শিক্ষা কেবল একটি পরীক্ষা নয়; শিক্ষা একটি রাষ্ট্রের ন্যায়বিচারের আয়না। একটি পরীক্ষা শুধু প্রশ্নপত্র আর উত্তরপত্রের বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে লাখো পরিবারের স্বপ্ন, বছরের পর বছর পরিশ্রম, একজন মায়ের দোয়া, একজন বাবার ত্যাগ এবং একজন শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ।
সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভারী বৃষ্টি, বন্যা এবং জলাবদ্ধতার মধ্যেই এইচএসসি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছে। অনেক পরীক্ষার্থী কোমরসমান পানি পেরিয়ে কেন্দ্রে পৌঁছেছে। কোথাও যানবাহনের সংকট ছিল, কোথাও দীর্ঘ পথ হেঁটে যেতে হয়েছে, আবার কোথাও সময়মতো কেন্দ্রে পৌঁছাতে না পেরে কেউ পরীক্ষায় অংশই নিতে পারেনি। অনেকের ঘরবাড়ি প্লাবিত হয়েছে, বইপত্র ভিজে গেছে, বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় পর্যাপ্ত প্রস্তুতির সুযোগও ছিল না।
এখানেই রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি উঠে আসে। সমান প্রশ্নপত্র দেওয়া আর সমান সুযোগ নিশ্চিত করা এক বিষয় নয়। একজন শিক্ষার্থী যদি নিরবচ্ছিন্ন পরিবেশে প্রস্তুতি নেয়, আর অন্যজন যদি বন্যার পানিতে বই বাঁচাতে ব্যস্ত থাকে, তাহলে একই প্রশ্নপত্র দিয়ে কি সত্যিই সমান প্রতিযোগিতা নিশ্চিত হয়?
অন্যদিকে রাষ্ট্রেরও বাস্তব সীমাবদ্ধতা রয়েছে। একটি জাতীয় পাবলিক পরীক্ষা স্থগিত করা সহজ সিদ্ধান্ত নয়। প্রশ্নপত্রের নিরাপত্তা, লক্ষাধিক পরীক্ষার্থী, হাজারো কেন্দ্র, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি সূচি, ফল প্রকাশ, পরবর্তী শিক্ষাবর্ষ এবং সামগ্রিক শিক্ষা ক্যালেন্ডার একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কিত। সরকার সম্ভবত এসব বাস্তবতা বিবেচনা করেই পরীক্ষা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
কারণ এইচএসসি পরীক্ষা শুধু একটি শ্রেণির পরীক্ষা নয়। এর সঙ্গে উচ্চশিক্ষা, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, এমনকি নিচের শ্রেণিগুলোর শিক্ষা ক্যালেন্ডারও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। একটি সিদ্ধান্তের প্রভাব বহু স্তরে পড়ে।
তবু একটি নীতিগত প্রশ্ন থেকেই যায়। যখন দুর্যোগে দেশের একটি উল্লেখযোগ্য অংশের শিক্ষার্থী বাস্তবিক অর্থেই সমান সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়, তখন ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলের জন্য বিকল্প সময়সূচি, বিশেষ পরীক্ষা বা অন্য কোনো ন্যায়সংগত ব্যবস্থা নিয়ে আরও গভীরভাবে ভাবা কি প্রয়োজন ছিল না?
আইনের চোখে সবাই সমান হতে পারে; কিন্তু বাস্তবতার চোখে সবাই একই অবস্থানে থাকে না। একজন সুস্থ মানুষ এবং একজন আহত মানুষকে একই গতিতে দৌড়াতে বলা যেমন ন্যায় নয়, তেমনি দুর্যোগের মধ্যেও সবাইকে একই পরিস্থিতির পরীক্ষার্থী ধরে নেওয়াও বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিক্ষামন্ত্রীকে ঘিরে অনেক ক্ষোভ, ব্যঙ্গ এবং ব্যক্তিগত আক্রমণও দেখা যাচ্ছে। বিভিন্ন স্লোগান, কটূক্তি এবং অবমাননাকর উপাধি ব্যবহার করে প্রতিবাদ প্রকাশ করা হচ্ছে। একটি গণতান্ত্রিক সমাজে নীতির সমালোচনা অবশ্যই গ্রহণযোগ্য; কিন্তু ব্যক্তিগত অবমাননা বা বিদ্বেষপূর্ণ ভাষা কখনোই যুক্তিকে শক্তিশালী করে না। ইতিহাস বলছে, যে সমাজ যুক্তির পরিবর্তে অপমানকে প্রতিবাদের ভাষা বানায়, সেখানে সমস্যার সমাধানের চেয়ে বিভাজনই বেশি জন্ম নেয়।
আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতেও এমন স্লোগানের ইতিহাস নতুন নয়। অতীতেও বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস থেকে শুরু করে রাজপথে ব্যক্তিকেন্দ্রিক ব্যঙ্গ ও অপমানের ভাষা ব্যবহার হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এসব কি শিক্ষা ব্যবস্থার সংকটের সমাধান করেছে, নাকি কেবল রাজনৈতিক উত্তেজনাই বাড়িয়েছে?
এদিকে অনেকে বর্তমান শাসনব্যবস্থার রাজনৈতিক পরিবেশ, জনসমাবেশের সংস্কৃতি এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ধরন নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন। তাঁদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষা ও মেধা বিকাশের ধারাবাহিকতায় যে দুর্বলতা তৈরি হয়েছে, তার প্রভাব আজ স্পষ্ট। আবার এটিও সত্য যে সাম্প্রতিক কয়েক বছরে নানা কারণে অনেক শিক্ষার্থী নিয়মিত পাঠাভ্যাস থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল। সেই বাস্তবতা তাদের প্রতিযোগিতার সক্ষমতার ওপরও প্রভাব ফেলেছে।
তাই প্রশ্নটি কেবল একজন মন্ত্রীর নয়; এটি পুরো শিক্ষা ব্যবস্থার। যদি কোথাও প্রশাসনিক ঘাটতি থেকে থাকে, তবে তা নিরপেক্ষভাবে মূল্যায়ন করা উচিত। যদি দুর্যোগকবলিত অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা প্রয়োজন হয়, তবে তা দ্রুত বিবেচনায় আনা উচিত। একটি মানবিক রাষ্ট্রের দায়িত্ব এখানেই।
দক্ষিণ কোরিয়ার চলচ্চিত্র Parasite আমাদের একটি গভীর সত্য শিখিয়েছে। একই বৃষ্টি ধনীর কাছে রোমান্টিক সন্ধ্যা হতে পারে, আবার গরিবের কাছে ভেসে যাওয়া ঘরের কান্না। প্রকৃতি সবার জন্য একই; কিন্তু দুর্যোগের অভিঘাত সবার জীবনে সমান নয়। রাষ্ট্রের নীতিও তাই এমন হওয়া উচিত, যা এই বৈষম্য কমায়।
আজ যারা পানির মধ্যে হেঁটে পরীক্ষা দিয়েছে, তাদের অনেকেই জীবনের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষাটি প্রশ্নপত্রে নয়, পরীক্ষাকেন্দ্রে পৌঁছানোর পথেই দিয়েছে। তাদের ভেজা প্রবেশপত্র, কাঁপতে থাকা হাত কিংবা বন্যায় ভেসে যাওয়া বই কোনো পরিসংখ্যান নয়; এগুলো রাষ্ট্রের বিবেককে প্রশ্ন করে।
তবে আরেকটি প্রশ্নও সমান গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগেই কি সমস্যার সমাধান হবে?
যদি কোনো সিদ্ধান্তে ভুল থাকে, তার জবাবদিহি অবশ্যই হতে হবে। যদি অবহেলা থাকে, তার তদন্ত হওয়া উচিত। যদি নীতিগত ঘাটতি থাকে, তা সংশোধন করা প্রয়োজন। কিন্তু কেবল একজন ব্যক্তির পদত্যাগে কি বন্যা থেমে যাবে? ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীদের ক্ষতি পূরণ হবে? নাকি প্রয়োজন এমন একটি দুর্যোগভিত্তিক শিক্ষা নীতি, যেখানে ভবিষ্যতে একই পরিস্থিতিতে দ্রুত বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়ার সুস্পষ্ট কাঠামো থাকবে?
একটি গাছের শুকিয়ে যাওয়া পাতাগুলো ছেঁটে ফেললেই যদি শিকড়ের রোগ সেরে যেত, তাহলে পৃথিবীতে কোনো বন আর ধ্বংস হতো না। শিক্ষা ব্যবস্থার সমস্যাও তেমনি। ব্যক্তি পরিবর্তনের পাশাপাশি নীতি, প্রস্তুতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার উন্নয়নও সমান জরুরি।
একটি মানবিক রাষ্ট্রের শক্তি কেবল সময়মতো পরীক্ষা নেওয়ায় নয়; বরং এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণে, যেখানে ন্যায়বিচার, সহমর্মিতা এবং বাস্তবতা একই সঙ্গে স্থান পায়। শিক্ষা ব্যবস্থার উদ্দেশ্য শুধু ফল প্রকাশ নয়; প্রতিটি শিক্ষার্থীকে ন্যায্য সুযোগ দেওয়া।
কারণ একটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ শুধু পরীক্ষার খাতায় লেখা উত্তরের ওপর নির্ভর করে না; বরং সেই খাতাটি লেখার জন্য রাষ্ট্র কতটা সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে পেরেছে, ইতিহাস শেষ পর্যন্ত তারই মূল্যায়ন করে।
Leave a Reply