গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার কাওরাইদ ইউনিয়নের যুগীরছিট গ্রামে হতদরিদ্র শারীরিক প্রতিবন্ধী পরিবারটির বসবাস। এই পরিবারের পিছনে রয়েছে একটা করুন কাহিনি।পরিবারের মধ্যে ছয়জনই শারীরিক প্রতিবন্ধী।
মায়ের কোলে ছিলেন ছোট্ট সুরুজ, হঠাৎ পা পিছলে পড়ে যান মা। আছঁড়ে পড়ে কোলের শিশুটিও। ঘটনার দিন রাতেই ছোট্ট সুরুজের গায়ে তীব্র জ্বর আসে। কয়েকদিন ভুগে প্রথমে বাঁ পায়ের চলনশক্তি নষ্ট হয়। ধীরে ধীরে দুটি পা অকেজো হয়ে যায়।শারীরিক প্রতিবন্ধকতা নিয়ে বেড়ে ওঠা সুরুজ আলীর বয়স এখন ৬২। তার এক ছেলে ও দুই মেয়ে। তারাও জন্ম থেকেই শারীরিক প্রতিবন্ধী। এমনকি ছেলের দুই সন্তানের কেউই সুস্থসবলভাবে জন্ম নেয়নি।
সুরুজ আলীর মা রোমেলা খাতুনের সেই পড়ে যাওয়ার ঘটনা থেকে পরিবারে প্রতিবন্ধীত্বের অভিশাপ শুরু হয়েছে বলে মনে করেন তারা।
৮১ বছর বয়সী সুরুজ আলীর মা রোমেলা খাতুন বলেন, জন্মের কিছুদিন পর ছেলেকে নিয়ে বেড়াতে যাচ্ছিলাম। পথে সে কোল থেকে পড়ে যায়। রাতে ছেলের গায়ে জ্বর চলে আসে। ওই জ্বরের পর দুই পা অচল হয়ে যায়। ডাক্তার-কবিরাজ দেখিয়েও সুস্থ করে তুলতে পারিনি।
সুরুজ মিয়া বলেন, দুর্ঘটনায় মায়ের কোল থেকে পড়ে গিয়ে এ অবস্থা হয়েছে । আমার অন্য ভাই-বোনেরা ভালো। কেবল আমিই এমন অবস্থার শিকার। দশজনের কাছ থেকে চেয়ে খেতে হয়। ৯০ দিন পর পর চারজন প্রতিবন্ধী সদস্য ১০ হাজার টাকা ভাতা পাই।
সুরুজ মিয়ার ছেলে সেলিম মিয়াও (৩৫) শারীরিক প্রতিবন্ধীত্বের শিকার। তিনি বলেন, আমাদের পরিবারে ছয়জন প্রতিবন্ধী। একবেলা খেতে পেলে আরেক বেলা জোটে না। এভাবেই চলছে।সেলিমের বোন পারভীন (৩০) বলেন, পায়ের সমস্যায় শারীরিক প্রতিবন্ধীত্ব নিয়ে কষ্ট করে জীবিকা নির্বাহ করতে হচ্ছে। প্রাথমিক বিদ্যালয় পাস করতেই বিয়ে হয়ে যায়। সবকিছু ঠিকঠাক, কেবল পা দু,টাই অচল।
সুরুজ মিয়ার আরেক মেয়ে জেসমিনও (২৪) অচলাবস্থার শিকার। তার কথায়, একবেলা খেলে দুই বেলা খেতে সমস্যা হয়। তিন মাস পর পর আড়াই হাজার টাকা প্রতিবন্ধী ভাতা পাচ্ছি। এ পর্যন্ত দুইবার পেয়েছি।
প্রতিবেশী জসীম উদ্দিন বলেন, ওরা হাঁটতে পারে না। পরিবার প্রধান বয়স্ক মানুষটিও প্রতিবন্ধী। খুব কষ্ট করে ছেলে-মেয়েরা বেড়ে উঠেছে। এখন কষ্ট করেই জীবিকা নির্বাহ করছে।
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কার্ডিওলজি বিভাগের আইএমও ডা. মো: মামুনুর রহমান জানান, এটি বংশ পরষ্পরায় জিনগত সমস্যা হয়ে থাকতে পারে। সুরুজ মিয়া ছোট সময় তার মায়ের কোল থেকে পড়ে যাওয়ার বিষয়টি একটি ঘটনা। তবে জিনগত সমস্যার কারণেই এরকম হয়ে থাকে।
কাওরাইদ ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মমিনুল কাদের বলেন, পরিষদের পক্ষ থেকে এ বছর তাদের প্রতিবন্ধী ভাতার ব্যবস্থা করা হয়েছে। আগে তারা ‘সুবর্ণা` কার্ডে ভাতা পেত। সেই ভাতা অবশ্য অনেক কম।
শ্রীপুর উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মনজুরুল ইসলাম জানান, সমাজসেবা অধিদপ্তরের মাধ্যমে তাদের প্রতিবন্ধী ভাতা প্রদান করা হচ্ছে। প্রয়োজনে আরও সুযোগ সুবিধার ব্যবস্থা করা হবে।
Leave a Reply