1. admin@gmail.com : দৈনিক আমার সময় : দৈনিক আমার সময়
  2. admin@dailyamarsomoy.com : admin :
আজ মহান বিজয় দিবস - দৈনিক আমার সময়

আজ মহান বিজয় দিবস

নিজস্ব প্রতিবেদক
    প্রকাশিত : মঙ্গলবার, ১৬ ডিসেম্বর, ২০২৫

আজ ১৬ ডিসেম্বর মহান বিজয় দিবস। বাঙালির শৌর্যবীর্য ও বীরত্বের এক অবিস্মরণীয় গৌরবময় দিন। বীরের জাতি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার দিন। পৃথিবীর মানচিত্রে বাংলাদেশ নামে একটি স্বাধীন ভূখণ্ডের নাম জানান দেওয়ার দিন।
১৯৭১ সালে ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ শেষে এই দিনে বাঙালি জাতি স্বাধীনতা সংগ্রামের চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করেছিল। আজকের দিনটিতে বিজয়োল্লাসে ভাসবে দেশ, আনন্দে উদ্বেলিত হবে গোটা জাতি। রাজধানী ঢাকা থেকে প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত নানা আয়োজনে উদযাপিত হবে দিনটি।
দিবসটি উপলক্ষে বিএনপিসহ বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন ও রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ পৃথক বাণী দিয়েছেন। তারা মুক্তিযুদ্ধের শহিদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করবেন এবং নিহতদের রুহের মাগফেরাত কামনা করবেন।
বিজয় দিবসের প্রাক্কালে রাষ্ট্রপতি ও প্রধান উপদেষ্টা পৃথক বাণীতে দেশবাসীকে শুভেচ্ছা জানান এবং মুক্তিযুদ্ধে শহিদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।
রাষ্ট্রপতি তাঁর বাণীতে বলেন, ‘রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পরমতসহিষ্ণুতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। তাই আসুন, ২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে একটি বৈষম্যমুক্ত দেশ গড়তে এবং মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ্য বাস্তাবায়ন ও শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠায় নিজ নিজ অবস্থান থেকে আরও বেশি অবদান রাখি। দেশ ও জাতিকে উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির পথে আরো এগিয়ে নিয়ে যাই, গড়ে তুলি উন্নত-সমৃদ্ধ এক নতুন বাংলাদেশ- মহান বিজয় দিবসে এই আমার প্রত্যাশা।’
রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘এ বছর জুলাই-আগস্ট মাসে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে একটি বৈষম্যহীন ও দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার যে স্বপ্ন এ দেশের মানুষ দেখেছে, তা অচিরেই বাস্তবায়িত হবে বলে আমি মনে করি। বীরের দেশ বাংলাদেশ বিশ্বের বুকে স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠা লাভ করবে-ইনশাআল্লাহ।’
তিনি বলেন, ‘বিজয়ের এই দিনে আমি গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করছি মুক্তিযুদ্ধে আত্মোৎসর্গকারী বীর শহিদদের, যাঁদের সর্বোচ্চ ত্যাগে অর্জিত আমাদের স্বাধীনতা। আমি কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করছি সকল জাতীয় নেতা, বীর মুক্তিযোদ্ধা, সম্ভ্রমহারা দুই লাখ মা-বোন, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক-সমর্থক, বিদেশি বন্ধু, যুদ্ধাহত ও শহিদ পরিবারের সদস্যসহ সর্বস্তরের জনগণকে, যাঁরা আমাদের বিজয় অর্জনে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অবদান রেখেছেন। আমি আরো স্মরণ করি, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনসহ বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলনে যাঁরা শহিদ হয়েছেন তাদেরকে। জাতি তাঁদের অবদান শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে।’
প্রধান উপদেষ্টা তাঁর বাণীতে বলেন, ‘আজকের এই দিনে, আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের বীর শহিদদের শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করি এবং তাদের আত্মত্যাগের প্রতি সম্মান জানাই। ছাত্র-শ্রমিক-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার একটি উন্নত, সমৃদ্ধ এবং সুশাসিত বাংলাদেশ গঠনে সবাই মিলে একসঙ্গে কাজ করার অঙ্গীকার করছে।’
বিজয় দিবসের প্রাক্কালে দেয়া এই বাণীতে তিনি বলেন, দেশকে আরও উন্নত ও শক্তিশালী করতে এবং স্বাধীনতার পূর্ণ সুফল ভোগ করতে আমরা বদ্ধপরিকর। প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘বিজয় দিবস কেবল আমাদের গর্বের উৎস নয়, এটি আমাদের শপথের দিনও। শপথ আমাদের একতাবদ্ধ থাকার, দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করার।’
বিজয় দিবসকে বাংলাদেশের ইতিহাসে অত্যন্ত গৌরবময় ও স্মরণীয় দিন হিসেবে উল্লেখ করে ড. ইউনূস বলেন, ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর মহান মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের মাধ্যমে আমরা অর্জন করি স্বাধীনতার স্বাদ এবং জাতি হিসেবে নিজস্ব পরিচিতি। প্রধান উপদেষ্টা উল্লেখ করেন, ‘লাখ লাখ শহিদের রক্ত ও ত্যাগের বিনিময়ে আমরা পেয়েছি আমাদের কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা।’ প্রধান উপদেষ্টা ‘বিজয় দিবস ২০২৪’-এর সর্বাঙ্গীণ সাফল্য কামনা করেন।
মহান বিজয় দিবস, বাঙালি জাতির হাজার বছরের শৌর্যবীর্য ও বীরত্বের এক অবিস্মরণীয় গৌরবময় দিন। বীরের জাতি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার দিন। পৃথিবীর মানচিত্রে বাংলাদেশ নামে একটি স্বাধীন ভূখণ্ডের নাম জানান দেওয়ার দিন।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ১৯৪৮ সাল থেকে বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, ছেষট্টির ছয় দফা, উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, একাত্তরের ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ, ২৫ মার্চে গণহত্যা শুরু হলে ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা, ১৭ এপ্রিল মুজিবনগর সরকার গঠন এবং রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে ৩০ লাখ শহীদ ও দু’লাখ মা-বোনের আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত হয় স্বাধীনতা। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাক সেনাদের আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হয়। সেই হিসাবে বিজয়ের ৫২ বছর পূর্তির দিনকাল।
জাতীয় পর্যায়ে এদিন ঢাকায় প্রত্যুষে ৩১ বার তোপধ্বনির মাধ্যমে দিবসটির সূচনা হয়। সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সাভার জাতীয় স্মৃতিসৌধে পুস্পস্তববক অর্পণ করেন। এরপর মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রীর নেতৃত্বে বীরশ্রেষ্ঠ পরিবার, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও বীর মুক্তিযোদ্ধারা পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। বাংলাদেশে অবস্থনরত বিদেশি কূটনীতিক, মুক্তিযুদ্ধে মিত্রবাহিনীর সদস্য হিসেবে অংশগ্রহণকারী আমন্ত্রিত ভারতীয় সেনাবাহিনীর সদস্য এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনসহ সর্বস্তরের জনগণ পুষ্পস্তবক অর্পণ করে মহান মুক্তিযুদ্ধে শহিদ বীর মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন।
দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী বাণী দিয়েছেন। দিবসের তাৎপর্য তুলে ধরে এদিন সংবাদপত্র বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশ করেছে। এ উপলক্ষে ইলেকট্রনিক মিডিয়া মাসব্যাপী মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক বিভিন্ন অনুষ্ঠানমালা প্রচার করবে। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে দেশের শান্তি, সমৃদ্ধি ও অগ্রগতি কামনা করে বিশেষ দোয়া ও উপাসনার আয়োজন করা হবে। এতিমখানা, বৃদ্ধাশ্রম, হাসপাতাল, জেলখানা, শিশু বিকাশ কেন্দ্রসহ অনুরূপ প্রতিষ্ঠানগুলোতে উন্নতমানের খাবার পরিবেশন করা হবে। দেশের সব শিশুপার্ক ও জাদুঘরগুলো বিনা টিকিটে সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত থাকবে এবং সিনেমা হলে বিনামূল্যে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র প্রদর্শনী হবে।
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাঙালি জাতি পরাধীনতার শেকল ভেঙ্গে প্রথম স্বাধীনতার স্বাদ গ্রহণ করে। ২৪ বছরের নাগপাশ ছিন্ন করে জাতির ভাগ্যাকাশে দেখা দেয় এক নতুন সূর্যোদয়। প্রভাত সূর্যের রক্তাভা ছড়িয়ে পড়ে বাংলাদেশের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে। সমস্বরে একটি ধ্বনি যেন নতুন বার্তা ছড়িয়ে দেয়, জয়বাংলা বাংলার জয়, পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠেছে, রক্ত লাল, রক্ত লাল, রক্ত লাল। মহামুক্তির আনন্দ ঘোর এই দিনে এক নতুন উল্লাস জাতিকে প্রাণ সঞ্চার করে সজিবতা এনে দেয়। যুগ যুগ ধরে শোষিত বঞ্চিত বাঙালি চোখে আনন্দ অশ্রু আর ইস্পাত কঠিন দৃঢ়তা নিয়ে এগিয়ে যায় সামনে। বিন্দু বিন্দু স্বপ্নের অবশেষে মিলিত হয় জীবনের মোহনায়। বিশ্ব কবির সোনার বাংলা, নজরুলের বাংলাদেশ, জীবনানন্দের রূপসী বাংলা, রূপের তাহার নেইকো শেষ, বাংলাদেশ আমার বাংলাদেশ। বাঙালি যেন খুঁজে পায় তার আপন সত্তাকে।
আদি বাঙালির সাংস্কৃতিক ও আর্থ-সামাজিক জীবন এবং ক্রমবিকাশের চূড়ান্ত পর্যায়ে এসে বাঙালির শৌর্যবীর্য যেন আর একবার ধপ করে জ্বলে ওঠে। প্রথম আগুন জ্বলে বায়ান্নর ২১শে ফেব্রুয়ারি। ফাগুনের আগুনে ভাষা আন্দোলনের দাবি আর উন্মাতাল গণমানুষের মুষ্টিবদ্ধ হাত একাকার হয়ে যায় সেদিন। ভাষার জন্য প্রথম বলীদান বিশ্ববাসী অবাক বিস্ময়ে লক্ষ্য করে। সেই থেকে শুরু হয়ে যায় বাঙালির শেকল ভাঙার লড়াই। পাকিস্তানিদের সঙ্গে হিসাব-নিকাশের হালখাতার শুরুতেই রক্তের আঁচড় দিয়ে বাঙালি শুরু করে তার অস্তিত্বের লড়াই। পলাশীর আম্রকাননে হারিয়ে যাওয়া সেই সিরাজদ্দৌলা আবার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রূপে এ লড়াইয়ে সেনাপতি হিসেবে আবির্ভূত হন। ১৯৫২ সালে যে আগুন জ্বলেছিল রাজধানী ঢাকা শহরে, সে আগুন যেন ক্রমান্বয়ে ছড়িয়ে পড়তে থাকে দেশের আনাচে-কানাচে সবখানে। বাঙালির বুকের ভেতর জ্বলে ওঠা আগুন যেন সহস্র বাঙালির মধ্যে প্রবাহিত হতে থাকে।
বাষট্টি, ঊনসত্তর ও সত্তর শেষ করে একাত্তরে বাঙালি জাতি হিসাব করতে বসে। হিসাব-নিকাশ আর দেনা-পাওনায় পাকিস্তানিরাও বসে নেই। তারাও অংক কষতে থাকে কীভাবে বাঙালি জাতিকে যুগ যুগ ধরে পরাধীনতার শেকল পরিয়ে রাখা যায়। তাদের কাছে এই অলংকারই বাঙালির শ্রেষ্ঠ প্রাপ্য। ঘড়ির কাঁটার টিক টিক শব্দ জানিয়ে যায়, সময় আসছে, হিসাব-নিকাশ চুকিয়ে দেওয়ার পালা।
অবশেষে গভীর কালো নিকষ আঁধার থেকে জেগে উঠে হিরন্ময় হাতিয়ার। ৭ মার্চ একাত্তরের বিশাল জনসমুদ্র থেকে যুগের কবি, মহাকাব্যের প্রণেতা বঙ্গবন্ধু বজ্রকণ্ঠ ঘোষণা দেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তি সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। রক্ত যখন দিয়েছি তখন আরও দেব, তবুও এদেশকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাআল্লাহ।’ এই একটি মাত্র উচ্চারণে যেন বাঙালি সত্যিকার দিক-নির্দেশনা পেয়ে যায়। চূড়ান্ত লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিতে থাকে বাঙালি। বাঙালি বুঝে যায়, শেষ কামড় দেওয়ার সময় আসন্ন। পাকিস্তানিরাও আর বসে নেই। পুরো জাতিকে স্তব্ধ করার লক্ষ্যে মারাত্মক মারণাস্ত্র নিয়ে ২৫ মার্চ একাত্তর ঘুমন্ত জাতির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। শুরু হয় বাঙালি নিধন যজ্ঞ। বাতাসে লাশের গন্ধ, বারুদে বারুদে আর ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন আকাশ। এ যেন এক প্রেতপুরী। আকাশে শকুনের উদ্যত থাবা, নিচে বিপন্ন মানুষের বিলাপ। হায় বাংলাদেশ। একি বাংলাদেশ। এ যেন এক জ্বলন্ত শ্মশান। কিন্তু ঠিকই হাড়ের আর খুলির স্তুপ একদিন পাললিক হয়।
মুক্তি পাগল বাংলার দামাল ছেলেরা স্বাধীনতার রক্ত সূর্যকে ছিনিয়ে আনবে বলে একদিন অস্ত্র কাঁধে তুলে নেয়। ছাত্র, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, কৃষক, শ্রমিক, কামার, কুমার সবাই শরিক হয়ে থাকে এ লড়াইয়ে। যতই দিন অতিবাহিত হতে থাকে, আরও শাণিত হয় প্রতিটি মুক্তিযোদ্ধার অস্ত্র। লক্ষ্য স্থির রেখে শত্রু হননে দৃঢ়তায় এগিয়ে যায় বীর বাঙালি। ইতোমধ্যেই বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের প্রতি আন্তর্জাতিক সমর্থন স্পষ্ট হয়ে ওঠে। প্রতিবেশী ভারতও জড়িয়ে পড়ে বাঙালির ভাগ্যযুদ্ধে। ডিসেম্বর শেষ পর্যায়ে এসে চূড়ান্ত রূপ নেয় এই যুদ্ধের।
অবশেষে নয় মাসের দুঃস্বপ্নের অবসান ঘটিয়ে বাঙালি জাতির জীবনে এলো নতুন প্রভাত। ১৬ ডিসেম্বর সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে সূচিত হলো মুক্তিযুদ্ধের অনিবার্য বিজয়। এর মধ্য দিয়ে এলো হাজার বছরের কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা। বাঙালি জাতি এদিন অর্জন করে তার ভাগ্য নিয়ন্ত্রণের অধিকার। ৩০ লাখ শহীদের রক্ত আর দুই লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে স্বাধীনতা ধরা দেয় বাঙালির জীবনে।
আজ১৬ ডিসেম্বর, মহান বিজয় দিবস। বাঙালির সবচেয়ে আনন্দের দিন। বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিন। পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্তির দিন। এদিন বিশ্বের মানচিত্রে সৃষ্টি হয় নতুন একটি সার্বভৌম দেশ, বাংলাদেশ। যা বাঙালি জাতিকে এনে দেয় আত্মপরিচয়ের ঠিকানা। যারা বুকের তাজা রক্ত দিয়ে এ বিজয় ছিনিয়ে এনেছেন আজ সেসব শহীদকে বিনম্র শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায় স্মরণ করবে দেশের সর্বস্তরের মানুষ। বাংলার দামাল মুক্তিযোদ্ধা আর মুক্তিপাগল মানুষের প্রবল প্রতিরোধ আর লড়াইয়ের মুখোমুখি হয়ে বাংলাদেশ থেকে পরাজিত হয়ে এ দিনে আত্মসমর্পণ করেছিলো পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। ৩৮ বছর আগে আজকের এই দিনে পূর্ব আকাশে উদয় হয়েছিলো হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ সূর্য। সেদিনের সেই সূর্যের আলোয় ছিলো নতুন দিনের স্বপ্ন। আর এ স্বপ্নের জন্য অকাতরে প্রাণ দিয়েছিলেন ৩০ লাখ মানুষ। তাদের প্রাণের বিনিময়ে আমাদের এ বিজয়, এ স্বাধীনতা। বাংলার মাটিতে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হবে- এমন ¯^cœ নিয়েই আজ বিজয় দিবস পালন করতে যাচ্ছে গোটা জাতি। সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্ন নিয়ে এক বুক রক্তের বিনিময়ে স্বাধীন হয়েছিলো এ দেশ। বিজয়ের এ দিনে সবার অঙ্গীকার সুন্দর ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার। যেসব বৈষম্য থেকে স্বাধীনতার জন্ম সেই বৈষম্যগুলো থেকে এ জাতি বেরিয়ে আসতে আবার দৃঢ় প্রত্যয় নেবে আজ।

বিজয়ের পর ৩৮টি বছর পেরিয়ে গেলেও শহীদ পরিবারের সদস্যদের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ আজো থামেনি। বিগত তিন যুগেরও বেশি সময় ধরে গণহত্যা ও ধর্ষণের বিচারের জন্য দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন তারা। তবে এবারের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে বদ্ধপরিকর বর্তমান মহাজোট সরকার।

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর দিনটি ছিলো বৃহস্পতিবার। পৌষের সেই পড়ন্ত বিকেলে তৎকালীন ঢাকার রেসকোর্স ময়দান বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বিকেল সাড়ে ৪টায় পাকিস্তানের সামরিক আইন প্রশাসক জোন-বি এবং ইস্টার্ন কমান্ডের কমান্ডার লে. জেনারেল আমির আবদুল্লাহ খান নিয়াজীর নেতৃত্বে ৯১ হাজার ৫৪৯ পাকিস্তানি সেনা আত্মসমর্পণ করে। মেজর জেনারেল জ্যাকবের তৈরি করা আত্মসমর্পণের দলিলে বিকালে স্বাক্ষর করেন জেনারেল নিয়াজী ও লে. জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা। মুজিবনগর সরকারের পক্ষে এ সময় উপস্থিত ছিলেন গ্রুপ ক্যাপ্টেন এ কে খন্দকার। আর এ আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের অবসান ঘটে। জন্ম নেয় একটি নতুন দেশ- বাংলাদেশ।

তার বাণীতে বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে মুক্তিযোদ্ধাদের অপরিসীম ত্যাগ ও বীরত্বগাথা চিরদিন স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। তিনি বলেন, মহান বিজয় দিবস আমাদের জাতীয় জীবনে এক অনন্য গৌরবময় দিন। দীর্ঘ নয় মাসের সশস্ত্র সংগ্রাম এবং লাখো শহীদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে আমাদের কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা।

তিনি বিজয়ের এই মহান দিনে দেশের স্বাধীনতা অর্জনে জীবন উৎসর্গকারী অকুতোভয় বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সশ্রদ্ধ চিত্তে স্মরণ করে বলেন, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, যিনি স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব অর্জনে অনন্যসাধারণ নেতৃত্ব দান করেন। তিনি আরো শ্রদ্ধা জানান জাতীয় চার নেতাসহ মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ও সব বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং সর্বস্তরের জনগণকে যারা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে আমাদের এ বিজয় অর্জনে অবদান রেখেছেন।

রাষ্ট্রপতি শাহাবুদ্দিন ‍বলেন, আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের লক্ষ্য ছিলো একটি সমৃদ্ধ ও মর্যাদাপূর্ণ পৃথক জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা; যেখানে সাধারণ জনগণ স্বাধীন জীবনযাপন করবে। কিন্তু স্বাধীনতা যুদ্ধে বিজয় অর্জনের পর প্রায় চার দশক কেটে গেলেও সে লক্ষ্য অনেক ক্ষেত্রে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রাও বহুবার ব্যাহত হয়েছে। তিনি বলেন, নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জনগণ বর্তমান সরকারের প্রতি তাদের অকুণ্ঠ সমর্থনের বিষয়টি পুনর্ব্যক্ত করেছে। জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণের লক্ষ্যে প্রধান উপদেষ্টা ‌‘ভিশন ২০২১’ ঘোষণা করেছেন। রাষ্ট্রপতি ‘ভিশন-২০২১’ অর্জনে সবাইকে কঠোর পরিশ্রম করার আহ্বান জানান।

প্রধান উপদেষ্টা ‌তার বাণীতে দল-মত-শ্রেণী-পেশা ও ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে ঐক্যবদ্ধ হয়ে একটি সুখী, সুন্দর ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার আহ্বান জানিয়ে ১৬ ডিসেম্বর মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে দেশবাসীকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানান। তিনি গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন মহান মুক্তিযুদ্ধের ৩০ লাখ শহীদ ও দুই লাখ মা-বোনকে, যাদের সম্ভ্রমের বিনিময়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে।

প্রধানত উপদেষ্টা ‌‌বলেন, আজকের দিনে তিনি বিনম্র সালাম জানাচ্ছেন সব মুক্তিযোদ্ধাকে। তিনি গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে, যার আহ্বানে সাড়া দিয়ে নয় মাসের মরণজয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে বাঙালি জাতি ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করে। পাকহানাদার বাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসর যুদ্ধাপরাধী রাজাকার, আলবদর ও আলশামসরা আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়।

তিনি বলেন, বাঙালি জাতীয়তাবাদের এ দীর্ঘ লড়াইয়ে ’৫২-র ভাষা আন্দোলন, ’৫৪-র নির্বাচন, ’৬২-র শিক্ষা আন্দোলন, ’৬৬-র ছয় দফা, ’৬৯-র গণঅভ্যুত্থান এবং ’৭০-র নির্বাচনের পথ পেরিয়ে বাঙালি জাতি উপনীত হয় ’৭১-র ৭ মার্চের মিলন মোহনায়। তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে লাখো মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে বাঙালির মুক্তির দিশারী বঙ্গবন্ধু দৃপ্তকণ্ঠে ঘোষণা দিয়েছিলেন : ‘এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম।’ মূলত সেদিন থেকেই শুরু হয় মুক্তি সংগ্রামের নতুন অধ্যায়।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, মুক্তিযুদ্ধের পর ৩৮ বছর পেরিয়ে গেছে। কিন্তু স্বাধীনতা স্বপ্ন এখনো পূরণ হয়নি। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে এবং জাতীয় চার নেতাকে জেলখানায় নির্মমভাবে হত্যার মাধ্যমে পরাজিত শক্তি হত্যা, ক্যু ও ষড়যন্ত্রের রাজনীতি দিয়ে জনগণের অধিকার কেড়ে নিয়েছিল। তারা ধ্বংস করতে চেয়েছিল সংবিধান, গণতন্ত্র, মানবতা, সংস্কৃতি, উন্নয়নসহ আমাদের মহত্তম অর্জনগুলো। যে জাতি রক্ত দিয়ে দেশ স্বাধীন করেছে, সে জাতিই আবার জীবন দিয়ে, দীর্ঘ সংগ্রাম করে ফিরিয়ে এনেছে গণতন্ত্র এবং মানুষের অধিকার। ২০০৮ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে জাতি রায় দিয়েছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পক্ষে, উন্নয়নের পক্ষে, দিনবদলের পক্ষে। আজ সময় এসেছে মুক্তিযুদ্ধের ফসল প্রতিটি মানুষের ঘরে পৌঁছে দেয়ার। সরকার মানুষের আকাঙ্ক্ষা পূরণে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ‌তারাক রহমান ‌মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে প্রবাসী বাংলাদেশিসহ দেশবাসীকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানান। তিনি বলেন, আজকের এই দিনে তিনি সশ্রদ্ধ চিত্তে স্মরণ করছেন সেসব বীর শহীদের কথা, যাদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে স্বাধীনতা পেয়েছেন। তিনি স্বাধীনতা যুদ্ধের বীর শহীদদের রুহের মাগফিরাত কামনা করেন। স্বাধীনতার জন্য যেসব মা-বোন সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করেছেন তিনি তাদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।

শেখ মুজিবুর রহমানেরডাকে শুরু হওয়া স্বাধীনতা যুদ্ধ ওই বছর ১৬ ডিসেম্বর পাকহানাদার বাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে সমাপ্ত হয়েছিলো। এদেশের দামাল ছেলেরা হানাদার বাহিনীকে পরাস্ত করে ছিনিয়ে এনেছিলো স্বাধীনতার সূর্য।

তিনি বলেন, শোষণ-বঞ্চনামুক্ত একটি গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার প্রত্যয় নিয়েই ১৯৭১-এ এদেশের মানুষ স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলো। স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সময় গণতন্ত্র বাধাগ্রস্ত হয়েছে, জনগণের মৌলিক ও মানবিক অধিকার খর্ব হয়েছে। কিন্তু প্রতিবারই এদেশের গণতন্ত্রপ্রিয় মানুষ লড়াই-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে গণতন্ত্র ও মৌলিক অধিকার পুনরুদ্ধার করেছে।

খালেদা জিয়া বলেন, ১৯৭১-এ আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি শত্রুমুক্ত হলেও দুশমনদের শ্যোন দৃষ্টি আজো বিদ্যমান। আধিপত্যবাদী শক্তি এদেশের স্বাধীনতা-স্বার্বভৌমত্বকে গ্রাস করে আমাদের একটি পদানত জাতিতে পরিণত করার অপপ্রয়াসে লিপ্ত। ওই অপশক্তির নীলনকশা বাস্তবায়নে এদেশেরই কিছু চিহ্নিত মহল মদদ জুগিয়ে চলেছে। ওদের হাত থেকে প্রিয় মাতৃভূমির স্বাধীনতা-স্বার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং গণতন্ত্রকে বিপদমুক্ত করতে স্বাধীনতা যুদ্ধের চেতনায় বলীয়ান হয়ে আমাদের জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলতে হবে। মহান বিজয় দিবসে আমি দেশবাসীর প্রতি সে আহ্বান জানাই।

আজ সূর্যোদয়ের সময় সাভার জাতীয় স্মৃতিসৌধে রাষ্ট্রপতি মো. জিল্লুর রহমান পুষ্পার্ঘ অর্পণ করবেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনে যোগ দিতে কোপেনহেগেনে যাওয়ায় স্মৃতিসৌধে তার পক্ষে পুষ্পার্ঘ অর্পণ করা হবে। অনুষ্ঠানে সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীর সদস্যরা সমন্বিত গার্ড অফ অনার প্রদান করবে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও কার্যালয়ে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হবে। দেশের জাতীয় দৈনিকগুলো বিশেষ ক্রোড়পত্র, সরকারি-বেসরকারি টিভি চ্যানেল, বাংলাদেশ বেতার ও এফএম রেডিও স্টেশনগুলো বিশেষ অনুষ্ঠানমালা সমপ্রচার করবে।

দেশের রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করবে। রাষ্ট্রীয়ভাবেও আয়োজন করা হয়েছে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের। আজ সকালে বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে শিশু-কিশোর সমাবেশের আয়োজন করেছে ঢাকা জেলা প্রশাসন। আজ সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীর বাদকদল জাতীয় সংসদ এলাকায় ক্রিসেন্ট লেক, ফার্মগেটের পার্ক এলাকা ও মিরপুর ২ নম্বর জাতীয় স্টেডিয়ামে দুপুর ২টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত যন্ত্রসঙ্গীত পরিবেশন করবে। নৌবাহিনীর কিছু জাহাজ জনসাধারণের পরিদর্শনের জন্য দুপুর ২টা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সদরঘাট, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম, মংলা ও বরিশালে উন্মুক্ত রাখা হবে।
মহান বিজয় দিবস, বাঙালি জাতির হাজার বছরের শৌর্যবীর্য ও বীরত্বের এক অবিস্মরণীয় গৌরবময় দিন। বীরের জাতি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার দিন। পৃথিবীর মানচিত্রে বাংলাদেশ নামে একটি স্বাধীন ভূখণ্ডের নাম জানান দেয়ার দিন। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ১৯৪৮ সাল থেকে ৫২-র ভাষা আন্দোলন, ৬৬-র ছয় দফা, ৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান, ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ, ২৫ মার্চে গণহত্যা শুরু হলে ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা, ১৭ এপ্রিল মুজিবনগর সরকার গঠন এবং রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে ৩০ লাখ শহিদ ও দুই লাখ মা-বোনের আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত হয় স্বাধীনতা। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাক সেনাদের আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হয়। সে হিসেবে বিজয়ের ৫২ বছর পূর্তির দিন কাল।
জাতীয় পর্যায়ে আজ ঢাকায় প্রত্যুষে ৩১ বার তোপধ্বনির মাধ্যমে দিবসটির সূচনা হবে। সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধান উপদেষ্টা ডক্টর ইউনুস ‌সাভার জাতীয় স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তববক অর্পণ করবেন। এরপর মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রীর উপস্থিতিতে বীরশ্রেষ্ঠ পরিবার, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও বীর মুক্তিযোদ্ধারা পুষ্পস্তবক অর্পণ করবেন। বাংলাদেশে অবস্থানরত বিদেশি কূটনীতিকবৃন্দ, মুক্তিযুদ্ধে মিত্রবাহিনীর সদস্য হিসেবে অংশগ্রহণকারী আমন্ত্রিত ভারতীয় সেনাবাহিনীর সদস্যগণ এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনসহ সর্বস্তরের জনগণ পুষ্পস্তবক অর্পণ করে মহান মুক্তিযুদ্ধে শহিদ বীর মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাবেন।
দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি ও প্রধান উপদেষ্টা ‌বাণী দেবেন। দিবসের তাৎপর্য তুলে ধরে এদিন সংবাদপত্রসমূহ বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশ করবে। এ উপলক্ষে ইলেকট্রনিক মিডিয়াগুলো মাসব্যাপী মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক বিভিন্ন অনুষ্ঠানমালা প্রচার করবে। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোয় দেশের শান্তি, সমৃদ্ধি ও অগ্রগতি কামনা করে বিশেষ দোয়া ও উপাসনার আয়োজন করা হবে। এতিমখানা, বৃদ্ধাশ্রম, হাসপাতাল, জেলখানা, শিশু বিকাশ কেন্দ্রসহ অনুরূপ প্রতিষ্ঠানগুলোয় উন্নত মানের খাবার পরিবেশন করা হবে। দেশের সব শিশুপার্ক ও জাদুঘরে বিনা টিকিটে প্রবেশাধিকার সর্বসাধারণের জন্য উš§ুক্ত থাকবে এবং সিনেমা হলে বিনা মূল্যে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র প্রদর্শনী আয়োজিত হবে।
আদি বাঙালির সাংস্কৃতিক ও আর্থ-সামাজিক জীবন এবং ক্রমবিকাশের চূড়ান্ত পর্যায়ে এসে বাঙালির শৌর্য-বীর্য যেন আরেকবার দপ করে জ্বলে ওঠে। প্রথম আগুন জ্বলে ’৫২-র একুশে ফেব্রুয়ারি। ফাগুনের আগুনে ভাষা আন্দোলনের দাবি আর উš§াতাল গণমানুষের মুষ্টিবদ্ধ হাত একাকার হয়ে যায় সেদিন। ভাষার জন্য প্রথম বলীদান বিশ্ববাসী অবাক বিস্ময়ে লক্ষ করে। সেই থেকে শুরু হয়ে যায় বাঙালির শেকল ভাঙার লড়াই।
৭ মার্চ একাত্তরের বিশাল জনসমুদ্র থেকে যুগের কবি, মহাকাব্যের প্রণেতা বঙ্গবন্ধু বজ্রকণ্ঠ ঘোষণা দেনÑ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তি সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। রক্ত যখন দিয়েছি তখন আরও দেব, তবুও এদেশকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশাআল্লাহ।’ এই একটিমাত্র উচ্চারণে যেন বাঙালি সত্যিকার দিকনির্দেশনা পেয়ে যায়। চূড়ান্ত লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিতে থাকে বাঙালি। বাঙালি বুঝে যায়, শেষ কামড় দেয়ার সময় আসন্ন। পাকিস্তানিরাও আর বসে নেই। পুরো জাতিকে স্তব্ধ করার লক্ষ্যে মারাত্মক মারণাস্ত্র নিয়ে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ ঘুমন্ত জাতির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। শুরু হয় বাঙালিনিধন যজ্ঞ।
মুক্তিপাগল বাংলার দামাল ছেলেরা স্বাধীনতার রক্তসূর্যকে ছিনিয়ে আনবে বলে একদিন অস্ত্র কাঁধে তুলে নেয়। ছাত্র, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, কৃষক, শ্রমিক, কামার, কুমার সবাই শরিক হয়ে যান এ লড়াইয়ে। যতই দিন অতিবাহিত হতে থাকে আরও শানিত হয় প্রতিটি মুক্তিযোদ্ধার অস্ত্র। লক্ষ্য স্থির রেখে শত্রুহননে দৃঢ়তায় এগিয়ে যায় বীর বাঙালি। এরই মধ্যে বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের প্রতি আন্তর্জাতিক সমর্থন স্পষ্ট হয়ে ওঠে। প্রতিবেশী ভারতও জড়িয়ে পড়ে বাঙালির ভাগ্যযুদ্ধে। ডিসেম্বরে শেষ পর্যায়ে এসে চূড়ান্ত রূপ নেয় এই যুদ্ধ।
অবশেষে ৯ মাসের দুঃস্বপ্নের অবসান ঘটিয়ে বাঙালি জাতির জীবনে এলো নতুন প্রভাত। ১৬ ডিসেম্বর সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে সূচিত হলো মুক্তিযুদ্ধের অনিবার্য বিজয়। এর মধ্য দিয়ে এলো হাজার বছরের কাক্সিক্ষত স্বাধীনতা।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও পড়ুন
© All rights reserved © dailyamarsomoy.com