দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, সরকারি রাজস্ব বৃদ্ধি এবং স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক রাজস্বব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট, রংপুর। রাজস্ব ফাঁকি প্রতিরোধ, ভ্যাট ও শুল্ক আদায় নিশ্চিতকরণ, অবৈধ পণ্য নিয়ন্ত্রণ এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে আইন মেনে ব্যবসা পরিচালনার পরিবেশ তৈরিতে নিয়মিত অভিযান ও তদারকি কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি।
সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের অর্থায়নে রাজস্বের গুরুত্ব অপরিসীম। সড়ক, সেতু, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ ও অবকাঠামোগত উন্নয়নসহ রাষ্ট্রের বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক কার্যক্রম পরিচালনায় রাজস্ব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এ বাস্তবতায় রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি এবং কর ফাঁকির প্রবণতা রোধে কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট, রংপুরের ধারাবাহিক কার্যক্রম বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে।
প্রতিষ্ঠানটি নিয়মিত বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শন, ভ্যাট নিবন্ধন যাচাই, হিসাবপত্র পরীক্ষা, রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ তদন্ত এবং আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করছে। পাশাপাশি অবৈধ তামাকজাত পণ্য, ব্যান্ডরোলবিহীন সিগারেট ও বিড়ি এবং শুল্ক-কর ফাঁকির মাধ্যমে বাজারজাত করা পণ্য নিয়ন্ত্রণেও অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।
সৈয়দপুরে আহমেদ প্লাইউড কারখানায় অভিযান
রাজস্ব ফাঁকি প্রতিরোধে কমিশনারেটের নিয়মিত কার্যক্রমের অংশ হিসেবে গত ৩ নভেম্বর নীলফামারীর সৈয়দপুর উপজেলার কামারপুকুর ধলাগাছ এলাকায় অবস্থিত আহমেদ প্লাইউড কারখানায় অভিযান পরিচালনা করে একটি অভিযানিক দল। প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে ভ্যাট ও ট্যাক্সসংক্রান্ত অনিয়মের অভিযোগ তদন্তের অংশ হিসেবে প্রয়োজনীয় নথিপত্র, কয়েকটি ল্যাপটপ ও কম্পিউটার জব্দ করা হয়।
এরপর ৫ নভেম্বর কারখানা কর্তৃপক্ষ সংবাদ সম্মেলনে জানায়, প্রয়োজনীয় হিসাবসংক্রান্ত কাগজপত্র ও কম্পিউটার জব্দ থাকায় শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধে জটিলতা তৈরি হয়েছে। পরে বকেয়া বেতনের দাবিতে শ্রমিকেরা দিনাজপুর-রংপুর মহাসড়ক অবরোধ করেন। প্রায় দুই ঘণ্টা পর পুলিশ ও স্থানীয়দের হস্তক্ষেপে অবরোধ প্রত্যাহার করা হয়।
কারখানা কর্তৃপক্ষের বক্তব্যের পাশাপাশি স্থানীয়দের পক্ষ থেকেও প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের প্রকৃত অবস্থা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রয়োজনীয় আইনানুগ পদক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ।
তবে রাজস্ব ফাঁকি বা অনিয়মের অভিযোগ তদন্তের ক্ষেত্রে কাস্টমসের আইনানুগ কার্যক্রমের পাশাপাশি শ্রমিকদের বেতন-ভাতা ও স্বাভাবিক কর্মপরিবেশ বজায় রাখার বিষয়টিও গুরুত্ব পাওয়া প্রয়োজন। তদন্তের স্বচ্ছতা ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে যথাযথ সমন্বয়ের মাধ্যমে রাজস্ব সুরক্ষার পাশাপাশি শ্রমিকদের স্বার্থও রক্ষা করা সম্ভব।
রাজস্ব আদায়ে বহুমুখী কার্যক্রম
কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট, রংপুরের কার্যক্রম শুধু অভিযান পরিচালনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ভ্যাট আইন বাস্তবায়ন, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন ও তদারকি, ভ্যাট রিটার্ন যাচাই, বকেয়া রাজস্ব আদায়, উৎপাদন ও বিপণনসংক্রান্ত হিসাব পরীক্ষা এবং রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ তদন্তের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছে প্রতিষ্ঠানটি।
এ ছাড়া ব্যবসায়ীদের ভ্যাটসংক্রান্ত সেবা প্রদান, অনলাইন রিটার্ন দাখিলে সহায়তা, ভ্যাট চালান যাচাই এবং করদাতাদের মধ্যে সচেতনতা তৈরিতেও কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এসব উদ্যোগের ফলে ব্যবসায়িক কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও নিয়মতান্ত্রিকতা প্রতিষ্ঠার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
অবৈধ তামাকজাত পণ্য নিয়ন্ত্রণে অভিযান
অবৈধ তামাকজাত পণ্যের উৎপাদন ও বিপণন বন্ধ এবং সরকারের প্রাপ্য রাজস্ব নিশ্চিত করতে রংপুর ভ্যাট বিভাগের অভিযান উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে।
গত ২৫ সেপ্টেম্বর কাউনিয়া উপজেলার মীরবাগ বাজার এলাকায় অভিযান চালিয়ে একটি পিকআপ থেকে ১ লাখ ৭৫ হাজার শলাকা বিড়ি জব্দ করে অভিযানিক দল। এ ছাড়া গত ৫ মে রংপুর নগরীর দেওডোবা এলাকায় বিভিন্ন সময়ে জব্দ করা প্রায় ৩৬ লাখ টাকা মূল্যের তামাক ও তামাকজাত পণ্য ধ্বংস করা হয়।
এ ধরনের অভিযান একদিকে যেমন রাজস্ব ফাঁকি প্রতিরোধে সহায়ক, অন্যদিকে তেমনি অবৈধ পণ্যের বাজারজাতকরণ নিয়ন্ত্রণ এবং বৈধ ব্যবসায়ীদের স্বার্থ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।এ বিষয়ে কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট, রংপুরের সহকারী কমিশনার (চলতি দায়িত্ব) মো. হাবিবুল ইসলাম বলেন,
রাজস্ব দিয়ে গড়ে উঠুক উন্নত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ।
একটি শক্তিশালী অর্থনীতি গড়ে তুলতে সরকারের রাজস্ব আয় বৃদ্ধি এবং কর প্রদানে নাগরিকদের দায়িত্বশীল অংশগ্রহণ অত্যন্ত জরুরি। শুধু সরকারের একার পক্ষে রাজস্ব ফাঁকি বন্ধ করা সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে ব্যবসায়ী, শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মালিক, আমদানিকারক, উৎপাদক ও সাধারণ জনগণের সম্মিলিত সহযোগিতা প্রয়োজন।
নতুন বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে প্রত্যেক নাগরিক ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের উচিত আইন মেনে যথাযথভাবে ভ্যাট, শুল্ক ও প্রযোজ্য কর পরিশোধ করা। রাজস্ব ফাঁকি না দিয়ে নিয়মিত রাজস্ব প্রদানের মাধ্যমে দেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় অংশীদার হওয়া সবার নৈতিক ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব।
কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট, রংপুরের চলমান অভিযান ও তদারকি কার্যক্রম আরও গতিশীল হলে সরকারি রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধি, অনিয়ম প্রতিরোধ এবং ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠায় ইতিবাচক অগ্রগতি সম্ভব। একই সঙ্গে আইন প্রয়োগে স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা ও জবাবদিহি বজায় রেখে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম অব্যাহত রাখার প্রত্যাশা সংশ্লিষ্ট সবার।
দেশের উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির স্বার্থে আসুন, সবাই নিয়মিত রাজস্ব প্রদান করি, রাজস্ব ফাঁকি প্রতিরোধে সহযোগিতা করি এবং একটি উন্নত, সমৃদ্ধ ও স্বনির্ভর বাংলাদেশ গঠনে কার্যকর ভূমিকা রাখি।
Leave a Reply