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক অধ্যাপক প্যাট্রিক কেনেডি ও অধ্যাপক জেনিফার ক্রসের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা নেন। যুক্তরাজ্যে উন্নত চিকিৎসা শেষে গত ৬ মে দেশে ফেরেন বিএনপি চেয়ারপারসন।’
Leave a Reply