একসময় বাংলার গ্রামাঞ্চলে সাধারণভাবে পাওয়া যেত “মনকাঁটা” নামে পরিচিত উদ্ভিদটি। বৈজ্ঞানিক নাম Meyna laxiflora Robyns, আর এটি Rubiaceae পরিবারের অন্তর্গত। ভাওয়াল-মধুপুর অঞ্চলে মনকাঁটা এবং চট্টগ্রাম অঞ্চলের আঞ্চলিক ভাষায় একে “মইনগুলা” বলে ডাকা হতো। কিন্তু কালের বিবর্তনে আজ এই উদ্ভিদটি প্রায় বিলুপ্তির পথে।
মনকাঁটা একটি শক্ত কাঠের ঝোপ-ঝাড়ের মতো গাছ, যার সারা কাণ্ডজুড়ে প্রায় ২/৪ ইঞ্চি লম্বা পেরেকের মতো কাঁটা থাকে। মূল কাণ্ড শক্ত ও ছোট লাঠির মতো, আর কাঁটা গুলো অত্যন্ত ধারালো ও শক্তিশালী। এটি একসময় গ্রামের লোকজনের কাছে দাঙ্গা-মারামারিতে ব্যবহৃত হতো। মনকাঁটা কাঁটা দিয়ে গ্রামবাংলায় ফোঁড়া গলানো হতো, এমনকি পেরেকের মতো কাঁটাও বহু কাজের জন্য ব্যবহৃত হত।
ঔষধি গুণাবলী হিসেবে ব্যবহার
চট্টগ্রামে নবজাতকের প্রথম চুল ফেলার সময়, মনকাঁটা বিশেষভাবে ব্যবহৃত হতো। দুর্বাঘাস ও কলাপাতায় মিশ্রিত করে নবজাতকের সামনে রাখা হতো মনকাঁটা। ঔষধি ব্যবহারের জন্য মনকাঁটা গাছের পাতা এবং ফল ব্যবহার করা হতো। এর ফল, যা “ঢেপারু” বা “মুয়ানা” নামে পরিচিত, একাধিক গ্রামাঞ্চলে শিশুদের বাঁশের খেলনার মধ্যে ভরে খেলতে দেখা যেত।
মনকাঁটা গাছের ঔষধি গুণ নিয়ে প্রচুর কাহিনি রয়েছে। উদাহরণ স্বরূপ, মণিপুরের চোথে উপজাতিরা এর তাজা পাতা দিয়ে চাটনি তৈরি করতেন, যা রক্ত বিশুদ্ধকরণে সহায়তা করে বলে বিশ্বাস করা হতো। এছাড়া, নাসিক অঞ্চলের উপজাতিরা নারকেল তেলের সাথে পাতা মিশিয়ে ফোলার নিরাময়ে ব্যবহার করতেন। তবে এই গাছের বিভিন্ন ঔষধি গুণের অনেকটাই বৈজ্ঞানিকভাবে যাচাই করা হয়নি।
ঐতিহ্যবাহী খাবার প্রস্তুতির পদ্ধতি
উদ্ভিদটির ফল সরাসরি খাওয়া যায় বা আচার হিসেবে সংরক্ষণ করা যায়। ভারতের সাতপুরা ও জওহর এলাকার উপজাতিরা এর ফল আচার হিসেবে ব্যবহার করেন। আচার তৈরির জন্য ফলটি প্রথমে ধুয়ে পরিষ্কার করা হয়, পরে লবণ ও অন্যান্য মশলা দিয়ে সংরক্ষণ করা হয়। এই আচার স্বাদে যেমন দারুণ, তেমনি এর পুষ্টিগুণও যথেষ্ট।
উদ্ভিদের ফল থেকে আচার তৈরির ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতি অনেকটাই সহজ। প্রথমে ফল সংগ্রহ করে রোদে শুকানো হয়। এরপর লবণ, হলুদ এবং মশলা মিশিয়ে তা সংরক্ষণ করা হয়। এভাবে তৈরি আচার বছরের পর বছর ভালো থাকে এবং এটি আগেকার গ্রামের মানুষের জন্য পুষ্টিকর খাবার হিসেবে বিবেচিত হতো।
একসময়ের বহুল ব্যবহৃত মনকাঁটা উদ্ভিদ এখন প্রায় বিলুপ্তির পথে। চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী দেয়াঙ পাহাড়ে একসময় প্রচুর মনকাঁটা গাছ ছিল, কিন্তু আজ সেই পাহাড়ে গাছটি খুঁজে পাওয়াই কঠিন। আমাদের গ্রামের ঔষধি ভাণ্ডার থেকে এই গুরুত্বপূর্ণ উদ্ভিদটি আজ বিলুপ্ত হয়ে গেলে এর ঐতিহ্য ও ঔষধি গুণাবলীও হারিয়ে যাবে।
মনকাঁটা উদ্ভিদের বিলুপ্তি ঠেকানোর জন্য এর ব্যাপক সংরক্ষণ প্রয়োজন। আমাদের আগামী প্রজন্মের জন্য এটি শুধু একটি উদ্ভিদ নয়, এটি বাংলার ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির একটি অমূল্য অংশ।
বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতিগুলোর সংরক্ষণে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে এবং গ্রামাঞ্চলের প্রাচীন ঔষধি ও খাদ্য সংস্কৃতিকে পুনরুদ্ধার করতে হবে।
মনকাঁটা গাছ শুধু আমাদের প্রাকৃতিক সম্পদ নয়, এটি বাংলার ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতির অংশ। এর ঔষধি ও খাদ্য উপাদানের গুরুত্ব আজও অপরিসীম। আমরা যদি এখনই এটি সংরক্ষণে মনোযোগ না দেই, তাহলে একসময় এটিও আমাদের স্মৃতি হয়ে থাকবে।
Leave a Reply