চট্টগ্রাম নগরীর ঐতিহাসিক ব্যবসাকেন্দ্র খাতুনগঞ্জের সুপরিচিত ও ঐতিহ্যবাহী আছাদ আলী সওদাগর পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিকল্পিত অপপ্রচার, মিথ্যা তথ্য প্রচার, ব্ল্যাকমেইল এবং ষড়যন্ত্রমূলক কর্মকাণ্ড চালানোর অভিযোগ উঠেছে সুমন ঘোষ নামের এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে। একই সঙ্গে ফেসবুক লাইভে বিষপানের নাটক সাজিয়ে একটি সম্মানিত ব্যবসায়ী পরিবারকে হত্যা মামলাসহ বিভিন্ন গুরুতর মামলায় জড়ানোর অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা।
শনিবার (২০ জুন) সন্ধ্যায় খাতুনগঞ্জ এলাকায় আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব অভিযোগ তুলে ধরেন আছাদ আলী সওদাগর পরিবারের সদস্য মো. শাহাদাত আলী, মো. আয়ুব আলী ও মোহাম্মদ শমসের আলী। সংবাদ সম্মেলনে তারা দাবি করেন, দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে তাদের পারিবারিক সম্পত্তি অবৈধভাবে দখল করে রাখা, ভাড়া পরিশোধ না করা, সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন করা এবং রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে হয়রানি করার ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবেই সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো ঘটানো হচ্ছে। সংবাদ সম্মেলনের শুরুতে বক্তারা বলেন, বিসমিল্লাহির রহমানির রাহিম। উপস্থিত সাংবাদিক ভাই ও বোনেরা, আসসালামু আলাইকুম। আজ আমরা আপনাদের সামনে উপস্থিত হয়েছি একটি দীর্ঘ ১৭ বছরের জুলুম, মিথ্যাচার, প্রতারণা এবং পরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরতে। কয়েকদিন ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও কিছু অনলাইন মাধ্যমে আমাদের পরিবারকে জড়িয়ে যেসব বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো হচ্ছে, তার পেছনের সত্য দেশবাসীর সামনে তুলে ধরতেই আমরা এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেছি।
বিষপান’ নয়, সাজানো নাটক-
সংবাদ সম্মেলনে পরিবারের সদস্যরা দাবি করেন, সম্প্রতি সুমন ঘোষ ফেসবুক লাইভে এসে বিষপানের একটি নাটক মঞ্চস্থ করেন এবং পরোক্ষভাবে এর দায় তাদের পরিবারের ওপর চাপানোর চেষ্টা করেন। তাদের অভিযোগ, এটি ছিল পূর্বপরিকল্পিত একটি নাটক, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল তাদের বিরুদ্ধে জনমত সৃষ্টি করা এবং ভবিষ্যতে মিথ্যা মামলা দায়েরের ক্ষেত্র প্রস্তুত করা।তারা বলেন, বর্তমানে তিনি হাসপাতালে ভর্তি থাকলেও সম্পূর্ণ সুস্থ ও স্বাভাবিক অবস্থায় রয়েছেন। প্রকৃত বিষক্রিয়ার ঘটনা ঘটলে একজন মানুষকে আইসিইউতে নেওয়া, পাকস্থলী পরিষ্কার করা কিংবা জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজন হয়। কিন্তু এমন কোনো বাস্তব চিত্র আমরা দেখতে পাইনি। তাই আমরা মনে করি এটি সম্পূর্ণ একটি সাজানো ঘটনা। পরিবারটির পক্ষ থেকে জানানো হয়, ঘটনার পরপরই তারা থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন এবং প্রশাসনের কাছে হাসপাতালের সিসিটিভি ফুটেজ, মেডিকেল রিপোর্ট, রক্ত পরীক্ষার ফলাফলসহ সংশ্লিষ্ট সব তথ্য যাচাই করে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনের দাবি জানিয়েছেন।
১৭ বছরের জমি দখলের অভিযোগ-
সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা বলেন, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর পেছনে মূল কারণ একটি দীর্ঘদিনের সম্পত্তি বিরোধ। তাদের দাবি, সুমন ঘোষ প্রায় ১৭ বছর ধরে তাদের বাবা ও চাচার মালিকানাধীন একটি জায়গা দখল করে রেখেছেন এবং এই দীর্ঘ সময়ে কোনো ভাড়া কিংবা আর্থিক পাওনা পরিশোধ করেননি। তারা অভিযোগ করেন, অতীতে যুবলীগের রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাব ব্যবহার করে তিনি ওই সম্পত্তির দখল বজায় রেখেছেন। ফলে জমির প্রকৃত মালিকরা নিজেদের সম্পত্তি থেকেও বঞ্চিত হয়েছেন। বক্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘদিন ধরে বিষয়টি নিয়ে নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও সুমন ঘোষ কখনোই সমাধানে আন্তরিকতা দেখাননি। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার আচরণ আরও আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে। তারা দাবি করেন, সুমন ঘোষের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ ও মামলাও রয়েছে এবং তিনি দীর্ঘদিন জেলা হাজতে ছিলেন।
কারাভোগ, সমঝোতা ও জামিনের প্রসঙ্গ-
সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা দাবি করেন, গত বছরের ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থান-সংক্রান্ত মামলায় সুমন ঘোষ প্রায় পাঁচ মাস কারাভোগ করেন। সে সময় তার পরিবারের সদস্যরা তাদের কাছে এসে আপস-চুক্তির প্রস্তাব দেন।
তারা বলেন, সুমন ঘোষের স্ত্রী, ছেলে, বোন ও ভগ্নিপতি আমাদের কাছে বারবার এসে অনুরোধ করেন। আমাদের বাবা ও চাচা প্রথমে কোনো চুক্তিতে রাজি না হলেও পরে মানবিক কারণে একটি লিখিত সমঝোতা করেন। পরবর্তীতে আমরা জানতে পারি, সেই চুক্তিপত্র আদালতে উপস্থাপন করে সুমন ঘোষের জামিন নিশ্চিত করা হয়েছে।তাদের অভিযোগ, জামিন লাভের পর তিনি চুক্তির কোনো শর্তই মানেননি। বরং উল্টো তাদের বিরুদ্ধেই অবস্থান নিয়ে বিভিন্নভাবে চাপ সৃষ্টি করতে শুরু করেন।
হত্যা মামলায় ফাঁসানোর’ হুমকির অভিযোগ-
ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা আরও দাবি করেন, জেল থেকে বের হওয়ার পর সুমন ঘোষ সরাসরি তাদের বাবা ও চাচাকে ভয়ভীতি দেখাতে শুরু করেন এবং যেকোনোভাবে হত্যা মামলায় জড়ানোর হুমকি দেন।
তারা বলেন, আমাদের মুরুব্বিদের সরাসরি বলা হয়েছে, যেভাবেই হোক তাদের মার্ডার কেসের আসামি বানানো হবে। এই হুমকির পরদিনই বিষপানের নাটক মঞ্চস্থ করা হয়। তাই আমরা মনে করি পুরো বিষয়টি একই ষড়যন্ত্রের অংশ।
তাদের মতে, একজন ব্যক্তি যদি আগে থেকেই কাউকে হত্যা মামলায় ফাঁসানোর হুমকি দেয় এবং তার পরদিন আত্মহত্যার নাটক করে, তাহলে বিষয়টি গভীরভাবে তদন্ত করা জরুরি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচারের অভিযোগ-
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, ১৯ জুন ভোররাতে সুমন ঘোষ নামের একটি ফেসবুক আইডি থেকে তাদের তিন ভাইয়ের ছবি ব্যবহার করে একাধিক বিভ্রান্তিকর পোস্ট দেওয়া হয়। ওই পোস্টগুলোতে এমনসব অভিযোগ করা হয়েছে, যার কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই বলে দাবি করেন তারা।
তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব পোস্টের মাধ্যমে শুধু ব্যক্তিগতভাবে নয়, পুরো আছাদ আলী সওদাগর পরিবারকে সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করা হয়েছে। কয়েক প্রজন্ম ধরে ব্যবসা-বাণিজ্য ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত একটি পরিবারকে বিতর্কিত করতেই এ অপপ্রচার চালানো হচ্ছে বলে অভিযোগ তাদের।
শাহাদাত আলী বলেন, আমাদের পরিবার বহু বছর ধরে খাতুনগঞ্জে সুনামের সঙ্গে ব্যবসা করে আসছে। আমরা কখনো কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিলাম না। অথচ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমনভাবে আমাদের উপস্থাপন করা হয়েছে যেন আমরা ভয়ংকর অপরাধী। এটি অত্যন্ত দুঃখজনক ও অপমানজনক।
চাঁদাবাজ’ আখ্যা দিয়ে সম্মানহানির চেষ্টা-
সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা অভিযোগ করেন, জমি দখল ও ভাড়া বকেয়ার বিষয়টি আড়াল করতেই তাদের বাবা ও চাচাকে চাঁদাবাজ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। তারা বলেন, আমাদের পরিবার এলাকায় অত্যন্ত সম্মানিত। বছরের পর বছর সততা ও পরিশ্রমের মাধ্যমে অর্জিত সামাজিক মর্যাদা নষ্ট করার জন্য আমাদের মুরুব্বিদের বিরুদ্ধে এমন কুরুচিপূর্ণ ও ভিত্তিহীন অভিযোগ আনা হয়েছে।
প্রশাসনের কাছে তদন্তের দাবি- সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা প্রশাসনের প্রতি কয়েকটি দাবি উত্থাপন করেন। তারা বলেন, ফেসবুক লাইভে কথিত বিষপানের ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত, হাসপাতালের মেডিকেল রিপোর্ট যাচাই, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচারের উৎস শনাক্তকরণ এবং জমি দখল সংক্রান্ত অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত করতে হবে। একই সঙ্গে তারা মিথ্যা তথ্য প্রচার, মানহানি, ব্ল্যাকমেইল ও ষড়যন্ত্রমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান।
তারা বলেন, আমরা আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। আমরা কোনো প্রতিহিংসা চাই না। আমরা শুধু চাই সত্য উদঘাটিত হোক, নিরপেক্ষ তদন্ত হোক এবং প্রকৃত অপরাধীরা আইনের আওতায় আসুক।নিরপেক্ষ তদন্তের আহ্বান-
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত স্থানীয় ব্যবসায়ী, গণ্যমান্য ব্যক্তি ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষও ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানান। তারা বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যাচাই-বাছাই ছাড়া তথ্য প্রচারের প্রবণতা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে এবং এটি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের জন্য বড় ধরনের ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনের শেষাংশে তিন ভাই একযোগে বলেন, আমরা ন্যায়বিচারে বিশ্বাস করি। আমাদের পরিবারকে ঘিরে যে অপপ্রচার, মানহানি ও ষড়যন্ত্র চলছে, তার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার চাই। আমরা বিশ্বাস করি সত্য একদিন প্রকাশ হবেই এবং মিথ্যা অপপ্রচারকারীদের মুখোশ উন্মোচিত হবে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানার জন্য অভিযুক্ত সুমন ঘোষের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
Leave a Reply