ছড়া-কবিতা-গান নিয়ে যার শিল্প-সাম্রাজ্য, তিনি জগলুল হায়দার। কথা বলতে বলতে, পথ চলতে চলতে তিনি অনায়াসেই একটি লেখা তৈরি করতে পারেন। তার চেয়ে বড় কথা, তিনি যা-তা লিখে পাঠককে বিরক্ত করেন না; বরং মার্জিত, মেদহীন, প্রাণবন্ত, স্মার্ট ভাষাশৈলীর কারিকুরিতে দারুণ সব চমক থাকে তার ছড়া-কবিতায়। তিনি বাংলা ভাষায় উত্তরাধুনিক ছড়ার ধারা প্রবর্তন করেন।
ছড়া লিখে ব্যাপক পাঠকপ্রিয়তার পাশাপাশি তিনি বিশিষ্ট সাহিত্য ব্যক্তিত্বের প্রশংসায় ধন্য হয়েছেন। নিখিল ভারত শিশুসাহিত্য পরিষদের সর্বভারতীয় সভাপতি বিশিষ্ট ছড়াকার ও গবেষক আনসার উল হক তাকে কিংবদন্তি ছড়াকার সুকুমার রায়ের সঙ্গে তুলনাপূর্বক ছড়াসম্রাট হিসেবে অভিহিত করেন। প্রখ্যাত ছড়াকার সুকুমার বড়ুয়া তার এক লেখায় জগলুল হায়দারের ছড়াসম্রাট উপাধির বিষয় উল্লেখ করে ব্যাপক তারিফ করেন।
এ ছাড়াও আধুনিক বাংলা ভাষার দুই প্রধান কবি শামসুর রাহমান ও আল মাহমুদ তাদের লেখায় জগলুল হায়দারের ছড়ার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। কিংবদন্তি ছড়াকার ও সাংবাদিক ফয়েজ আহ্মদ জগলুল হায়দারকে তার চাইতেও ভালো ছড়া লিখেন বলে জানান। আর কবি আসাদ চৌধুরীসহ অনেকেই তাকে ছড়ার সিংহ পুরুষ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।
একুশ শতকের প্রথম দুই দশক দেশের মূলধারার দৈনিকে তার ছড়াই সর্বাধিক ছাপা হয়েছে। সেই সময় লিখেছেন অজস্র ছড়া। ছড়া-কবিতাসহ সব মিলিয়ে তার বই প্রায় ৬০টি। এখনও তিনি সমান তালে লিখে যাচ্ছেন। ফেসবুকে তার লেখা পড়ে প্রতিক্রিয়া জানান পাঠক। তিনি সমসাময়িক ও বস্তুনিষ্ঠ বিষয়ে বাক্য গঠনে সিদ্ধহস্ত। বুলেটের মতো বুকে বিঁধে তার পঙ্ক্তি। তিনি শব্দ সাজালে, সেগুলো আর সাধারণ শব্দ থাকে না; হয়ে যায় নান্দনিক স্লোগান-কাব্য। মিছিলে সঙ্গী হয় তার কথা। রাজপথে নেমে আওয়াজ তোলে তার বাণী। মূলত জগলুল হায়দার ক্ষমতার সমুখে এক সুতীব্র স্পর্ধা।
নব্বই দশকের আন্দোলন থেকে শুরু করে ২০২৪-এর ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান অবধি সরব তিনি। শহিদ আবু সাঈদকে নিয়ে লেখা তার একটি ছড়া ফেসবুক, টিকটক ও ইন্সটাগ্রামে ঝড় তোলে। টিকটকে ছড়াটির ভিউ দাঁড়ায় কয়েক মিলিয়ন। লেখালেখির মাধ্যমে দেশ-জাতির সমস্যা তুলে ধরেন আবার সমাধানও দেখিয়ে দেন তিনি।
আগেই বলেছি, ছড়া-কবিতার এই মানুষটিকে নিয়ে বিশিষ্টজনেরা অনেক লিখেছেন। জগলুল হায়দার ছড়া ও কবিতার মতো নিরবচ্ছিন্নভাবে গান রচনা করেন। বাংলা গানেও নিজস্ব উত্তরাধুনিক ধারা প্রবর্তন করেছেন। তিনি রচনা করেন সমসাময়িক টানাপোড়ন নিয়ে গান। দেশ ও জাতির জন্য তিনি সদা জাগ্রত। তার কথায়, সুরে এক অন্য চেতনা কাজ করে— যা একজন শ্রোতা কিংবা পাঠককে আকৃষ্ট করে। তার সুরে নিজস্ব ঘরানার সন্ধান মেলে। তিনি সহজ-সরল ভাষায় গান রচনার পাশাপাশি সুরেও সারল্য বিস্তার করেন। তাতেই তার গান যে কোনো শিল্পীর কণ্ঠেই যেমন মানায় তেমনি তা সব শ্রেণির গানপ্রেমী শ্রোতাদের আকর্ষণ করে।
জগলুল হায়দার ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশ বেতার ও ২০০২ সালে বাংলাদেশ টেলিভিশনে গীতিকার হিসেবে তালিকাভুক্ত হন। এ পর্যন্ত দেশের অনেক নামকরা শিল্পী তার গান গেয়েছেন। এর মধ্যে মনির খানের ‘লক্ষ টাকায় খাট পাওয়া যায়’ বেশ জনপ্রিয়তা পায়। খ্যাতিমানদের মধ্যে তার গান আরো গেয়েছেন ফজলুর রহমান বাবু এবং আগুন।
২০০৮ সালের মাঝামাঝি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটমন্ডলে ম্যাজিক লণ্ঠন কবিতার আড্ডায় কবি হিসেবে আমার প্রথম যাওয়া হয়। সেখানে জগলুল হায়দারের সাথে পরিচয়। যদিও তার লেখা আগেই বহুবার বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় পড়েছি। ফলে কবিতার পাঠক হিসেবে তিনি আসলে আগে থেকেই চেনা। পরে জানতে পারলাম জগলুল হায়দারও ম্যাজিক লণ্ঠন সম্পাদক। প্রায় প্রতি সপ্তাহের শুক্রবার দেখা হতো তার সাথে। এছাড়াও মাঝে মাঝে অন্য দিবসে আমরা মিলে যেতাম আড্ডায়-কবিতায়-গানে। আমারও যেহেতু গান নিয়ে ভাবনা তাই তার সাথে বেশি মিলত। গান শুনতাম, গান শোনাতাম।
এভাবে চলতে চলতে ২০১৭ সালে জগলুল হায়দারের কথা ও সুরে তখনকার সমসাময়িক বিষয় নিয়ে ‘যে মানুষ মুক্ত মানুষ’ শিরোনামে একটি গান গাই। গানটি সুরাঞ্জলি ইউটিউব চ্যানেলে অবমুক্ত করা হয়। তারপর আবার সাত বছর কেটে যায়। ২০২৪ এর শুরুর দিকে গান নিয়ে আমরা আবার হাজির হই। জি-সিরিজ থেকে রিলিজ হয় জগলুল হায়দারের কথা ও সুরে, আমার কণ্ঠে ‘কাস্টমারই বস’ শিরোনামের একটি বয়কটের গান। এরই ধারাবাহিকতায় আরও বেশ কয়েকটি গান বিভিন্ন প্লাটফর্মে প্রকাশিত হয়। ‘হিট অ্যালার্ট’, ‘বাঁকা শাওয়ালেরই চান’ তার মধ্যে অন্যতম। গানগুলো জগলুল হায়দারের কথা ও সুরে, আমার কণ্ঠে মিউজিক ভিডিও আকারে প্রকাশিত হয়েছে। এ বছর জুন মাসে জগলুল হায়দার প্রতিষ্ঠা করেন ‘হায়দার টিউন’। একে বাংলা গানের এক অন্যতম প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার জন্য তিনি নিরলস শ্রম দিয়ে যাচ্ছেন। হায়দার টিউন থেকে ইতিমধ্যে ৯টি গান প্রকাশিত হয়েছে। সব গানের কথা ও সুর তার। গানগুলো গেয়েছেন ফজলুর রহমান বাবু, আগুন, গামছা পলাশ, মাটির মামিন, ফকির মিলন, ওয়াসিম পাগলা, শাইলু শাহ, কানিজ ফাতেমা সূচী ও জোবায়েদ সুমন।
প্রতি সপ্তাহে নতুন গান দিয়ে হায়দার টিউনের মাধ্যমে তিনি সজাগ রয়েছেন। ধীরে ধীরে তার গানের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন শ্রোতারা। আর তার গানে আস্বাদন করছেন এক অন্যরকম অনুভূতি। পরিশেষে বলি, অন্যায় যেখানে, কাজী নজরুল ইসলামের মতো জগলুল হায়দারও সেখানে। যেমন তিনি লিখেন—
‘তুই দিসনে ঝাড়ি নিসনে পাঙ্গা/ নিসনে অতো পার্ট/ আমি দুরন্ত মেঘ রুদ্র আবেগ/ বোতাম খোলা শার্ট’।
লেখক : কবি, কণ্ঠশিল্পী ও সংগীত পরিচালক
Leave a Reply