অবশেষে বহুল আলোচিত শিশু আবিদা সুলতানা আয়নী (আঁখি মনি) ধর্ষণ ও হত্যা মামলার বহুল প্রতীক্ষিত রায় ঘোষণা করেছেন আদালত। মামলার একমাত্র আসামি মো. রুবেলকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন চট্টগ্রাম নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-২।
সোমবার দুপুরে ট্রাইব্যুনালের বিচারক সাইফুর রহমান এ রায় ঘোষণা করেন।
মামলার রায়ে আদালত উল্লেখ করেন, সিসিটিভি ফুটেজ, ডিএনএ রিপোর্ট, ২৪ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য এবং অন্যান্য পারিপার্শ্বিক প্রমাণের ভিত্তিতে আসামি রুবেলের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। পরবর্তীতে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর ৯(৪)(খ) ধারা এবং দণ্ডবিধির ৩০২ ও ২০১ ধারায় তাকে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা হয়।
ঘটনার বিবরণ
২০২৩ সালের ২১ মার্চ বিকেলে চট্টগ্রাম নগরের পাহাড়তলী থানার কাজীর দিঘি এলাকার বাসা থেকে আরবি পড়তে বের হয়ে নিখোঁজ হয় ১০ বছর বয়সী আবিদা সুলতানা আয়নী ওরফে আঁখি মনি।
নিখোঁজের আট দিনেও মেয়ের কোনো সন্ধান না পেয়ে এক ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তার সহযোগিতায় বিশিষ্ট আইনজীবী অ্যাডভোকেট গোলাম মাওলা মুরাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন শিশুটির মা বিবি ফাতেমা।
এরপর ২০২৩ সালের ২৮ মার্চ তৎকালীন চট্টগ্রাম নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-২-এর বিচারক শারমিন জাহানের আদালতে মো. রুবেলের বিরুদ্ধে বিড়ালছানার লোভ দেখিয়ে আয়নীকে অপহরণের অভিযোগে মামলা দায়ের করেন শিশুটির মা। আদালত মামলাটি পাহাড়তলী থানার ওসিকে এজাহার হিসেবে গ্রহণের নির্দেশ দেন।
ওই দিনই রুবেলকে আটক করা হয়। পরে তার দেওয়া তথ্য ও দেখানো স্থান অনুযায়ী ২৯ মার্চ ভোরে পার্শ্ববর্তী পুকুরপাড়া মুরগি ফার্ম এলাকার একটি জলাশয় থেকে বস্তাবন্দি অবস্থায় আয়নীর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।
তদন্তে উঠে আসে ভয়াবহ তথ্য
তদন্তে জানা যায়, রুবেল বিড়ালছানার প্রলোভন দেখিয়ে আয়নীকে পার্শ্ববর্তী একটি খালি ভবনের চতুর্থ তলায় নিয়ে যায়। জিজ্ঞাসাবাদে সে আয়নীকে ধর্ষণ ও হত্যার কথা স্বীকার করে এবং পরবর্তীতে আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করে।
তার জবানবন্দিতে উল্লেখ করা হয়, ধর্ষণের সময় শিশুটি চিৎকার শুরু করলে তাকে হত্যা করা হয় এবং পরে মরদেহ গুম করে ফেলা হয়।
ঘটনার আট দিন পর মরদেহ উদ্ধার হওয়ায় সেটিতে পচন ধরেছিল। ফলে সুরতহাল প্রতিবেদনে ধর্ষণের সরাসরি আলামত পাওয়া যায়নি। তবে তদন্তে সিসিটিভি ফুটেজ, ডিএনএ রিপোর্ট, আসামির স্বীকারোক্তি, মরদেহ উদ্ধারের আলামত এবং সাক্ষ্য-প্রমাণ মামলার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে আদালতে উপস্থাপন করা হয়।
সিসিটিভি ফুটেজে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য
ঘটনার আগের দিনের সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, আয়নীকে সবজি বিক্রেতা রুবেলের সঙ্গে রাস্তায় দাঁড়িয়ে কথা বলতে। সে সময় রুবেল তাকে বিড়ালছানা দেওয়ার প্রলোভন দিচ্ছিল।
পরদিনের ফুটেজে দেখা যায়, বোরকা পরে আয়নী বাসা থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে। বের হওয়ার সময় এক সহপাঠীকেও সে জানায়, বিড়ালছানা আনতে যাচ্ছে।
তদন্ত ও বিচার কার্যক্রম
দীর্ঘ তদন্ত শেষে ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই পিবিআইয়ের তদন্ত কর্মকর্তা সিসিটিভি ফুটেজসহ প্রয়োজনীয় আলামত আদালতে দাখিল করে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন এবং দণ্ডবিধির সংশ্লিষ্ট ধারায় অভিযোগপত্র (চার্জশিট) জমা দেন।
২০২৪ সালের ১৯ নভেম্বর চট্টগ্রাম নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-২ মামলার একমাত্র আসামি মো. রুবেলের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন।
২০২৫ সালের ১০ জানুয়ারি সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু হয়। মামলায় মোট ২৪ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ সম্পন্ন হয়। তাদের মধ্যে বাদী, তদন্ত কর্মকর্তা, জব্দ তালিকার সাক্ষী, চিকিৎসক, আসামির ১৬৪ ধারার জবানবন্দি গ্রহণকারী ম্যাজিস্ট্রেটসহ গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীরা ছিলেন।
পরবর্তীতে ২০২৬ সালের ২৭ এপ্রিল আদালত নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৯(৪)(খ) এবং দণ্ডবিধির ৩০২ ও ২০১ ধারায় পুনরায় চার্জ গঠন করেন। সাক্ষ্যগ্রহণ ও উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক শেষে রায়ের জন্য দিন ধার্য করা হয়।
সাক্ষ্য-প্রমাণে অভিযোগ প্রমাণ
মামলায় ধর্ষণের কোনো প্রত্যক্ষদর্শী না থাকলেও মরদেহ উদ্ধারের সময় উপস্থিত সাক্ষী, সিসিটিভি ফুটেজ, ডিএনএ রিপোর্ট, আসামির স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি এবং অন্যান্য পারিপার্শ্বিক প্রমাণ আদালতের কাছে গ্রহণযোগ্য বিবেচিত হয়।
আইনজীবীর প্রতিক্রিয়া
মামলার বিষয়ে জানতে চাইলে শিশুটির পরিবারের পক্ষে মামলা পরিচালনাকারী অ্যাডভোকেট গোলাম মাওলা মুরাদ বলেন,
সাংবাদিকতার পাশাপাশি আমার ওকালতি জীবনের অন্যতম সেরা অর্জন এটি। সাড়ে তিন বছরের নিরলস পরিশ্রম আজ সার্থক হলো। মামলা দায়েরের দিন থেকে শুরু করে একটানা এই শিশুটির ধর্ষণ ও হত্যার ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে কাজ করেছি। আদালতের এই রায়ে আমরা সন্তুষ্ট।
Leave a Reply