1. admin@gmail.com : দৈনিক আমার সময় : দৈনিক আমার সময়
  2. admin@dailyamarsomoy.com : admin :
‎মাদকবিরোধী সভার মঞ্চে চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী! ‎চট্টগ্রামে তোলপাড়, কার ছত্রছায়ায় বেপরোয়া শওকত নেওয়াজ - দৈনিক আমার সময়

‎মাদকবিরোধী সভার মঞ্চে চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী! ‎চট্টগ্রামে তোলপাড়, কার ছত্রছায়ায় বেপরোয়া শওকত নেওয়াজ

জাকারিয়া হোসেন, চট্টগ্রাম
    প্রকাশিত : মঙ্গলবার, ১৯ মে, ২০২৬

‎চট্টগ্রাম মহানগরীতে দিন দিন ভয়ংকর রূপ নিচ্ছে মাদক ব্যবসা, কিশোর গ্যাং, ছিনতাই, চুরি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড। নগরীর অলিগলি, আবাসিক এলাকা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসংলগ্ন অঞ্চল থেকে শুরু করে গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন পয়েন্টে এখন মাদকের ছড়াছড়ি। ইয়াবা, গাঁজা, ফেনসিডিল, হেরোইনসহ নানা ধরনের মাদকে আসক্ত হয়ে পড়ছে তরুণ সমাজ। পরিবার হারাচ্ছে সন্তান, মায়েরা হারাচ্ছেন স্বপ্ন, আর সমাজ ধীরে ধীরে ধাবিত হচ্ছে ভয়াবহ অন্ধকারের দিকে।
‎তবে সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, যারা প্রকাশ্যে মাদকবিরোধী আন্দোলন, মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সভা করছে, অভিযোগ উঠেছে সেই কর্মসূচির মঞ্চেই দেখা যাচ্ছে চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ীদের উপস্থিতি। এমনই এক চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটেছে চট্টগ্রাম মহানগরীর খুলশী ও ২০নং দেওয়ান বাজার ওয়ার্ড এলাকায়।
‎সম্প্রতি সি-ইউনিট বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের উদ্যোগে মাদক ও কিশোর গ্যাং-এর সামাজিক অশান্তি প্রতিরোধে আলোচনা ও মতবিনিময় সভা শীর্ষক একটি উঠান বৈঠকের আয়োজন করা হয়। ব্যানারে বড় অক্ষরে লেখা ছিল,
‎মাদক ও কিশোর গ্যাংমুক্ত সমাজ গড়তে ঐক্যবদ্ধ হোন।
‎সভায় উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় বিএনপি নেতৃবৃন্দ, রাজনৈতিক কর্মী, এলাকাবাসী এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও। কিন্তু পুরো আয়োজনকে প্রশ্নবিদ্ধ করে দেয় একটি দৃশ্য। সভার মঞ্চে প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াতে দেখা যায় এলাকার বহুল আলোচিত ও একাধিক মামলার আসামি চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী শওকত নেওয়াজকে।
‎স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, তিনি শুধু উপস্থিতই ছিলেন না, বরং অত্যন্ত প্রভাবশালী ব্যক্তির মতো সভাস্থলে চলাফেরা করেছেন। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকায় তীব্র ক্ষোভ ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
‎সাধারণ মানুষের প্রশ্ন, মাদকবিরোধী সভার মঞ্চে একজন চিহ্নিত মাদক কারবারি কীভাবে স্থান পায়? আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা উপস্থিত থাকার পরও কেন তাকে আটক করা হয়নি? তাহলে কি মাদক ব্যবসায়ীরা এখন রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিচয়ের আড়ালে নিজেদের অবস্থান শক্ত করছে?
‎পুলিশের পিসিপিআর (PCPR) নথি ঘেঁটে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, মৃত নজির আহাম্মদের ছেলে শওকত নেওয়াজের বিরুদ্ধে রয়েছে একাধিক মাদক মামলা, গ্রেফতারি পরোয়ানা ও অপরাধের রেকর্ড।
‎তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালের ১৪ জুলাই কোতোয়ালী থানার এফআইআর নং-২১ মামলায় তাকে বিপুল পরিমাণ মাদকসহ গ্রেফতার করা হয়। ২০১৭ সালের ২৬ আগস্ট তার বিরুদ্ধে আরও একটি মাদক মামলা দায়ের হয়, এফআইআর নং-৮১/৬৭২। পরবর্তীতে ২০২১ সালের ২৮ মে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে তার বিরুদ্ধে নতুন মামলা ও গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়।
‎পুলিশ সূত্রে জানা যায়, বলুয়ার দিঘীর পশ্চিম পাড় হামিদ বিল্ডিংয়ের একটি ভাড়া বাসা থেকে তাকে আটক করা হয়েছিল। তার বিরুদ্ধে ১৯৯০ ও ২০১৮ সালের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের বিভিন্ন ধারায় মামলা রয়েছে।
‎স্থানীয়দের অভিযোগ, শওকত নেওয়াজ দীর্ঘদিন ধরে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করে আসছে। তার রয়েছে নিজস্ব সিন্ডিকেট, যাদের মাধ্যমে বিভিন্ন এলাকায় মাদক সরবরাহ করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়া থাকায় বারবার আইনের হাত থেকে রক্ষা পেয়ে যাচ্ছে সে।
‎ইদানিং চট্টগ্রাম নগরীতে একটি ভয়ংকর প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিভিন্ন মাদকবিরোধী মানববন্ধন, প্রতিবাদ সমাবেশ, উঠান বৈঠক ও সচেতনতামূলক কর্মসূচিতে সামনের সারিতে দেখা যাচ্ছে এমন অনেক ব্যক্তিকে, যাদের বিরুদ্ধে এলাকাবাসীর দীর্ঘদিনের অভিযোগ রয়েছে মাদক ব্যবসা, কিশোর গ্যাং পরিচালনা ও অপরাধ জগতের সঙ্গে সম্পৃক্ততার।
‎স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, এরা এখন সমাজসেবক সেজে নিজেদের অপরাধ ঢাকার চেষ্টা করছে। রাজনৈতিক ও সামাজিক অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করছে, যেন ভবিষ্যতে কেউ তাদের বিরুদ্ধে কথা বলতে সাহস না পায়।
‎অনেকেই বলছেন, বর্তমানে কিছু মাদক কারবারি রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে এলাকায় আধিপত্য বিস্তার করছে। কেউ কেউ বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে অনুদান দিয়ে বা মানববন্ধনে অংশ নিয়ে নিজেদের জনদরদী হিসেবে উপস্থাপন করছে। অথচ আড়ালে চলছে মাদক বাণিজ্যের বিশাল নেটওয়ার্ক।
‎এলাকাবাসীর অভিযোগ, নগরীর বিভিন্ন এলাকায় মাদক ব্যবসা বিস্তারের পেছনে প্রশাসনের কিছু অসাধু কর্মকর্তা, রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তি ও কথিত সাংবাদিকদের যোগসাজশ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, নিয়মিত মাসোহারা ও সুবিধা আদায়ের মাধ্যমে মাদক কারবারিদের রক্ষা করা হচ্ছে।
‎স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, অনেক সময় অভিযানের আগেই মাদক ব্যবসায়ীরা তথ্য পেয়ে যায়। ফলে তারা নিরাপদে সরে যেতে সক্ষম হয়। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে গ্রেফতারের পরও রহস্যজনকভাবে জামিনে বের হয়ে এসে পুনরায় একই অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।
‎একাধিক সচেতন নাগরিক অভিযোগ করেন, নামধারী কিছু সাংবাদিক মাদক ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে মাসোহারা নিয়ে তাদের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশ না করে উল্টো ঢাল হিসেবে কাজ করছে। ফলে প্রকৃত সাংবাদিকতার বদলে একটি সুবিধাভোগী চক্র তৈরি হয়েছে। এ কারণেই নগরীতে দিন দিন মাদক ব্যবসা ভয়ংকর আকার ধারণ করছে বলে মনে করছেন সচেতন মহল।
‎বিশেষজ্ঞদের মতে, চট্টগ্রাম নগরীতে মাদক সহজলভ্য হয়ে পড়ায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কিশোর ও তরুণরা। স্কুল-কলেজপড়ুয়া শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে বেকার যুবকরাও দ্রুত মাদকের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। মাদকাসক্তি থেকে জন্ম নিচ্ছে কিশোর গ্যাং, ছিনতাই, চুরি, সন্ত্রাস ও খুনের মতো অপরাধ।
‎অনেক পরিবার অভিযোগ করেছে, মাদকের কারণে তাদের সন্তান পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। কেউ কেউ ঘরের জিনিসপত্র বিক্রি করছে, আবার কেউ অপরাধ জগতে জড়িয়ে যাচ্ছে। ফলে সামাজিক অস্থিরতা দিন দিন বেড়েই চলেছে।
‎ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। ফেসবুকসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন,
‎মাদকবিরোধী সভার মঞ্চে যদি মাদক ব্যবসায়ীর উপস্থিতি থাকে, তাহলে সাধারণ মানুষ কার উপর ভরসা করবে?
‎আবার কেউ লিখেছেন,
‎চিহ্নিত অপরাধীদের রাজনৈতিক ছত্রছায়া বন্ধ না হলে কখনোই মাদক নির্মূল সম্ভব নয়।
‎এলাকাবাসী বলছেন, মাঝে মাঝে লোক দেখানো অভিযান চালিয়ে মাদক নির্মূল সম্ভব নয়। প্রয়োজন নিয়মিত অভিযান, কঠোর নজরদারি এবং মাদক কারবারিদের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক আশ্রয় বন্ধ করা।
‎তাদের দাবি, চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ীদের দ্রুত গ্রেফতার করতে হবে, মাদক কারবারিদের আশ্রয়দাতাদের আইনের আওতায় আনতে হবে, কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণে বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করতে হবে এবং প্রশাসনের ভেতরে থাকা দুর্নীতিবাজ সদস্যদের বিরুদ্ধে তদন্ত করতে হবে।
‎চট্টগ্রাম এখন এক ভয়ংকর সংকটের মুখোমুখি। মাদক শুধু একজন ব্যক্তিকে নয়, ধ্বংস করছে পরিবার, সমাজ ও পুরো প্রজন্মকে। অথচ সেই মাদক ব্যবসায়ীরাই যদি প্রকাশ্যে মাদকবিরোধী সভার মঞ্চে অবস্থান নেয়, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই, আসলেই কি মাদক নির্মূলে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, নাকি সবই কেবল লোক দেখানো আয়োজন?
‎সচেতন নাগরিকদের মতে, এখনই কঠোর ও নিরপেক্ষ ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠবে। রাজনৈতিক পরিচয়, প্রভাব বা অর্থের কারণে যেন কোনো অপরাধী পার না পায়, এটাই এখন নগরবাসীর সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও পড়ুন
© All rights reserved © dailyamarsomoy.com