গ্রামীণ অবকাঠামো কোনো অঞ্চলের জীবনমান ও অর্থনৈতিক প্রবাহের প্রধান নিয়ামক। অথচ দেশের অনেক অঞ্চলে আজও এমন রাস্তা রয়েছে, যেখানে চলাচল করা যেন একপ্রকার দুঃসাহসিক অভিযানে নামার শামিল। কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার জিলাপীতলা বাজার থেকে গড়াই নদীর বালুরঘাট পর্যন্ত মাত্র ৭০০ মিটার সড়ক যেন সেই বাস্তবতার এক প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ অল্প দূরত্বের সড়কই হাজারো মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। ২০০৬ সালে পাকা করা সড়কটির কার্পেটিং উঠে এখন তাতে তৈরি হয়েছে অসংখ্য খানাখন্দ। শুকনো মৌসুমে ধুলাবালিতে দম বন্ধ হয়ে আসে, বর্ষায় জমে কাদাপানি। বছরজুড়েই সড়কটি যেন একটি চলমান দুর্ভোগ। অথচ প্রতিদিন এই সড়ক দিয়ে শত শত ভারী ট্রাক চলাচল করে। কারণ, এর শেষ মাথাতেই রয়েছে একটি সরকারি বালুর ঘাট, যার ইজারা থেকে প্রতিবছর সরকারের রাজস্ব আয় হয় প্রায় ২ কোটি টাকা। সরকার রাজস্ব নেয় ঠিকই, কিন্তু বিনিময়ে জনগণকে দেয় না প্রয়োজনীয় অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ। স্থানীয় কৃষক, শিক্ষক, দোকানদার, এমনকি সাধারণ গৃহবধূদের কথাতেই স্পষ্ট-এই রাস্তার কারণে শিক্ষার্থীদের স্কুলে যাওয়া ব্যাহত হচ্ছে, কৃষিপণ্য পরিবহন দুরূহ হয়ে পড়েছে, এমনকি বিয়ের মতো সামাজিক সম্পর্কও বিঘিœত হচ্ছে। সড়কটি এখন এতটাই বেহাল যে কেউ এটিকে পাকা না কাঁচা, বোঝার উপায় নেই। ভারী বালুবাহী ট্রাকগুলোর অবাধ চলাচলে রাস্তার দুই পাশে ক্যানালের মতো গর্ত সৃষ্টি হয়েছে, যাতে বর্ষাকালে জমে থাকে পানি, আর শুকনো মৌসুমে উড়ে ধুলাবালি। উপজেলা প্রকৌশলী নিজেই স্বীকার করছেন, এই ধরনের সড়কে ভারী যানবাহন চলা নিষিদ্ধ। অথচ তা নিয়মিতই চলছে। সড়কের দুরবস্থার দায়ভার তাই কেবল প্রকৃতির ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে দায়সারা বক্তব্য দিলে চলবে না। এখানে স্পষ্ট অবহেলা ও প্রশাসনিক ব্যর্থতা রয়েছে। সরকার যদি এই রাস্তাটি ব্যবহার করে রাজস্ব আয় করে, তবে তার ন্যূনতম দায়িত্ব হচ্ছে সেই পথের মান বজায় রাখা। এই সমস্যার একটি দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হতে পারে সিসি ঢালাইয়ের মাধ্যমে টেকসই সংস্কার। কিন্তু তার আগে দরকার প্রশাসনিক আন্তরিকতা, দ্রæত বরাদ্দ নিশ্চিত করা এবং ভারী যান চলাচলের ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ আরোপ। কেবল ‘উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে’ বললে জনগণের ক্ষোভ প্রশমিত হয় না। আসলে দেশের অবহেলিত গ্রামীণ সড়কগুলোর অধিকাংশই আজ এমন ‘রাজস্ব নেওয়া, রক্ষণাবেক্ষণ না করা’ নীতির বলি। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে স্থানীয় অর্থনীতি, ব্যাহত হচ্ছে শিক্ষার প্রসার এবং সামাজিক বন্ধনেও দেখা দিচ্ছে ভাঙন। একটি রাস্তা যে কতভাবে মানুষের জীবনে প্রভাব ফেলে, কুমারখালীর এই ছোট্ট ৭০০ মিটার সড়ক তার জ্বলন্ত উদাহরণ। রাষ্ট্রের উচিত-রাজস্বের চেয়ে মানুষের কষ্টকে অগ্রাধিকার দেওয়া। সরকার শুধু আয় করবে আর জনগণ কাদা ও ধুলোর পথ বয়ে রাজস্বের ভার বহন করবে-এই নীতির অবসান ঘটাতে হবে। কুষ্টিয়ার এই সড়ক যেন আরেকটি বিবরণ হয়ে না ওঠে রাষ্ট্রীয় অবহেলার দীর্ঘ তালিকায়।
Leave a Reply