২০২৬ সালের এপ্রিল মাসজুড়ে রংপুর বিভাগের বিভিন্ন জেলায়, বিশেষ করে লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম ও রংপুর জেলায় কয়েক দফা কালবৈশাখী ঝড় ও ভয়াবহ শিলাবৃষ্টিতে ফসলি জমি ও ঘরবাড়ির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। আকস্মিক এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে হাজার হাজার কৃষক চরম ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
কৃষি বিভাগ ও স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শিলাবৃষ্টির আঘাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বোরো ধান, ভুট্টা, গম, তামাক ও বিভিন্ন শাকসবজির খেত। পাশাপাশি রংপুরের ঐতিহ্যবাহী হাঁড়িভাঙ্গা আম এবং লিচুর কচি ফল ঝরে পড়ায় ফল উৎপাদনেও বড় ধাক্কা লেগেছে। বিশেষ করে মরিচ, টমেটো, লাউ, করলা, বেগুন ও চিনাবাদামের খেতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
রংপুর আবহাওয়া অফিস সূত্রে জানা গেছে, শক্তিশালী বৃষ্টি বলয়ের প্রভাবে একটানা ভারী বৃষ্টিপাত, ঝড়ো হাওয়া ও বড় আকারের শিলাবৃষ্টি সংঘটিত হয়। এক পর্যায়ে ২৪ ঘণ্টায় প্রায় ১৩০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়, যা এ অঞ্চলের জন্য অস্বাভাবিক। এর ফলে তিস্তা-ব্রহ্মপুত্র নদীর চরাঞ্চলসহ বিস্তীর্ণ এলাকার ফসল পানিতে নুয়ে পড়ে ও নষ্ট হয়ে যায়।
মাঠপর্যায়ের চিত্রে দেখা গেছে, আগাম জাতের বোরো ধান কাটার মাত্র এক সপ্তাহ আগে শিলাবৃষ্টির আঘাতে ধানগাছ মাটিতে লুটিয়ে পড়ে কর্দমাক্ত হয়ে গেছে। একই সঙ্গে ভুট্টার গাছ ভেঙে পড়েছে এবং তামাকের পাতা ছিদ্র হয়ে উৎপাদন প্রায় অযোগ্য হয়ে পড়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানিয়েছে, এই পরিস্থিতিতে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
গঙ্গাচড়া উপজেলার মর্ণেয়া এলাকার কৃষক মেহেরুল ইসলাম বলেন, “আমার ৪ বিঘা জমির ধান প্রায় ৬০ শতাংশ নষ্ট হয়ে গেছে। ঋণ করে আবাদ করেছি, এখন কীভাবে দেনা শোধ করবো বুঝতে পারছি না।” একই ধরনের দুরবস্থা বিরাজ করছে চিলমারী ও কালীগঞ্জ উপজেলাতেও।
হাঁড়িভাঙ্গা আমের চাষি আমজাদ পাইকার জানান, “শিলাবৃষ্টিতে গাছের গুটি ঝরে গেছে প্রায় ২০ থেকে ৩০ শতাংশ। এতে কাঙ্ক্ষিত ফলন পাওয়া নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে।”
বদরগঞ্জ উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অফিস সূত্রে জানা গেছে, অন্তত ১২.৯ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতির মুখে পড়েছে।
এদিকে ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণে কাজ শুরু করেছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (ডিএই) রংপুর। সংস্থাটির অতিরিক্ত পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) সিরাজুল ইসলাম জানান, “মাঠকর্মীরা ইউনিয়ন পর্যায়ে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রস্তুত করছেন। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, কয়েক হাজার হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে কিছুটা পুনরুদ্ধার সম্ভব হলেও বড় ধরনের ক্ষতি ইতোমধ্যে হয়ে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য প্রণোদনা ও পুনর্বাসন সহায়তার বিষয়টি মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব আকারে পাঠানো হবে।”
তিনি আরও বলেন, “প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে চাপ তৈরি হতে পারে। তবে দ্রুত পদক্ষেপ নিলে ক্ষতির প্রভাব কিছুটা কমানো সম্ভব।”
স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রস্তুত করে সরকারি সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এ ধরনের আকস্মিক ঝড় ও শিলাবৃষ্টির ঘটনা বাড়ছে, যা দেশের কৃষি খাতের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এদিকে কৃষকদের দাবি, দ্রুত ক্ষতিপূরণ ও সহজ শর্তে কৃষিঋণ পুনঃতফসিলের ব্যবস্থা না করা হলে তারা ঘুরে দাঁড়াতে পারবেন না।
Leave a Reply