চট্টগ্রাম মহানগরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় পথশিশু ও কিশোরদের মধ্যে ড্রেড (গ্লু-জাতীয়) নেশার বিস্তার উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। নগরীর ইপিজেড মোড়, পতেঙ্গা, আগ্রাবাদ, বন্দর এলাকায়, দেওয়ানহাট, টাইগারপাস, অলংকার, একে খান, রেলওয়ে স্টেশন, কোতোয়ালি মোর, জামাল খান সহ একাধিক জনবহুল এলাকায় দিনদুপুরে প্রকাশ্যে নেশা গ্রহণের ঘটনা এখন উদ্বেগজনক মাত্রা ছুঁয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, শুধু দিনের বেলাই নয়, রাত নামলেই এসব নেশাগ্রস্ত কিশোরদের একটি অংশ ছিনতাই, চুরি ও পথচারীদের হয়রানির মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। এতে সাধারণ মানুষ, গার্মেন্টস শ্রমিক ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে আতঙ্ক বাড়ছে।
নগরীর বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় সরেজমিনে দেখা গেছে, ময়লা ডিপো, পরিত্যক্ত স্থাপনা, রেললাইন সংলগ্ন এলাকা এবং ব্যস্ত সড়কের পাশেই এসব নেশা কার্যক্রম প্রকাশ্যেই চলছে। অভিযোগ রয়েছে, পর্যাপ্ত নজরদারি ও নিয়মিত অভিযান না থাকায় পরিস্থিতি দিন দিন আরও জটিল হয়ে উঠছে।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় অভিযান চলমান থাকলেও সমস্যার স্থায়ী সমাধানে বহুমুখী ও সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি। শুধু বিচ্ছিন্ন অভিযান নয়, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও সামাজিক হস্তক্ষেপ ছাড়া এ সংকট নিরসন কঠিন।
তবে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর কার্যক্রমের গতি নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। বিশেষ করে পথশিশুদের পুনর্বাসন, সুরক্ষা ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিতে দায়িত্বপ্রাপ্ত সমাজসেবা অধিদপ্তরের দৃশ্যমান ও কার্যকর ভূমিকা নগরবাসীর চোখে তেমনভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে সমস্যার মূল কারণগুলো অমীমাংসিত থেকে যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দারিদ্র্য, পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা, শিক্ষা থেকে ঝরে পড়া এবং সহজলভ্য নেশাজাতীয় দ্রব্য, এসব কারণেই পথশিশুরা দ্রুত ঝুঁকিপূর্ণ জীবনের দিকে ধাবিত হচ্ছে। এ অবস্থায় শুধুমাত্র আইন প্রয়োগের মাধ্যমে স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়, প্রয়োজন সামাজিক, মনস্তাত্ত্বিক ও পুনর্বাসনভিত্তিক কার্যকর উদ্যোগ।
আইন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নেশাজাতীয় দ্রব্যের অপব্যবহার ও সরবরাহ রোধে বিদ্যমান আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করা জরুরি। পাশাপাশি শিশু সুরক্ষা আইন ও কিশোর অপরাধ প্রতিরোধ সংক্রান্ত বিধান বাস্তবায়নের মাধ্যমে এ সমস্যার গভীরে পৌঁছানো সম্ভব।
প্রস্তাবিত করণীয়ঃ
ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় পুলিশি নজরদারি বৃদ্ধি ও নিয়মিত অভিযান জোরদার,
গ্লু ও অনুরূপ নেশাজাতীয় দ্রব্যের অবাধ সরবরাহ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ,
পথশিশুদের জন্য জরুরি আশ্রয়কেন্দ্র ও পুনর্বাসন কর্মসূচি চালু,
কারিগরি শিক্ষা ও বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি,
ভ্রাম্যমাণ শিক্ষা ও সচেতনতা কার্যক্রম জোরদার,
সংশ্লিষ্ট সকল দপ্তরের সমন্বয়ে কার্যকর টাস্কফোর্স গঠন।
সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, জেলা প্রশাসন, সিটি কর্পোরেশন, পুলিশ প্রশাসন, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ও সমাজসেবা অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট সকল সংস্থার সমন্বিত ও জবাবদিহিমূলক উদ্যোগ ছাড়া এ সমস্যার কার্যকর সমাধান সম্ভব নয়।
সচেতন মহল সতর্ক করে বলছে, এখনই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে এই পথশিশুদের একটি অংশ ভবিষ্যতে বড় অপরাধচক্রের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে। তাই আইন প্রয়োগের পাশাপাশি মানবিক, পুনর্বাসনমূলক ও টেকসই সামাজিক উদ্যোগ বাস্তবায়নের মাধ্যমে এই সংকট মোকাবিলা করা এখন সময়ের অপরিহার্য দাবি।
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর কার্যক্রমের অগ্রগতি, বিশেষ করে সমাজসেবা অধিদপ্তরের ভূমিকা ও পরিকল্পনা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে তাদের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য তুলে ধরার প্রত্যাশা সংশ্লিষ্ট সবার।
Leave a Reply