চট্টগ্রামের ইপিজেড থানাধীন বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিউবো) নিউমুরিং বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগে গ্রাহক হয়রানি, অর্থ দাবি, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং নিরাপত্তাকর্মীকে মারধরের অভিযোগ উঠেছে মো. এয়াছিন বাদশা ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে। সর্বশেষ গত ১ নভেম্বর এক নারীসহ কয়েকজন বহিরাগতকে নিয়ে বিদ্যুৎ অফিসে প্রবেশ করে নিরাপত্তাকর্মীকে মারধর এবং এক কর্মকর্তাকে কক্ষে অবরুদ্ধ করে রাখার চেষ্টা করে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় ইপিজেড থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন বিউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সামির আসাব।
থানায় দায়ের করা জিডি নং-৯৬, তারিখ ২ নভেম্বর ২০২৬। এতে মো. এয়াছিন বাদশা (২৯), পিতা মো. আব্দুর রহমান সিরাজ, অনিক (৩১), পিতা অজ্ঞাত এবং অজ্ঞাতনামা আরও দুই-একজনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে।
জিডির অভিযোগে বলা হয়, অভিযুক্তরা দীর্ঘদিন ধরে নিউমুরিং বিদ্যুৎ অফিসে সেবা নিতে আসা গ্রাহকদের বিভিন্নভাবে হয়রানি করে আসছেন। গত ১ নভেম্বর বিকেল আনুমানিক ৫টা ২০ মিনিটে তারা পুনরায় গ্রাহকদের হয়রানি করছিলেন। এ সময় প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তাকর্মী মো. দিনা (৩৯) বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলে তাকে এলোপাতাড়ি কিল-ঘুষি মেরে শরীরের বিভিন্ন স্থানে নীলাফোলা জখম করা হয়। পাশাপাশি প্রকাশ্যে ভয়ভীতি ও হুমকি প্রদর্শন করা হয়।
জানা গেছে, সাধারণ ডায়েরিটি বর্তমানে ইপিজেড থানার এএসআই মোহাম্মদ আজিজুল ইসলামের কাছে তদন্তাধীন রয়েছে। ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজও সংরক্ষিত রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত ২৯ অক্টোবর দক্ষিণ হালিশহরের কমিশনার গলিতে অবৈধ বিদ্যুৎ ব্যবহারের অভিযোগে পরিচালিত অভিযানের ঘটনাকে কেন্দ্র করে মূলত বিরোধের সূত্রপাত হয়।
বিদ্যুৎ আদালত, চট্টগ্রাম (দক্ষিণ), সি.জে.এম. কোর্ট, চট্টগ্রামে দায়ের করা সি.আর. মামলা নং-৫২৬/২৬-এর প্রসিকিউশন রিপোর্টে গ্রাহক মো. মাসুদ, পিতা মো. সোলাইমানের বিরুদ্ধে অবৈধ বিদ্যুৎ ব্যবহারের অভিযোগ আনা হয়েছে।
মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, ২৯ অক্টোবর দুপুর ১২টা ২০ মিনিটে রাজস্ব আদায়, অবৈধ বিদ্যুৎ ব্যবহার শনাক্তকরণ, লাইন বিচ্ছিন্নকরণ ও পরিদর্শনকালে গ্রাহকের আঙিনায় স্থাপিত প্রি-পেইড মিটার নং-০১০১১১০৫২০০৭-এর বিপরীতে পূর্ববর্তী পোস্টপেইড সময়ের ১৬ হাজার ৮৮২ টাকা বকেয়া পাওয়া যায়। এ ছাড়া ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২০ সাল থেকে কোনো রিচার্জ না করায় নন-ভেন্ডিং অ্যামাউন্ট ৫৪ হাজার ৫০০ টাকা থাকার বিষয়টিও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রসিকিউশন রিপোর্টে বলা হয়, গ্রাহক কোনো ধরনের রিচার্জ ছাড়াই বিদ্যুৎ লাইনে হুকিং বা বাইপাসের মাধ্যমে অবৈধভাবে বিদ্যুৎ ব্যবহার করে আসছিলেন। আবাসিক স্থাপনায় ৪ কিলোওয়াট লোডের ৭০ দশমিক ৬ শতাংশ হিসাবে আনুমানিক ৬৭৮ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহারের হিসাব দেখানো হয়। এ ঘটনায় বিদ্যুৎ আইন, ২০১৮-এর ৩২, ৩৩ ও ৪০ ধারায় বিদ্যুৎ অফিসের পক্ষ থেকে ১৬ হাজার ১৩৭ টাকা জরিমানা নির্ধারণ করে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের আবেদন করা হয়।
এ ছাড়া সংশ্লিষ্ট ঘটনায় ম্যাজিস্ট্রেট কর্তৃক জরিমানা এবং বিদ্যুৎ অফিসের নির্ধারিত জরিমানাসহ বকেয়া বিল মিলিয়ে মোট ১ লাখ ৭৪ হাজার ২৪১ টাকা জরিমানার বিষয়টি সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
মামলার রুজুকারী কর্মকর্তা হিসেবে সহকারী প্রকৌশলী মো. রাশেদুল ইসলামের নাম উল্লেখ রয়েছে। সাক্ষী হিসেবে রয়েছেন উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. মাজহারুল আলম ও লাইনম্যান-বি মো. রাশেদ উদ্দিন।
নিউমুরিং বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগের সহকারী প্রকৌশলী মো. ইব্রাহিম খলিল অভিযোগ করে বলেন, এয়াছিন বাদশা দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যুৎ অফিসের আশপাশে অবস্থান নিয়ে সেবা নিতে আসা গ্রাহকদের কাছে অর্থ দাবি করেন। সরকারি সেবা পাইয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে গ্রাহকদের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার চেষ্টা করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
তিনি বলেন, বিষয়টি দপ্তরের নজরে আসার পর অভিযুক্তকে এ ধরনের কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকার জন্য বলা হয়। এরপর থেকে তিনি অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভয়ভীতি ও হুমকি প্রদর্শন করে আসছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।
ইব্রাহিম খলিল আরও বলেন, ২৯ অক্টোবরের বিদ্যুৎ চুরির ঘটনায় অভিযুক্ত এয়াছিন বাদশার সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলে তারা মনে করেন। ওই ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়েই তিনি পরবর্তী সময়ে এমন কর্মকাণ্ড ঘটিয়েছেন বলে তাদের ধারণা। গত ১ নভেম্বর অফিস সময়ের পর এক নারীসহ চারজন বহিরাগতকে নিয়ে প্রতিষ্ঠানে এসে নিরাপত্তাকর্মীকে মারধর এবং আমাকে আমার কক্ষে অবরুদ্ধ করার চেষ্টা করেন। এ ঘটনার সিসিটিভি ফুটেজ সংরক্ষিত রয়েছে।
এমন ঘটনার কারণে নিউমুরিং বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। সরকারি প্রতিষ্ঠানে সেবা নিতে আসা সাধারণ গ্রাহকদের হয়রানি বন্ধ, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং অভিযোগগুলোর সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তারা।
অন্যদিকে, অভিযুক্ত মো. এয়াছিন বাদশার সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করেন। এসব ঘটনা কিংবা কোনো অনিয়মের সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা নেই বলেও দাবি করেন তিনি।
এ ঘটনায় থানায় দায়ের করা সাধারণ ডায়েরির তদন্ত, সংরক্ষিত সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা এবং সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যের ভিত্তিতে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটনের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
Leave a Reply