1. admin@gmail.com : দৈনিক আমার সময় : দৈনিক আমার সময়
  2. admin@dailyamarsomoy.com : admin :
সোনালী পাকা ধান ঘরে তুলতে পারেনি কৃষকরা, বোরো ধান পানির নিচে ডুবে গেছে-কাঁদছেন কৃষক - দৈনিক আমার সময়

সোনালী পাকা ধান ঘরে তুলতে পারেনি কৃষকরা, বোরো ধান পানির নিচে ডুবে গেছে-কাঁদছেন কৃষক

দিদারুল আলম সিকদার, কক্সবাজার জেলা প্রতিনিধি
    প্রকাশিত : রবিবার, ১০ মে, ২০২৬

কক্সবাজারে ধান চাষ করে কাঁদছেন কৃষকরা জেলায় বৃষ্টিতে ধানের তেমন ক্ষতি হয়নি। কৃষকের তেমন ক্ষতি হবে না। কিছু কিছু এলাকায় ধান বাতাসে হেলে গেছে।

 

কক্সবাজার জেলায় বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে সোনালী ধানের সমারোহ দিয়েছিল ক’দিন আগেই। তবে সেই পাকা ধান আর ঘরে তুলতে পারেনি কৃষকরা। ৯০ শতাংশ সোনালী পাকা বোরো ধান পানির নিচে ডুবে গেছে। প্রকৃতি যেন সব তাদের সব হিসাব-নিকাশ ওলট-পালট করে দিয়েছে। যেখানে নতুন ধানে বাড়িতে বাড়িতে উৎসব হওয়ার কথা ছিল, সেখানে এখন কেবলই কান্না আর অনিশ্চয়তার কালো মেঘ।

 

কৃষকরা বলছেন, ধান চাষের উৎপাদন খরচ বহুগুণ বেড়ে গেছে এবং বাজারে ধানের ন্যায্যমূল্য পাওয়া যায় না।

 

ধানে পোকার আক্রমণ, সেচ খরচ, বিষ, সার, তেল, মজুরি সবমিলিয়ে ধান চাষে লাভের চেয়ে লোকসান বেশি। এছাড়া গত কয়েকদিনের টানা ভারী বৃষ্টি এবং উজান থেকে নেমে আসা পানির ঢলে কক্সবাজার সদরে খুরুশকুল, পিএমখালী চকরিয়া, পেকুয়া, রামু, উখিয়া, টেকনাফ উপজেলার বোরোধান পানিতে ডুবে যায়।

 

ফলে অনেক কৃষকই ধানের বিকল্প হিসেবে অন্য ফসলের চিন্তা করছেন। মূলত উৎপাদন খরচ ও লোকসানের ঝুঁকি কমাতে এই পরিবর্তন চাচ্ছেন তারা।

 

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানিয়েছে, চলতি বোরো মৌসুমে আবাদি জমির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৫৫ হাজার ৭০০ হেক্টর। গত বছর ছিল ৫৫ হাজার ৬৯০ হেক্টর। বোরো মৌসুমে হাইব্রিড, উফশী ও স্থানীয় তিন জাতের ফলনের আবাদ করেছেন কৃষকরা। ফলন আশা করা হয়েছিল, গড়ে ৪ দশমিক ২৩ শতাংশ। যা গত বছর ছিল ৪ দশমিক ২২ শতাংশ। যেখানে চাল উৎপাদনের লক্ষ্য মাত্রা ধরা হয়েছিল ২ লাখ ৩৫ হাজার ৭৫২ মেট্রিক টন। আবহাওয়া অনুকুলে থাকায় ও নিবিড় পরিচর্চায় এ বছর ধানের ফলন খুব ভালো হয়েছে। ফলে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাবে বলে প্রত্যাশা করছিলেন দপ্তরটি। কিন্তু, সব হিসাব নিকেশ যেন উল্টো হয়ে গেলো। বোরোধানের লক্ষ্যমাত্রা অর্ধেকে নেমে আসবেন বলে ধারণা করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

 

সংশ্লিষ্টদের মতে, টানা কয়েক বছর ধরে ধান চাষিরা ধানের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। ফলে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন কৃষক। এছাড়া প্রাকৃতিক দূর্যোগেও সরকারিভাবে সহায়তা পাওয়া যায় না। যা আসে তাও সঠিকভাবে বন্টন হয় না। একারণে কৃষকরা ধান চাষ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে চাইবেন, এটাই স্বাভাবিক।

 

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, চকরিয়া উপজেলায় সবচেয়ে বেশি বোরোধানের আবাদ হয়েছে। এর পরে রয়েছে, পেকুয়া, রামু, উখিয়া ও টেকনাফ। গেলো কয়েক দিনের বৃষ্টিতে কৃষকের সোনালি পাকা ধান পানিতে ডুবে গেছে। চকরিয়া বড়ইতলী, কৈয়ারবিল, হারবাং ও বড়ইতলী ইউনিয়নের ( নানু বিল) এলাকায় কৃষকের ১৫-২৫ হেক্টর জমির পাকা বোরোধান পানিতে তলিয়ে যায়। আংশিক ক্ষতির পরিমাণ ৩০-৪০ হেক্টর।

 

এছাড়া, জেলার ৭০-৮০ শতাংশ ধান কাটতে পারেনি কৃষকেরা। দুই থেকে তিনদিন বৃষ্টি হওয়াতে পানির নিচে ধান নষ্ট হয়ে যায়। চলতি বোরো মৌসুমে বোরোধানের আবাদের সাথে জড়িত অন্তত ৫০-৬০ হাজার কৃষক পরিবার। টানা বৃষ্টি ও উৎপাদন খরচের চাপে এই অঞ্চলের কৃষকরা প্রতি বছর হাজার কোটি টাকার ক্ষতির সম্মুখীন হন। ধানের দাম কমে গেলে এবং উৎপাদন খরচ (সার, বীজ, সেচ) বেড়ে গেলে কৃষকরা, লিজ নেওয়া জমিতে চাষ করে, বিরাট লোকসানের মুখে পড়েন।

 

সদরে খুরুশকুল ও পিএমখালী সহ চনখোলাতে অধিকাংশ পানির নিচের পড়ে আছে পাকা ধান। ঘুরেফিরে সড়ে জমিনে দেখা কৃষকরা অনেক কষ্ট করে পানির নিচ থেকে কেটে ঘরে তুলার জন্য কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।

 

চাকমার কুল ইউনিয়নের ৮ নং ওয়ার্ডের দক্ষিণ সমাদর পাড়া এলাকার স্থানীয় কৃষক হাফেজ আহমেদ বলেন, ‘বৃষ্টিতে ১০০ শতক জমির ধান পানিতে ডুবে যায়। দুই দিন পানির নিচে থাকায় ৪০ শতক (এক কানি) জমির পাকা ধান সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়। বৃহস্পতিবার (৭ মে) ১০ শতক জমির ধান কেটেছি। অবশিষ্ট ধান শনিবার থেকে কাটবো। শ্রমিকের সংকট হওয়াতে নিজ থেকে ধান কাটতে হচ্ছে, বলেন তিনি।’

 

চাকমারকুল ৯ নং ওয়ার্ডের মাদ্রাসা গেইট এলাকার স্থানীয় কৃষক ছাবের আহমেদ বলেন, ‘৩৬০ শতক জমির সবটুকু পানিতে ডুবে গেছে। বৃষ্টি নেমে গেলে ধান কাটা শুরু করেছি। এবারের বোরো আবাদে তার ৫০ হাজার টাকা লোকসান হবে বলে জানান তিনি।’

 

পেকুয়া উপজেলা হাজি বাজার এলাকার আবদুর রহিম জানালেন, ‘এক একর জমি চাষ থেকে শুরু করে কাটা পর্যন্ত তার খরচ হয়েছে ৪০ হাজার টাকা। এই জমিতে ৫০ মণের বেশি ধান হবে না। ধানগুলো ৪০ হাজার টাকার বেশি বেচা যাবে না। এছাড়া বৃষ্টিতে নষ্ট হয়েছে ৩০ শতক পাকা বোরো ধান। এ অবস্থায় পরিবার-পরিজন নিয়ে চলবো কীভাবে?’

 

চকরিয়া কাকারা ইউনিয়নের ৩ নং ওয়ার্ডের আবুল কালাম, রনজু, লোকমান, ছৈয়দ আলমসহ বিভিন্ন উপজেলার কৃষকের মাঝে এখন শুধুই হতাশা। তাঁদের মতে, কৃষি ক্ষেতে এখন লাভের চেয়ে লোকসান বেশি। বিষ, সার, সেচ, বিদ্যুৎ, শ্রমিকের দাম বাড়তেই আছে। কমার কোনো সুযোগ নেই। এছাড়া উৎপাদিত ধানের দামও কম। সরকার যে দামে ধান কিনতে চাই, সেই দামেও বিক্রিতে কৃষকের লোকসান। মিল মালিকরা সিন্ডিকেট করে ধানের দাম কমিয়ে ফেলেন। সবমিলিয়ে ধানের আবাদ থেকে অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন জেলার কয়েক হাজার কৃষক।

 

তথ্য বলছে, গত ১০ বছর আগে কক্সবাজার জেলায় কৃষি কাজে জড়িত ছিল প্রায় ৫ লাখ মানুষ। এঁদের কেউ ধান চাষ, কেউ শীতকালীন বিভিন্ন রকমের সবজি আবার মৌসুমী ফলের আবাদ করতেন। প্রান্তিক কৃষকেরা তাঁদের সন্তানদের তাঁদের সাথে কৃষি আবাদে কাজ করাতেন। কৃষি যন্ত্রাংশ, উৎপাদন খরচ লাগাম ছাড়া বৃদ্ধির কারনে তৃতীয় শতাংশ কৃষক ও তাঁদের সাথে সহযোগিতা করা সন্তানরা বিদেশে পাড়ি জমায়। আবার কেউ ব্যবসা ও চাকুরীতে চলে যায়। বর্তমানে জেলায় কৃষকের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৩৭ হাজার। এদের মধ্যেও আগামী এক বছরে ২০ হাজার কৃষক অন্য পেশায় চলে যাবে বলে জানা গেছে।

 

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক বিমল কুমার জানান, ‘জেলায় বৃষ্টিতে ধানের তেমন ক্ষতি হয়নি।কৃষকের তেমন ক্ষতি হবে না। কিছু কিছু এলাকায় ধান বাতাসে হেলে গেছে। বৃষ্টি কমে গেলে কৃষকেরা ধান কাটতে শুরু করে। এখন পর্যন্ত ৪০ শতাংশ বোরোধান কর্তন হয়েছে। বৃষ্টি না হলে দুই এক সপ্তাহের সব ধান কাটা শেষ হবে বলে তিনি জানান।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও পড়ুন
© All rights reserved © dailyamarsomoy.com