অনুসন্ধানী প্রতিবেদন পর্ব: ০১
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশকে বৃদ্ধাঙ্গুলী দেখিয়ে ও ঢাকা-১৯ আসনের সাংসদ মুহাম্মদ সাইফুল ইসলামের হুঁশিয়ারী উপেক্ষা করে সাভারের বিরুলিয়া এলাকা, রাজধানীর রূপনগর ও তুরাগ থানার বেরিবাঁধ অংশের মহাসড়কে চাঁদায় চলছে ব্যাটারিচালিত অটোরিক্সা। চাঁদা পরিশোধ করার পরেও বিরুলিয়া সেতু সংলগ্ন মায়ের দোয়া হোটেল এন্ড রেস্টুরেন্টের সামনে কয়েকজন অটোরিকশার চালকদের মারধর করার অভিযোগ উঠেছে দায়িত্বরত এক সার্জেন্টের বিরুদ্ধে।
১০ জুন (সোমবার) সকাল সাড়ে নয়টার দিকে বিরুলিয়া ট্রাফিক বক্সের টিআই জাবেদের সামনেই চালকদের মারধরের ঘটনা ঘটে বলে জানান পুলিশের মারধরের শিকার হওয়া সেই ভূক্তভোগী ও প্রত্যক্ষদর্শীরা।
ট্রাফিক পুলিশের মারধরের শিকার হওয়া একাধিক ভূক্তভোগী অভিযোগ করে দৈনিক আমার সময়-কে বলেন, আমরা প্রত্যেক মাসের চাঁদা মাসের শুরুতেই দিয়ে দিই। লাইনম্যান নিরব সে টাকা নিয়ে চলে যায় এবং চেয়ারম্যান ও পুলিশ সে টাকা নেয়। তারপরেও কেন আমাদের মারধর করবে। এসময়, এই নির্যাতনের সঠিক বিচারও চান তারা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অপর আরেক ভূক্তভোগী ট্রাফিক পুলিশের হামলায় আহত হয়ে সাভার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা শেষে তিনি দৈনিক আমার সময়-কে জানান, আমি একজন কর্মজীবি যুবক। বেকার না থেকে কর্ম করে খাই। চুরি-ছিনতাই করি না। সার্জেন্ট পিটিয়ে আমার ডান হাত আধা ভাঙ্গা করে দিয়েছে। সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত আমি আর গাড়ি চালাতে পারবো না। ইনকাম করতে পারবো না। আমার সংসার কে চালাবে এখন? দ্রব্যমূল্যের যে উর্ধ্ব গতি তা তো আপনারা জানেনই। আমি ন্যায় বিচার পেতে যতোদূর যাওয়া প্রয়োজন ততোদূর যাবো এবং আইনগতভাবে তিনি এ অন্যায়ের মোকাবেলা করবেন বলেও নিশ্চিত করেন আহত সেই ভূক্তভোগী।
সরেজমিনে বিরুলিয়া ব্রীজ এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, গোপন লেনদেন নিয়ে এক অটোচালকের সঙ্গে বাকবিতন্ডায় জড়িয়ে পড়েছেন ল্যাইনম্যান মোঃ হরফ মিয়া। কথা কাটাকাটির একপর্যায়ে মোঃ হরফ মিয়া চাঁদাবাজ নিরবকে ফোন দিলে অটোরিক্সাটি বিরুলিয়া ব্রীজ থেকে ধরে নিয়ে বিরুলিয়ার আকরান বাজার এলাকায় একজন প্রভাবশালীর বাড়ির সামনে আসতে বলেন।
দৈনিক আমার সময়-এর ক্যামেরায় এসব দৃশ্যধারণ করা হলে ভিডিও করার বিষয়টি টের পেয়ে ব্যাটারীচালিত অটোরিক্সা থেকে নেমে পড়েন মোঃ হরফ মিয়া।
অটোরিক্সাটি আটকের নির্দেশ কে দিয়েছে জানতে চাইলে হরফ মিয়া দৈনিক আমার সময়-কে বলেন, নিরবের সাথে কথা বলেছি। এসময়, অটোরিক্সার চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণে সরাসরি জড়িত একজন ইউপি চেয়ারম্যানের নামও উঠে আসে। লাইনম্যান হরফ মিয়া ও চাঁদার টাকা উত্তোলনের দায়িত্বে থাকা নিরবের কথাতেই এসব চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে আসে।
এদিকে, অটোরিক্সার চালক অভিযোগ করে দৈনিক আমার সময়-কে বলেন, এরা এরকমই করে। আমরা নিরীহ অটোরিকশার চালকরা জিম্মি আছি। চাঁদা দেয়ার পরেও ঝামেলা করে। সেই চেয়ারম্যান এতোটায় বেপরোয়া ও জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছেন যে, সাধারণ রিকসাওয়ালারা তার নাম বলার সময় বারবার আঁতকে উঠেন। অসহায় এই শ্রমজীবি অটোচালকরা সেই চেয়ারম্যানের নির্যাতনের কবল থেকে রক্ষা পেতে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নিকট অনুরোধ জানান।
১০ জুন সকালে ট্রাফিক পুলিশের মারধরের ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে মোঃ হরফ মিয়া বলেন, আমি একজনকে মারতে দেখেছি। তার ঘাড়ে পুলিশ মারতে গেছিলো। কিন্তু, মাথা সরানোর কারণে হাতে লেগেছে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সকালে বেশ কয়েকজন অটোচালককে ডিএমপির ট্রাফিক পুলিশের সার্জেন্ট সাভার এরিয়ায় এসে মারধর করে। এসময়, পুলিশের মারধরে একজন অটোচালকের পা ফেটে রক্ত বের হয় বলেও নিশ্চিত করেন উপস্থিত অটোচালকরা।
এদিকে আকরান বাজার মোড়ে প্রতিনিয়ত তীব্র যানজট লেগেই থাকে। এখানেও যানজটমুক্ত করতে লাইনম্যান রাখা হয়েছে। তবে, সেই লাইনম্যানও চাঁদা আদায় করেন এবং প্রতিদিন অটোচালকদের সাথে খারাপ আচরণ, অশ্লীল ভাষায় গালিগালাজসহ গায়ে হাত তোলার মতো অপরাধমূলক কর্মকান্ডের ভিডিওচিত্র আমাদের অনুসন্ধানী টিমের হাতে এসে পৌঁছেছে।
এসব ঘটনা ধামাচাপা দিতে ট্রাফিক বিভাগের কতিপয় অসাদু কর্মকর্তা ও সেই ইউপি চেয়ারম্যান দৌঁড়ঝাঁপ শুরু করেছেন বলে জানা গেছে। আহতদের হুমকি দিচ্ছেন বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। এছাড়াও, সেই প্রভাবশালী চেয়ারম্যানের গাড়ির ড্রাইভারসহ চাঁদাবাজির সাথে জড়িত সংশ্লিষ্টদের বেশ কয়েকটি কথোপকথনের কল রেকর্ড আমাদের হাতে এসে পৌঁছেছে। যা পর্যায়ক্রমে অনুসন্ধান শেষে ধারাবাহিক প্রতিবেদনের পরবর্তী পর্বগুলোতে প্রকাশিত হবে।
এদিকে, চাঁদা পরিশোধের পরও সার্জেন্টের হামলায় আহত এক নির্যাতিত ভূক্তভোগী সাভার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা শেষে সাভার মডেল থানায় গভীর রাত পর্যন্ত অপেক্ষা করলেও কোন অভিযোগপত্র নেয়া হয়নি বলেও অভিযোগ করেন সেই ভূক্তভোগী।
এসব অভিযোগের বিষয়ে মিরপুর ট্রাফিক জোনের বিরুলিয়া ট্রাফিক বক্সের টিআই জাবেদ দৈনিক আমার সময়-কে বলেন, শুনেছি- যানজট সৃষ্টি হয়েছিলো। যানজট ছাড়াতে গিয়ে গাড়ির পরিবর্তে চালকদের হাতে লাগে। আমি ঐ চালকদের আসতে বলেছিলাম। কেউ আসেনি। পরে শুনেছি- ওরা চেয়ারম্যানের লোক। চেয়ারম্যানই নাকি বিষয়টা মিট করেছেন বলেও নিশ্চিত করেন তিনি।
(চলবে)
Leave a Reply