উত্তরবঙ্গের প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠ প্রিয় কারমাইকেল কলেজ। নান্দনিক নির্মাণশৈলীতে দাঁড়িয়ে আছে কলেজের মূল ভবন। তিনশ একর ভ‚মির বিরাট আঙিনায় কলেজ ক্যাম্পাস। প্রবেশদ্বার থেকে রাস্তার দু পাশ জুড়ে নানারকম বিশাল বৃক্ষরাজির শীতল ছায়ায় কলেজ ক্যাম্পাস স্বাগত জানায়। কলেজের সাজানো প্রাকৃতিক ‘শরীর ও মন ভেজানো’ পরিবেশ শুধু শিক্ষার্থীদের নয় সৌন্দর্যপিপাসুদেরও আকর্ষিত করে।
১৯১৬ সালে রংপুরের ম্যাজিস্ট্রেট কালেক্টর জে.এন. গুপ্ত কলেজটি প্রতিষ্ঠা করেন। লর্ড ব্যারন কারমাইকেলের নামানুসারে এর নাম রাখা হয় কারমাইকেল কলেজ। প্রতিষ্ঠানটি সৃষ্টির সূচনালগ্ন থেকেই বৃহত্তর রংপুরের শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে ব্যাপক অবদান রেখে আসছে। এই কলেজ বর্তমানে বাংলাদেশ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত।
আশির দশকে ১৯৮৫-১৯৮৬ সেশনে অর্থনীতি সম্মানের ছাত্র ছিলাম। আবাস ছিল ক্যাম্পাসের ওসমানী ছাত্রাবাস। তিন বছরের অনার্স কোর্স এরশাদ ভ্যাকেশনের যাঁতাকলে পাঁচ এবং রাজনৈতিক সংগঠনের সংশ্লিষ্টতায় পড়াশোনার প্রতি উদাসীনতায় ছয় বছর স্থায়ী হয় আমার প্রিয় কারমাইকেল কলেজ জীবন। কলেজে অবস্থানের সময়ে বৈচিত্র্যময় বাংলার ষড়ঋতুর বৈশিষ্ট্য মানসপটে দেখেছি আর হৃদয় ভরে অনুভব করেছি। যা এখনো এ চিত্তে জানান দেয় সময় অসময়ে।
অনাকাক্সিক্ষত দীর্ঘ সময় অবস্থান করায় আবাসিক ছাত্র-খেলাধুলা-রাজনৈতিক ছাত্র সংগঠনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে সংশ্লিষ্ট ছিলাম। তাই নিজ বিভাগের পাশাপাশি স্নেহ-শ্রদ্ধার শিক্ষার্থী এবং শিক্ষাগুরুদের সাথে ওঠাবসা হতো নিয়মিত। রাজনৈতিক ছাত্র প্লাটফর্মে সংশ্লিষ্ট থাকলেও শিক্ষার্থীদের অধিকার নিয়ে সোচ্চার থাকতাম অবিরাম। সে সময় ছোটবড় বন্ধুত্বের সম্পর্কপূর্ণ বৃহত্তর সার্কেল গড়ে ওঠে। ফলে আজও রংপুর বিভাগের আট জেলায় কোথাও গেলেই দর্শন পাই হারানো সেই প্রিয় মুখগুলোর। কথায় কথায় মধুর সেই দিনের স্মৃতিতেও হারিয়ে যাই। কারমাইকেলের ফেলে আসা স্মৃতি থাকবে হৃদয়ে আজীবন অমলিন!
ত্রিশ বা চল্লিশ বছর আগে সামাজিক পরিস্থিতি বা পরিবেশ অনুক‚লে ছিল না। বৃহত্তর রংপুর অঞ্চলের মেয়েদের দূরে গিয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ কঠিন ছিল। আমাদের মা-খালা-ফুপু-চাচি-বোনদের একমাত্র উচ্চশিক্ষা লাভের ভরসাস্থল ছিল প্রিয় এই কারমাইকেল কলেজ। তাই এ অঞ্চলের মেয়েদের উচ্চশিক্ষা লাভের গেটওয়ে-ও বলা চলে কারমাইকেল কলেজকে।
আমাদের সবচেয়ে গর্বিত করে কারমাইকেলের এইচএসসি ব্যাচের শিক্ষার্থীরা। বৃহত্তর রংপুরের আট জেলার সেরা ছাত্রদের পছন্দের শিক্ষালয় এই ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠ। আর হবেই না বা কেন; সেসময় দেশজোড়া খ্যাতিসম্পন্ন শিক্ষকদের শিক্ষাদান ছিল এ শিক্ষা বন্দরে। যাদের গবেষণালব্ধ অনেক বই ছিল দেশের বিভিন্ন শিক্ষা বোর্ডের পাঠ্যপুস্তকে। সেই গুণী শিক্ষকদের পরম মমতায় শিক্ষাদানের কৌশলের কারণে যে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন দেখত বেশিরভাগ শিক্ষার্থীই তা অর্জনে সফলতা দেখিয়েছে। শিক্ষার্থীরা উচ্চশিক্ষা লাভ করে দেশ-বিদেশে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন অঙ্গনে সুনামের সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছে। যা দেখে কারমাইকেলিয়ান প্রত্যেকেই আমরা গর্ববোধ করি। ভবিষ্যৎ প্রজন্মও এই ধারাবাহিকতা এগিয়ে নিয়ে যাক, এই প্রত্যাশা করি। শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা জানাই শ্রদ্ধাভাজন শিক্ষকদের প্রতি। ধন্যবাদ কারমাইকেল কলেজ।
কারমাইকেল কলেজ প্রাক্তন ছাত্র সমিতি গঠনের কারিগর শ্রদ্ধেয় অগ্রজদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই আমাদের ফেলে আসা প্রিয় কলেজকে পুনরায় ধারণ করানোর জন্য। ১৯৮৬ সালে এ সমিতি প্রতিষ্ঠিত হয়। পথপরিক্রমায় এর বয়স এখন চল্লিশের কোঠায়! এত দীর্ঘ সময়েও সমিতির লক্ষ্য অর্জনে আমরা উল্লেখযোগ্য তেমন কিছুই করতে পারিনি। কমিটিতে যারা ছিলেন বা আছি এটা তাদের ব্যর্থতা! এটাও তো সত্য যে, সামাজিক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনে যারা কাজ করেন প্রত্যেকেই নিজেদের কর্মে ব্যস্ত থাকার পরই এসব জায়গায় সময় দেন। ফলে এসব সমিতির কার্যক্রম সবসময় উদ্দেশ্য মোতাবেক পরিচালিত করা সম্ভবপর হয় না। তাছাড়া বিভিন্ন কার্যক্রম সম্পন্ন করতে গেলে আর্থিক সহায়তার প্রয়োজন হয়।
যেকোনো প্রতিষ্ঠানের কর্মের ধারাবাহিকতা রাখার জন্য নিজস্ব অফিস প্রয়োজন। বর্তমান কমিটি চেষ্টা করে যাচ্ছে সবাইকে একত্রিত করার। ইতোমধ্যে সমিতির কোষাধ্যক্ষ এবং জিয়া অ্যাসোসিয়েট-এর কর্ণধার জিয়াউর রহমান জিয়ার ভালোবাসার প্রতিদান স্বরূপ এক কোটি টাকার অনুদান পেয়েছি। সেই সাথে আরো কয়েকজন সুহৃদ কারমাইকেলিয়ানের অনুদান মিলিয়ে সমিতির অফিস কেনা হয়েছে। এখন প্রয়োজন অফিস সাজানো। এছাড়া সার্বক্ষণিক দাপ্তরিক কাজে লোক নিয়োগ করা হলে অফিসমুখি হতে পারবে সদস্যরা। অংশগ্রহণ করতে পারবে সকল কার্যক্রমে। এ লক্ষ্য নিয়েই কাজ করে যাচ্ছে বর্তমান কমিটি।
সবশেষে সকল কারমাইকেলিয়ানের প্রতি আহŸান, আসুন সম্মিলিত সহযোগিতা এবং মতামত ও পরামর্শে কারমাইকেল কলেজ প্রাক্তন ছাত্র সমিতি প্লাটফর্মকে কার্যকর সংগঠনে পরিণত করি।
Leave a Reply