কেউ কেউ জন্মগতভাবে কিছু দাগ নিয়ে জন্মায়।
কেটে যাওয়া স্থানে কী ধরনের দাগ হবে সেটি কিছু বিষয়ের ওপর নির্ভরশীল। যেমন—কাটার ধরন, কেটে যাওয়ার স্থান, কী দিয়ে কেটে গেছে, চিকিৎসা সঠিক সময়ে নিয়েছে কি না, রোগীর বয়স, অন্য কোনো শারীরিক সমস্যা আছে কি না, যেমন ডায়াবেটিস, কেটে যাওয়া স্থান সেলাইয়ের সময় কী ধরনের সুচ বা সুতা ব্যবহার করা হয়েছে, কবে সেলাই কাটা হয়েছে, আক্রান্ত ব্যক্তির আগে থেকেই কেটে যাওয়া স্থানে বড় বা অবাঞ্ছিত দাগ সৃষ্টির প্রবণতা আছে কি না ইত্যাদি।
উপসর্গ
স্কারের কারণে সাধারণত কোনো উপসর্গ দেখা দেয় না। আক্রান্ত স্থানে হালকা ব্যথা ও চুলকানি হতে পারে।
অনেক সময় জয়েন্ট বা অস্থিসন্ধির স্থানে স্কার সৃষ্টি হলে সেখানে চামড়ার টান ধরতে পারে, যাকে আমরা কন্ট্রাকচার বলি। তখন তার চলাচলে অসুবিধা হয়। বারবার চুলকানোর ফলে চামড়া উঠে গিয়ে ক্ষত সৃষ্টি করতে পারে। চিকিৎসা না নিলে সেই ক্ষত থেকে পরে ত্বকের এক ধরনের ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে।
দাগ দূরীকরণের উপায়
চিকিৎসাবিজ্ঞানের উন্নতির ফলে আধুনিক প্লাস্টিক সার্জারির মাধ্যমে কাটা দাগ অনেকাংশেই দূর
করা সম্ভব। দাগ দূরীকরণে সার্জারির পাশাপাশি কিছু নন-সার্জিক্যাল টেকনিকও বর্তমানে ব্যবহূত হচ্ছে। অনেক সময় এ দুটো মিলিয়েও চিকিৎসা করা হয়ে থাকে।
ম্যাসাজ : খুব সহজেই আক্রান্ত স্থানে ম্যাসাজ করে স্কার তৈরির প্রবণতা কমানো যায়। বিশেষ করে আগুনে পুড়ে যাওয়ার ফলে যে স্কার তৈরি হয়, কিলয়েড বা হাইপারট্রফিক স্কারের ক্ষেত্রে ম্যাসাজ থেরাপি ভালো কাজে আসে।
সিলিকন জেল : বাজারে কমার্শিয়ালি ক্রিম বা অয়েন্টমেন্ট অথবা শিট হিসেবে পাওয়া যায়। এটি স্কারের মধ্যে হাইড্রেশন বাড়িয়ে দিয়ে একে আর বড় হতে দেয় না। সিলিকন জেলশিট প্রতিদিন ১২-২৪ ঘণ্টা দু-তিন মাস ব্যবহার করলে উপকার পাওয়া যায়।
প্রেসার বা কম্প্রেশন গার্মেন্টস : হাত, পায়ে বড় ধরনের স্কার হলে এটি ব্যবহার করা হয়। হাইপারট্রাফিক স্কার বা কিলয়েডের চিকিৎসায় পোড়া রোগীর স্কার ম্যানেজমেন্ট-এ বেশি ভালো কাজ করে।
স্টেরয়েড ইনজেকশন : নির্দিষ্ট ডোজে স্কারের ওপর প্রয়োগ করলে উপকার পাওয়া যায়। চুলকানির প্রবণতা কমায় এবং কিলয়েডের চিকিৎসায় বহুল ব্যবহূত হয়।
লেজার : বর্তমানে এটি খুবই জনপ্রিয়। বিভিন্ন ধরনের লেজার ব্যবহার করে চিকিৎসা করা হয়, তবে সবচেয়ে বেশি ব্যবহূত হয় CO2 লেজার। সাধারণত ছোট বা সরু স্কারের ক্ষেত্রে বেশি উপযোগী। তবে সতর্কতার সঙ্গে ব্যবহার করা উচিত। স্বীকৃত চিকিৎসক নন, ট্রেনিং নেই এ ধরনের মানুষের কাছ থেকে লেজার গ্রহণ থেকে বিরত থাকা সমীচীন। অযাচিত ও অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের ফলে স্কার না কমে উল্টো এতে চামড়া পুড়ে নতুন করে স্কার হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
অন্যান্য : এ ছাড়া রেডিয়েশন থেরাপি, মলিকিউলার থেরাপি, ক্রায়োথেরাপি, বটুলিনাম টক্সিন, ভিটামিন ‘ই’ , অনিয়ন এক্সট্রাক্ট, কেমিক্যাল পিলিং, ডার্মাব্রেশন, মাইক্রো নিডলিং প্রভৃতি অবস্থাভেদে ব্যবহূত হয়
সার্জিক্যাল ম্যানেজমেন্ট
দাগ দূর করার সার্জারিকে আমরা স্কার রিভিশন সার্জারি বলে থাকি। বিভিন্ন ধরনের সার্জিক্যাল টেকনিক রয়েছে। যাদের মধ্যে কিছু হলো- সার্জিক্যাল এক্সিশন এবং ক্লোজার, জেড প্লাস্টি ক্লোজার, স্কিন গ্রাফটিং, ফ্যাট গ্রাফটিং প্রভৃতি।
স্কার রিমুভাল কি পুরোপুরি সম্ভব?
আসলে কোনো চিকিৎসার মাধ্যমেই স্কার পুরোপুরি দূর করে ফেলা সম্ভব হয় না, তবে এটিকে এতটাই হালকা ও অস্পষ্ট করে ফেলা যায়, যাতে তা আর দৃষ্টিকটু না হয়। ভালো ফলের জন্য চিকিৎসা শুরু করা উচিত স্কার গঠনের প্রাথমিক পর্যায়ে। পাশাপাশি রোগীর বয়স, ত্বকের ধরন, দাগের ধরন ও অবস্থানও চিকিৎসার পরিকল্পনায় ভূমিকা রাখে।
প্লাস্টিক সার্জারির কল্যাণে আজ স্কার আর জীবনভর বয়ে বেড়ানো যন্ত্রণা নয়। অভিজ্ঞ সার্জনের হাতে সঠিক পদ্ধতিতে চিকিৎসা নিলে দাগের প্রভাব অনেকাংশেই কমিয়ে আনা সম্ভব। আত্মবিশ্বাস ফিরে পেতে এবং মানসিক প্রশান্তির জন্য স্কার রিমুভাল চিকিৎসা হতে পারে একটি কার্যকর ও নিরাপদ উপায়।
লেখক : বিশেষজ্ঞ প্লাস্টিক সার্জন
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল

















Leave a Reply