সম্প্রতি স্পেনের ভবিষ্যৎ রানি, ক্রাউন প্রিন্সেস লিওনর সর্বাধিনায়ক হিসাবে তার ভূমিকার জন্য প্রস্তুত হতে সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমান ও মহাকাশ বাহিনীজুড়ে তিন বছরের কঠোর সামরিক প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করেছেন। এ প্রাতিষ্ঠানিক সাফল্যের পর তিনি এখন রাজতান্ত্রিক জীবনের পরবর্তী অধ্যায়ের সূচনা করছেন।”
স্পেনের ভবিষ্যৎ রানি : তথ্য ও গণমাধ্যমের এ যুগে, উপরোক্ত সংবাদটি বিশ্বজুড়ে প্রশংসাসূচক মন্তব্যসহ প্রচারিত হয়েছে, যা দেশে ও বিদেশের অনেক সামরিক কর্মকর্তা মহলে শেয়ার করা হয়েছে। জানা গেছে, পরবর্তী পর্যায়ে তিনি রাষ্ট্রবিজ্ঞানে তার বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা গ্রহণ করবেন। আমার অনেক ছাত্রছাত্রী এবং কিছু শিশুও কৌতূহলী ছিল, কেন এবং কীভাবে একজন ভবিষ্যৎ রানির এমন কঠিন সামরিক প্রশিক্ষণের প্রয়োজন হলো? আমি ‘সামরিক কায়দায়’ উত্তর দিয়েছিলাম এবং আমার উত্তরের সারমর্ম ছিল বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর দৃষ্টিকোণ থেকে। প্রত্যেক সার্বভৌম রাষ্ট্র তার স্বাধীনতা, ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা, স্থিতিশীলতা এবং উন্নয়ন রক্ষার জন্য জাতীয় শক্তির বিভিন্ন উপকরণের ওপর নির্ভর করে। এ উপাদানগুলোর মধ্যে সাধারণত অন্তর্ভুক্ত রয়েছে কূটনৈতিক শক্তি, তথ্যগত শক্তি, সামরিক শক্তি এবং অর্থনৈতিক শক্তি, সংক্ষেপে ডাইম (DIME)। স্নায়ুযুদ্ধ এবং স্নায়ুযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা ও সামরিক কৌশলগত পরিকল্পনা থেকে ডাইম ধারণাটির উদ্ভব হয়। সামরিক বাহিনী জাতীয় শক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসাবে সার্বভৌমত্ব, জাতীয় ঐক্য এবং সাংবিধানিক শৃঙ্খলার প্রতীক হিসাবে কাজ করে। ১৯৭১ সালের গৌরবময় মুক্তিযুদ্ধে সাধারণ জনগণের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর জন্ম হয়। বিগত দশকগুলোতে শেষ আশ্রয়স্থল হিসাবে সেনাবাহিনী শুধু দেশের সার্বভৌমত্বই রক্ষা করেনি, বরং জাতি গঠন, দুর্যোগব্যবস্থাপনা, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষায়ও উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছে।”
বাংলাদেশ সেনাবাহিনী : সাহস ও পেশাদারত্বের এক ঐতিহ্য : ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী কর্মকর্তাদের বিষয়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নথি অনুযায়ী, সবচেয়ে ধারাবাহিকভাবে উল্লিখিত তথ্যটি হলো, তৎকালীন ক্যাপ্টেন জিয়াউর রহমান (পরবর্তী সময়ে মেজর জেনারেল ও রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান) পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে কর্মরত ছিলেন এবং যুদ্ধের সময় খেমকরণ সেক্টরে যুদ্ধ করেছিলেন। আজকের বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর পূর্বসূরি ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময় পদাতিক বাহিনীর মধ্যে সর্বোচ্চ বীরত্বসূচক সম্মাননা লাভ করে অসাধারণ স্বীকৃতি অর্জন করেছিল। এ গৌরবময় কীর্তি স্বাধীন বাংলাদেশের আবির্ভাবের অনেক আগেই বাঙালি সৈন্যদের সাহস, শৃঙ্খলা এবং যুদ্ধ করার মানসিকতার পরিচয় দিয়েছিল।
জাতীয় সংকটকালে একটি স্থিতিশীলকারী শক্তি : ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, সেনাবাহিনী, আইনানুগ কর্তৃত্ব এবং জাতীয় প্রয়োজনে, প্রায়শই স্থিতিশীলতা রক্ষা, জীবন ও সম্পত্তি সুরক্ষা এবং শান্তিপূর্ণ পালাবদল সহজতর করতে গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা প্রদান করেছে। প্রাতিষ্ঠানিক মূল্যবোধ ও আদর্শে অনুপ্রাণিত কঠোর প্রশিক্ষণের কারণে সামরিক কর্মীদের জন্য কঠিন কাজও সহজ হয়ে ওঠে।”
সেনাবাহিনীর মূল্যবোধ ও আদর্শের ভিত্তি : বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর শক্তি শুধু অস্ত্র বা সরঞ্জামের মধ্যে নিহিত নয়, বরং এর প্রাতিষ্ঠানিক মূল্যবোধ ও আদর্শের মধ্যে নিহিত, যা ২০১০-১২ সালে উদ্ভূত হয়েছিল, যেখানে আমার অবদান ছিল। এ মূল্যবোধগুলোর মধ্যে রয়েছে সম্মান ও গর্ব, সততা ও নিষ্ঠা, আনুগত্য, দেশপ্রেম, বিশ্বাস ও আস্থা, শ্রদ্ধা, ন্যায়পরায়ণতা, আত্মত্যাগের আগে সেবা এবং সাহস। একইভাবে, সেনাবাহিনীর আদর্শ দেশের প্রতি নিষ্ঠা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার প্রতি অঙ্গীকার, সংবিধানের প্রতি আনুগত্য, পেশাগত উৎকর্ষ এবং দেশরক্ষায় সর্বোচ্চ আত্মত্যাগের প্রস্তুতির ওপর জোর দেয়। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সব সদস্য ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট বিপ্লবের চেতনাকে মূল্য দেয়, যেখানে সৈন্যরা সংকটময় মুহূর্তে জনগণকে সমর্থন করেছিল, যার জন্য সেনাবাহিনীর শীর্ষ নেতৃত্বকে অবশ্যই কৃতিত্ব দিতে হবে। অন্যথায়, একটি বড় বিপর্যয় ঘটতে পারত।
আমরা ‘জনগণের সেনাবাহিনী’ : বাংলাদেশ সেনাবাহিনী যথার্থই জনগণের সেনাবাহিনী নামে পরিচিত। কারণ এর শক্তি শুধু এর পেশাদারত্ব ও সামরিক সক্ষমতা থেকেই আসে না, বরং এর সেবায় নিয়োজিত নাগরিকদের আস্থা, বিশ্বাস ও সমর্থন থেকেও আসে। একটি নিরাপদ, শান্তিপূর্ণ ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার জন্য জনগণ ও তাদের সেনাবাহিনীর মধ্যকার স্থায়ী অংশীদারত্ব অপরিহার্য। তাই মাও জেদুং বলেছেন, ‘জনগণ ছাড়া সেনাবাহিনী শক্তিশালী হতে পারে না’। এবং একটি পেশাদার সেনাবাহিনী তার কঠোর সামরিক প্রশিক্ষণ ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর কারণে জনগণের প্রতি সহানুভূতিশীল এবং সামাজিক ঋণে দায়বদ্ধ হয়ে ওঠে। সব প্রশিক্ষণার্থীকে প্রথমে তার সহকর্মী-সহযোদ্ধার (বন্ধু) যত্ন নিতে শেখানো হয়, যারা প্রতীকীভাবে এবং সম্মিলিতভাবে নিজেদের নাগরিক-দেশবাসী-জনগণে পরিণত হয়। একজন সত্যিকারের সৈনিক তার সঙ্গীকে বিপদে ফেলে যেতে পারে না, জনগণের প্রতিও তাই।”
শেষ কথা : স্প্যানিশ রাজকুমারী লিওনরের বিষয়টি প্রতীকী এবং এটি উন্নয়নশীল বাংলাদেশের জন্য বিশাল শিক্ষা বহন করে। সব সেনাবাহিনী একই নীতিতে প্রশিক্ষণ নেয় : ‘কঠোর প্রশিক্ষণ, সহজ যুদ্ধ’। আমাদের সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষণের মান অত্যন্ত উঁচু, কারণ ১৯৭৬ সাল থেকে এটি আমাদের বিদ্রোহ দমনে বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়েছে, জাতিসংঘে ভূমিকা রেখেছে এবং বিদেশে প্রশিক্ষণার্থীদের প্রশিক্ষণ প্রদান করেছে। বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমি (বিএমএ) একটি অনন্য এবং বিশ্বমানের প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান, কারণ আমার একটি প্রথম বিশ্বের সেনাবাহিনীর এ প্রতিষ্ঠানটি পরিদর্শন করার সুযোগ হয়েছিল। ’৮০-এর দশক এবং ’৯০-এর দশকের শুরুতে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (বিসিএস) ক্যাডারের কর্মকর্তাদের বিএমএ থেকে প্রশিক্ষণ নিতে হতো। পরবর্তী সময়ে কথিত আছে, ‘স্বস্তিদায়ক পরিবেশের’ সন্ধানে এটি বন্ধ হয়ে যায় এবং এটি ছিল বেসামরিক-সামরিক সম্পর্কের অবক্ষয়ের অন্যতম কারণ। গত দশকে সামরিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের অন্য কারণগুলো ছিল সামাজিক-রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং বিপজ্জনক ধরনের বাহ্যিক প্রভাব। এখন আমাদের লাগাম আরও শক্ত করার সময় এসেছে, যার মধ্যে বিসিএস অফিসারদের বিএমএ-তে যথাযথ প্রশিক্ষণের জন্য পুনরায় পাঠানোও অন্তর্ভুক্ত। অন্যথায় আরও বহুমাত্রিক বিপর্যয় অপেক্ষা করছে।
পরিশেষে, আমাদের সবাইকে অবশ্যই মনে রাখতে হবে, সারা বিশ্বের সৈন্যরা একটি কঠোর কমান্ড শৃঙ্খলের মাধ্যমে কাজ করে এবং সরকারের আইনানুগ কর্তৃত্বের অধীনে, সংবিধান ও প্রতিরক্ষামন্ত্রীসহ নির্ধারিত বেসামরিক নেতৃত্বের প্রতি আনুগত্য রেখে পরিচালিত হয়। চূড়ান্তভাবে, সেনাবাহিনী সর্বদা একটি বেসামরিক নেতৃত্বের দ্বারা পরিচালিত হয়-সাধারণত শাসক দলের প্রধান। গবেষক, শিক্ষাবিদ এবং বিশ্লেষকরা এ সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন, বাংলাদেশের রাজনীতিবিদরা ব্যবসায়ীদের দ্বারা প্রভাবিত। একাদশ সংসদে ব্যবসায়ী ছিলেন ৬১-৬৩ শতাংশ এবং দ্বাদশ সংসদে তা এখন ৬৫-৭০ শতাংশ। এবং ঐতিহ্যগতভাবে পুঁজিবাদী মডেলে ‘ব্যবসায়ীরা মুনাফা-অর্থের (দ্বিতীয় ঈশ্বর) ওপর মনোযোগ দেয় এবং রাজনীতিবিদদের ক্ষমতার প্রয়োজন হয়।’ এখানে, সৎ নাগরিকরা-সে মহৎ রাজনীতিবিদ-ব্যবসায়ী, আমলা, সরকারি কর্মকর্তা বা ‘জেন-জি’ যেই হোক না কেন, একমাত্র তারাই সেই শক্তিকে প্রতিহত করতে পারে। আমাদের সবাইকে মানতে হবে, প্রকৃত শক্তি নিহিত রয়েছে কঠোর প্রশিক্ষণ এবং ব্যাপক সামরিক দক্ষতা অর্জনের মধ্যে; এবং এ বিষয়গুলোই স্পেনের ভবিষ্যৎ তরুণী রানি-সর্বাধিনায়ককে শুধু একজন নেতা হয়ে ওঠার জন্য তার মূল্যবান সময় প্রশিক্ষণে ব্যয় করতে বাধ্য করেছিল। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে প্রকৃত পেশাদারত্ব এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ গড়ে ওঠে, যা দীর্ঘমেয়াদে একটি রাষ্ট্র অথবা সংস্থার স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করে এবং আমরা এ থেকে অনেক পিছিয়ে আছি। সম্ভবত এটি আমাদের চোখ খুলে দেবে ‘তাদের (স্পেন) এবং আমাদের (বাংলাদেশ)’ মধ্যকার পার্থক্য খুঁজে বের করার জন্য। কিন্তু আমরা ভবিষ্যতের জন্য সবসময় শিখতে পারি।”
ড. আব্দুল্লাহ আল মামুন : অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল; এমআইএসটি-তে সহযোগী অধ্যাপক হিসাবে কর্মরত”
Leave a Reply