- বিধ্বস্ত ১২ হাজার ঘর, সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত ২ হাজার
- নামলো মহাবিপদ সংকেত
- আশ্রয়কেন্দ্র ছাড়ল ২ লাখ ৫০ হাজার মানুষ
ঘূর্ণিঝড় মোখা আঘাত হেনেছে কক্সবাজারে। দীর্ঘ ৯ ঘণ্টা পর কক্সবাজার উপকূল অতিক্রম করে মোখা, যার সর্বোচ্চ আঘাতের সময় ছিল দুপুরে। তবে, কক্সবাজারে এখনও কেউ নিহতের খবর পাওয়া না গেলেও, দীর্ঘ ৯ ঘণ্টার তাণ্ডবে ২ হাজার কাঁচা ঘরবাড়ি সম্পূর্ণ বিধ্বস্তসহ ১০ হাজারের বেশি ঘরবাড়ি আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আর প্রবল ঝড়ো বাতাসে উপড়ে গেছে কয়েক হাজার গাছপালা।
ঘূর্ণিঝড় মোখা তার গতিপথ পরিবর্তন করে মিয়ানমারের উপকূল হয়ে স্থলভাগে আঘাত হানলেও শেষ রক্ষা হয়নি দেশের একমাত্র প্রবালদ্বীপ সেন্টমার্টিনের। যেখানে এক নারী গাছ চাপায় আহত হলেও আর কোন হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। তবে পুরো দ্বীপটি তছনছ করে দিয়েছে ঘূর্ণিঝড় মোখা।
রোববার (১৪ মে) সন্ধ্যা ৬টায় এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মুহাম্মদ শাহীন ইমরান।
তিনি বলেন, ‘ঘূর্ণিঝড় মোখা কক্সবাজার অতিক্রম করেছে। প্রশাসনের প্রস্তুতি আর জনগণের সচেতনতা, রাজনৈতিক নেতা, জনপ্রতিনিধিদের অংশগ্রহণ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ সবার সহযোগিতায় ২ লাখ ৫০ হাজার মানুষকে আশ্রয় কেন্দ্রে আনতে সক্ষম হয়েছিলাম। উপকূলের মানুষজনকে আশ্রয় কেন্দ্রে আনার ফলে ঘূর্ণিঝড় মোখা আঘাত করলেও, কক্সবাজারে কোন হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।’
রোববার (১৪ মে) রাতে জেলা প্রশাসক মুহাম্মদ শাহীন ইমরান বলেন, এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্যে কক্সবাজারে ১০ হাজার কাঁচা ঘরবাড়ি আংশিক বিধ্বস্ত হয়েছে। আর ২ হাজার ঘরবাড়ি সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়েছে। তবে সেন্টমার্টিনে ক্ষতি সবচেয়ে বেশি হয়েছে। সেখানে গাছপালা ভেঙ্গে পড়েছে। কাঁচা ঘরবাড়ি সবই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এখন আবহাওয়া পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে দ্রুত সেন্টমার্টিনে দুর্যোগ পরবর্তী মানুষের সহায়তার কাজ করা হবে।
সেন্টমার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মুজিবুর রহমান বলেন, সকাল থেকে শুরু হওয়া ঝড়ো হওয়া দুপুর ১ টার পর থেকে ক্রমাগত তীব্র হতে থাকে। বিকাল ৪ টার পর থেকে বাতাসের তীব্রতা কমে বৃষ্টিপাতের মাত্রা বাড়তে থাকে। এই পুরো সময়ে দ্বীপের ১২ শতাধিক আধাপাকা টিন শেড ঘর, ছোট্ট মানের কটেজ বাতাসের বিধ্বস্ত হয়ে গেছে। দ্বীপের ৭৫ শতাংশ গাছ ভেঙ্গে ক্ষত-বিক্ষত হয়ে গেছে। সাগরের পানি স্বাভাবিক অবস্থার চেয়ে একটু বেশি হলেও কোথাও প্লাবিত হয়নি।
সেন্টমার্টিন ইউনিয়নের সদস্য (মেম্বার) খোরশেদ আলম বলেন, দ্বীপের পূর্ব পাশে অবস্থিত বাজারের অধিকাংশ দোকান বাতাসে উড়ে গেছে। গাছ চাপায় এক নারী আহত হলেও আর কেউ হতাহত হয়নি। চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে স্বেচ্ছাসেবকরা সড়কের ভেঙ্গে পড়া গাছ সরিয়ে চলাচল উপযোগি করার কাজ চলছে।
দুপুর ২ টায় সেন্টমার্টিন ইউনিয়নের কোনারপাড়ায় গাছ চাপায় আহত দ্বীপে চিকিৎসাধীন রয়েছেন বলে জানিয়েছেন টেকনাফ থানার ওসি মো. আবদুল হালিম। তিনি জানান, প্রয়োজনে তাকে টেকনাফ আনা হতে পারে।
সেন্টমার্টিনের বাসিন্দা ট্রলার মালিক সমিতির সাবেক নেতা আবু তালেব জানিয়েছেন, আগে থেকে আঘাতের যে তথ্য প্রচার হয়েছে তার মত আঘাত না হলেও দ্বীপকে তছনছ করে দিয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে দ্বীপের দক্ষিণ, পূর্ব অংশে। যেখানে ব্যাপক সংখ্যক গাছ ছাড়াও আধাপাকা, টিন শেড সকল ঘর ভেঙ্গে গেছে। উড়ে গেছে ছাউনী।
বৃষ্টির সাথে সাগরের ঢেউর তীব্রতা এখন রয়েছে বলে জানিয়েছেন, দ্বীপের ব্যবসায়ী নাহিদ হোসেন। তিনি জানান, দ্বীপের মানুষের যে ক্ষতি হয়েছে তা পুঁষিয়ে নিতে অনেক সময় লাগবে।
জেলা প্রশাসক মুহম্মদ শাহীন ইমরান বলেন, সেন্টমার্টিনের চেয়ারম্যান ও সেখান থেকে পাওয়া প্রাথমিক তথ্য মতে দ্বীপের ৭৫ শতাংশ গাছ ছাড়াও ১২ শতাধিক ঘর বিধ্বস্ত হয়েছে। এ পর্যন্ত কোন হতাহতের তথ্য পাওয়া যায়নি। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পর দ্বীপে গিয়ে ক্ষতির সার্বিক চিত্র বা পরিমাণ জানা যাবে। দ্বীপে আশ্রয় কেন্দ্রে থাকা মানুষকে আশ্রয় কেন্দ্রে অবস্থান নিতে বলা হয়েছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় আশ্রয় কেন্দ্র ত্যাগের অনুমতি দেয়া হবে। আশ্রয় কেন্দ্রে খাবার, বিশুদ্ধ পানি সরবরাহে সংশ্লিষ্টরা কাজ করছেন।
উপকূলজুড়ে তান্ডব
কক্সবাজার জেলার উপকূল জুড়ে ঘূর্ণিঝড় মোখা তান্ডব চালিয়েছে। এই তান্ডবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে সেন্টমার্টিন দ্বীপে। তবে আঘাতের কবলে পড়েছে টেকনাফের শাহপরীরদ্বীপ, সাবরাং, টেকনাফ পৌরসভা, সদর ইউনিয়ন, বাহারছড়া ইউনিয়ন, উখিয়ার জালিয়াপালং ইউনিয়নের ইনানী, পাটুয়ারটেক, সোনাপাড়া এলাকা। যেখানেও ব্যাপক সংখ্যক ঘর ও গাছ ভেঙ্গে গেছে।
টেকনাফ উপজেলা চেয়ারম্যান নুরুল আলম জানিয়েছেন, টেকনাফের শাহপরীরদ্বীপ, সাবরাং, টেকনাফ পৌরসভা, সদর ইউনিয়ন, বাহারছড়া ইউনিয়নের গাছের উপর তান্ডব চালিয়েছে মোখা। এসব এলাকার ৩০ শতাংশ গাছ ভেঙ্গে গেছে। এছাড়া বহু ঘর ভেঙ্গে গেছে।
এর সংখ্যা নির্ধারণে কাজ চলছে মন্তব্য করে নুরুল আলম জানান, সেন্টমার্টিন বাদ দিলে টেকনাফ উপজেলায় আরও কম হলেও এক হাজার ঘর ভেঙ্গে গেছে।
কক্সবাজারস্থ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী ড. তানজির সাইফ আহমেদ জানিয়েছেন, কক্সবাজারে ৫৯৫ কিলোমিটার বেড়িবাঁধের মধ্যে ৩২ কিলোমিটার অরক্ষিত ছিল আগে থেকেই। এই ৩২ কিলোমিটারের বাইরে কোন অংশে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে কিনা দেখা হচ্ছে।
তিনি জানান, মোখা যতটুকু আঘাত আনার কথা তা হয়নি। তার কারণ আঘাত আনার সময়টি ভাটা এবং পূর্ণিমা-অমাবস্যার মধ্যে সময়কাল। তার সাথে ঢেউর বিপরীত দিকে বাতাসের দিক হওয়া ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতা কমেছে।
কক্সবাজার আঞ্চলিক আবহাওয়া কার্যালয়ের সহকারি আবহাওয়াবিদ আব্দুর রহমান বলেন, ঘূর্ণিঝড় মোখা কক্সবাজার অতিক্রম করতে ৯ ঘণ্টা সময় নিয়েছে। যার আঘাত বেশি হয়েছে দুপুরের দিকে। সকাল ৯টা থেকে শুরু হয়ে অতিক্রম শেষ হয় সন্ধ্যা ৬টায়। এখন বৃষ্টিপাত ও ঝোড়ো বাতাস অব্যাহত থাকবে। রবিবার বিকাল ৩ টা পর্যন্ত ২৪ ঘন্টায় কক্সবাজারে ১৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রের্কড করা হয়েছে। এরপর বৃষ্টির তীব্রতা বেড়েছে।
আশ্রয়কেন্দ্রে ছাড়ল ২ লাখ ৫০ হাজার মানুষ। আজ সকালে
ঘূর্ণিঝড় কবলিত বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়াতে ছুটে গেলেন উখিয়া টেকনাফের সাবেক এমপি আবদুর রহমান বদি- তিনি এসময় ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িঘর গুলো ঘুরে ঘুরে দিখেন এবং সবাইকে নগত অর্থ সহ সার্বিক সহযোগিতার জন্যে সকলের পাশে থাকার আশ্বাস প্রধান করেন। এসময় উপস্থিত ছিলেন সাংবাদিক সহ রাজনৈতিক সামাজিক ব্যাক্তিবর্গ।
Leave a Reply