ঢাকার ফুটপাতের গল্প বহুদিন ধরেই এক অদ্ভুত দ্বন্দ্বের গল্প। একদিকে ফুটপাত পথচারীর, অন্যদিকে সেই ফুটপাতই লাখো মানুষের জীবিকার আশ্রয়। ফলে ফুটপাত দখলমুক্ত করতে গেলেই জীবিকার প্রশ্ন, আর জীবিকার নামে ফুটপাত দখল চলতে থাকলে নাগরিক অধিকারের প্রশ্ন সামনে আসে। এই দুই বাস্তবতার মাঝখানে দাঁড়িয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের নতুন উদ্যোগটি তাই কেবল হকার উচ্ছেদের খবর নয়, বরং একটি বড় নগর ব্যবস্থাপনার পরীক্ষাও।
ডিএসসিসি প্রশাসক মো. আবদুস সালাম যে অবস্থান নিয়েছেন, তার মূল কথা স্পষ্ট, মূল সড়কে হকার নয়; পথচারীর জন্য ফুটপাত, আর হকারের জন্য শৃঙ্খলিত ব্যবসার জায়গা।
নগর ভবনের অডিটোরিয়ামে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় তিনি জানিয়েছেন, ঢাকার মূল সড়কে কোনোভাবেই হকার বসতে দেওয়া হবে না। তবে প্রশস্ত ফুটপাত রয়েছে এমন সড়কে পথচারীদের চলাচলের জন্য প্রয়োজনীয় জায়গা রেখে নির্দিষ্টসংখ্যক নিবন্ধিত হকারকে ব্যবসার সুযোগ দেওয়া হবে। অন্যদের জন্য চালু করা হবে হলিডে মার্কেট ও নাইট মার্কেট।
উচ্ছেদ নয়, ব্যবস্থাপনার নতুন ভাষা
ঢাকার ইতিহাসে হকার উচ্ছেদ নতুন কোনো ঘটনা নয়। বহুবার অভিযান হয়েছে, ফুটপাত খালি হয়েছে, আবার কয়েক দিন বা কয়েক সপ্তাহ পর একই জায়গায় ফিরেছে দোকান, ঠেলাগাড়ি, ভ্যান, অস্থায়ী পসরা। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, উচ্ছেদ কি সমস্যার সমাধান, নাকি সমস্যাকে কিছুদিনের জন্য অন্য জায়গায় সরিয়ে দেওয়া?
এই জায়গাতেই এবারের সিদ্ধান্তের গুরুত্ব।
একজন মানুষকে যদি শুধু বলা হয়, ‘এখানে বসতে পারবেন না’, কিন্তু তার জীবিকার বিকল্প পথ দেখানো না হয়, তাহলে প্রশাসনিক অভিযান সাময়িক ফল দিতে পারে, স্থায়ী সমাধান দিতে পারে না। নদীর মুখ বন্ধ করে দিলে পানি যেমন অন্য পথ খুঁজে নেয়, তেমনি জীবিকার প্রয়োজনও তার পথ খুঁজে নেয়।
ডিএসসিসির প্রস্তাবিত হলিডে ও নাইট মার্কেট সেই বাস্তবতাকে স্বীকার করে একটি নিয়ন্ত্রিত বিকল্প তৈরি করতে পারে।
ফুটপাত কার, এই প্রশ্নের উত্তর জরুরি
ফুটপাতের সবচেয়ে বড় মালিক কোনো দোকানদার, হকার কিংবা পথচারী এককভাবে নন। এটি নাগরিক অবকাঠামো। একজন কর্মজীবী মানুষ, একজন শিশু, একজন বৃদ্ধ, একজন প্রতিবন্ধী কিংবা একজন নারী নিরাপদে হাঁটবেন, এটাই ফুটপাতের প্রথম উদ্দেশ্য।
নতুন ব্যবস্থায় অন্তত ১.৫ মিটার জায়গা পথচারীদের জন্য খালি রাখার বিধান তাই বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। কারণ একটি শহরের সভ্যতা শুধু উঁচু ভবনের উচ্চতায় মাপা যায় না; মাপা যায় একজন সাধারণ মানুষ কতটা নিরাপদে রাস্তা পার হতে পারেন, কতটা স্বচ্ছন্দে ফুটপাতে হাঁটতে পারেন, সেটিতেও।
আর স্থান বরাদ্দের ক্ষেত্রে নারী ও প্রতিবন্ধী হকারদের জন্য ৩০ শতাংশ জায়গা সংরক্ষণের পরিকল্পনা সামাজিক অন্তর্ভুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হতে পারে।
নিবন্ধন মানে পরিচয়, পরিচয় মানে জবাবদিহি
নীতিমালায় এককালীন নিবন্ধন ফি ৫ হাজার টাকা, বার্ষিক নবায়ন ফি ২ হাজার ৫০০ টাকা এবং স্থান ব্যবহার ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য মাসিক ৩ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
নিবন্ধিত হকারকে ব্যবসার স্থান ও সময় উল্লেখ করে বারকোড বা কিউআর কোডযুক্ত ডিজিটাল পরিচয়পত্র দেওয়ার পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে।
এখানে প্রযুক্তির ব্যবহারটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এতদিন নগর ব্যবস্থাপনায় বড় সমস্যা ছিল, কে বৈধ হকার, কে অবৈধ, কে কোথায় বসবেন, কতক্ষণ বসবেন, কার অনুমতি আছে, কার নেই, এসব প্রশ্নের স্পষ্ট ডিজিটাল রেকর্ড না থাকা।
একটি কিউআর কোড যদি একজন হকারের পরিচয়, নির্ধারিত স্থান ও সময়ের সঙ্গে যুক্ত থাকে, তাহলে হকার ব্যবস্থাপনা কাগজের খাতা থেকে তথ্যভিত্তিক নগর ব্যবস্থাপনার দিকে এগোতে পারে।
হলিডে মার্কেট হতে পারে নতুন শহুরে অর্থনীতির জানালা
হলিডে মার্কেটের ধারণাটি শুধু হকার বসানোর জায়গা হিসেবে দেখলে এর সম্ভাবনা ছোট করে দেখা হবে।
সঠিক পরিকল্পনা হলে এটি হতে পারে স্থানীয় পণ্য, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, হস্তশিল্প, পোশাক, খাবার, কৃষিপণ্য এবং ক্ষুদ্র ব্যবসার একটি উন্মুক্ত বাজার।
সপ্তাহের কর্মব্যস্ত দিনগুলোতে রাস্তা চলাচলের জন্য উন্মুক্ত থাকবে, আর ছুটির দিনে নির্দিষ্ট এলাকায় নিয়ন্ত্রিতভাবে বাজার বসবে। এতে নাগরিক বিনোদন, ক্ষুদ্র ব্যবসা ও নগর অর্থনীতি একসঙ্গে যুক্ত হতে পারে।
অর্থাৎ, ফুটপাতের অনিয়ন্ত্রিত পসরা যদি পরিকল্পিত মার্কেটে যায়, তাহলে একই মানুষটি ‘অবৈধ দখলদার’ পরিচয় থেকে বেরিয়ে ‘নিবন্ধিত ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা’ পরিচয় পেতে পারেন।
এটি শুধু শব্দের পরিবর্তন নয়; এটি রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্কের পরিবর্তন।
নাইট মার্কেট ঢাকার রাতকেও অর্থনীতির অংশ করতে পারে
বাণিজ্যিক এলাকায় সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত নাইট মার্কেট পরিচালনার পরিকল্পনাও সময়োপযোগী।
বিশ্বের বিভিন্ন শহরে রাতের অর্থনীতি কর্মসংস্থান ও ক্ষুদ্র ব্যবসার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ঢাকায়ও যদি নির্দিষ্ট এলাকায় নিরাপত্তা, আলো, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ ও ডিজিটাল নিবন্ধনের মাধ্যমে নাইট মার্কেট চালু করা যায়, তাহলে এটি শুধু হকারদের বিকল্প কর্মসংস্থান নয়, নগরের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের নতুন স্তর তৈরি করতে পারে।
তবে এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে, নাইট মার্কেট যেন নতুন যানজটের মার্কেট না হয়ে যায়।
যেখানে মার্কেট হবে, সেখানে যানবাহন, পথচারী, অগ্নিনিরাপত্তা, বর্জ্য, বিদ্যুৎ, নিরাপত্তা এবং জরুরি যান চলাচলের বিষয় আগে থেকেই পরিকল্পনায় রাখতে হবে।
নীতি ঘোষণা করা তুলনামূলক সহজ; বাস্তবায়ন কঠিন।
ডিএসসিসি প্রশাসক মো. আবদুস সালামের এই উদ্যোগ সফল করতে হলে তিনটি বিষয়ে বিশেষ নজর দিতে হবে।
প্রথমত, নিবন্ধন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা থাকতে হবে।
দ্বিতীয়ত, নির্ধারিত জায়গা ও সময়ের বাইরে ব্যবসা বন্ধে নিয়ম সবার জন্য সমান হতে হবে।
তৃতীয়ত, উচ্ছেদ অভিযান যেন কেবল দুর্বল হকারের বিরুদ্ধে এবং প্রভাবশালী দখলদারের ক্ষেত্রে নরম না হয়।
কারণ নগর ব্যবস্থাপনায় সবচেয়ে বিপজ্জনক জিনিস হলো দ্বৈতনীতি। একজনকে সরিয়ে অন্যজনকে বসিয়ে দিলে ফুটপাত আবারও দখল হবে, শুধু দখলদারের মুখ বদলাবে।
একটি সিদ্ধান্ত, বহু নাগরিকের স্বস্তি
এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে এর সুফল শুধু হকারদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না।
পথচারী পাবেন হাঁটার জায়গা।
দোকানদার পাবেন দোকানের সামনে প্রবেশের সুযোগ।
গাড়ি চলাচলে বাড়বে স্বাভাবিকতা।
হকার পাবেন নিবন্ধিত ব্যবসার পরিচয়।
সিটি করপোরেশন পাবে ব্যবস্থাপনার কাঠামো।
নগর পাবে পরিচ্ছন্নতা ও শৃঙ্খলার সুযোগ।
অর্থাৎ, এটি এমন একটি সিদ্ধান্ত, যেখানে সঠিক বাস্তবায়ন হলে একই সঙ্গে নাগরিক অধিকার ও জীবিকার অধিকারকে সমন্বয় করা সম্ভব।
ঢাকা শুধু রাজধানী নয়, একটি জীবন্ত অর্থনৈতিক শরীর
ঢাকার ফুটপাতকে শুধু ইট, সিমেন্ট ও টাইলস দিয়ে দেখলে ভুল হবে। এর ওপর হাঁটে মানুষ, চলে অর্থনীতি, গড়ে ওঠে জীবিকা, তৈরি হয় নাগরিক সম্পর্ক।
কিন্তু শরীরের প্রতিটি অঙ্গের যেমন নির্দিষ্ট কাজ আছে, নগরেরও তেমন। ফুটপাতের কাজ হাঁটানো, সড়কের কাজ চলাচল নিশ্চিত করা, মার্কেটের কাজ বাণিজ্য করা।
ফুটপাত যদি দোকান হয়ে যায়, সড়ক যদি পার্কিং হয়ে যায়, আর বাজার যদি যেখানে সেখানে ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে শহর ধীরে ধীরে নিজের স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা হারায়।
সেই জায়গায় ডিএসসিসির নতুন উদ্যোগটি হতে পারে নগরকে তার নিজস্ব ছন্দে ফিরিয়ে আনার একটি প্রচেষ্টা।
আগামী দিনের ঢাকা
হকার সমস্যার সমাধান শুধু ‘উচ্ছেদ’ শব্দে খুঁজলে হবে না। দরকার নিবন্ধন, নির্দিষ্ট স্থান, নির্দিষ্ট সময়, ডিজিটাল পরিচয়, স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং নিয়মভিত্তিক ব্যবসা।
আজ যে হকার ফুটপাতের এক কোণে বসে জীবিকা খুঁজছেন, সঠিক ব্যবস্থাপনায় তিনিই আগামী দিনের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা হতে পারেন। তার সন্তান হয়তো একদিন সেই ব্যবসাকে বড় প্রতিষ্ঠানে নিয়ে যাবেন।
তাই হকারকে শত্রু না বানিয়ে, তাকে নগর অর্থনীতির অংশ হিসেবে নিয়ন্ত্রণ করা দরকার। একই সঙ্গে নাগরিকের হাঁটার অধিকারও কোনোভাবেই বিসর্জন দেওয়া যাবে না।
ঢাকার ফুটপাত পথচারীর জন্য ফিরুক, হকারের জীবিকা ফিরুক পরিকল্পিত মার্কেটে, আর নগরের অর্থনীতি ফিরুক শৃঙ্খলার আলোয়।
ডিএসসিসি প্রশাসক মো. আবদুস সালামের সিদ্ধান্তটি সফল হলে এটি শুধু ঢাকার ফুটপাত ব্যবস্থাপনার পরিবর্তন হবে না; বাংলাদেশের অন্যান্য মহানগর ও শহরের জন্যও একটি অনুসরণযোগ্য মডেল হয়ে উঠতে পারে।
সূর্যের আলো যেমন একই সঙ্গে পথ দেখায় এবং অন্ধকার সরায়, তেমনি একটি ভালো নগরনীতি একই সঙ্গে নাগরিকের অধিকার রক্ষা করে এবং শ্রমজীবী মানুষের জীবিকার পথ উন্মুক্ত করে।
সেই অর্থে, ‘মূল সড়কে হকার নয়, পরিকল্পিত মার্কেটে জীবিকা’ শুধু একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি হতে পারে একটি পরিচ্ছন্ন, মানবিক ও অর্থনৈতিকভাবে সচল ঢাকার দিকে এগিয়ে যাওয়ার সূর্যালোকিত পদক্ষেপ।
Leave a Reply