চট্টগ্রাম নগরীর বন্দর, ইপিজেড ও পতেঙ্গা থানাধীন ৩৬, ৩৭, ৩৮, ৩৯, ৪০ ও ৪১ নম্বর ওয়ার্ডে ডাম্প ট্রাকের বেপরোয়া চলাচল এবং রাতের আঁধারে অবৈধভাবে মাটি ফেলে পুকুর ভরাটের ঘটনায় চরম উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে ৩৮ নম্বর ওয়ার্ডে এই অনিয়ম যেন প্রকাশ্য দৌরাত্ম্যে রূপ নিয়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের আড়ালে প্রতিদিন অসংখ্য কাগজ পত্রবিহীন অবৈধ ডাম্প ট্রাক এসব এলাকায় চলাচল করছে। তবে রাত গভীর হলেই সক্রিয় হয়ে ওঠে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট। তাদের নিয়ন্ত্রণে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় অবৈধভাবে মাটি এনে পুকুর, জলাশয় ও নিচু জায়গা ভরাট করা হচ্ছে। এতে একদিকে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে বাড়ছে জলাবদ্ধতার ঝুঁকি।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, গভীর রাতে একের পর এক ডাম্প ট্রাক এসে নির্দিষ্ট স্থানে মাটি ফেলছে। অনেক ক্ষেত্রেই এসব কাজের কোনো বৈধ অনুমোদন নেই। প্রশাসনের নজর এড়াতে রাতকেই বেছে নেওয়া হচ্ছে, আর এই সুযোগে গড়ে উঠছে অবৈধ স্থাপনা ও দখল কার্যক্রম।
দিনের বেলাতেও এসব ডাম্প ট্রাকের বেপরোয়া চলাচলে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। সৃষ্টি হচ্ছে তীব্র যানজট, বাড়ছে সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকি। স্থানীয়দের দাবি, অতিরিক্ত গতি এবং অসচেতনভাবে গাড়ি চালানোর কারণে প্রায়ই রাতের বেলায় অন্যান্য যানবাহনের সঙ্গে ছোটখাটো দুর্ঘটনা ঘটছে। অনেক মোটরসাইকেল আরোহী ও ছোট যানবাহনের চালক আতঙ্ক নিয়ে চলাচল করছেন।
অনেক ক্ষেত্রে ট্রাকগুলোতে বহন করা বালু বা মাটি ত্রিপল দিয়ে ঢেকে না রাখায় সড়কে ছড়িয়ে পড়ছে ধুলাবালি ও কাদামাটি। এতে পরিবেশ দূষণের পাশাপাশি চরম দুর্ভোগে পড়ছেন পথচারীরা। অভিযোগ রয়েছে, এসব ট্রাকে করে আনা বালু ও মাটি প্রায় সময় এলাকার প্রধান সড়ক থেকে শুরু করে অলিগলির মাঝপথে ফেলে রাখা হয়। ফলে সকালবেলা গার্মেন্টসকর্মী, শিক্ষার্থী ও অফিসগামী মানুষদের চলাচলে মারাত্মক বিঘ্ন ঘটে এবং শুরু হয় দীর্ঘ যানজট। কোথাও কোথাও সড়ক সরু হয়ে যাওয়ায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা যান চলাচল স্থবির থাকার ঘটনাও ঘটছে।
অভিযোগ রয়েছে, এসব ট্রাকের বড় একটি অংশই ফিটনেসবিহীন এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ছাড়া চলাচল করছে। অতিরিক্ত মাল বহন, বেপরোয়া গতি এবং আইন অমান্য করে দিনের বেলাতেও নির্বিঘ্নে চলাচল করছে তারা। স্থানীয়দের দাবি, কিছু অসাধু প্রভাবশালী মহল ও দুর্নীতিগ্রস্ত চক্রের সহযোগিতায় এই অবৈধ কার্যক্রম দীর্ঘদিন ধরে চললেও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে দেখা যাচ্ছে না।
বিদ্যমান বিধিমালা অনুযায়ী, নগরীর ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় ডাম্প ট্রাকসহ ভারী যানবাহন শুধুমাত্র রাত ১০টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত সীমিত সময়ের জন্য চলাচলের অনুমতি পায়। একই সঙ্গে মাটি বা বালু পরিবহনের ক্ষেত্রে ত্রিপল দিয়ে ঢেকে রাখা বাধ্যতামূলক এবং অতিরিক্ত মাল বহন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
এছাড়া পুকুর বা জলাশয় ভরাটের ক্ষেত্রে পরিবেশগত ছাড়পত্রসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন বাধ্যতামূলক। এসব নিয়ম লঙ্ঘন করলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী জরিমানা, জেলসহ কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে।
তবে বাস্তবে এসব আইনের কার্যকর প্রয়োগ দেখা যাচ্ছে না বলে অভিযোগ এলাকাবাসীর। বরং রাতের আঁধারে অবৈধ পুকুর ভরাট এবং দিনের বেলায় বেপরোয়া ট্রাক চলাচল যেন নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়েছে।
সচেতন মহল বলছেন, এভাবে চলতে থাকলে নগরীর পরিবেশ, জলাবদ্ধতা পরিস্থিতি ও বাসযোগ্যতা ভয়াবহ হুমকির মুখে পড়বে। তারা অবিলম্বে অবৈধ পুকুর ভরাট বন্ধ, ডাম্প ট্রাক চলাচলে কঠোর নিয়ন্ত্রণ, ফিটনেসবিহীন যান জব্দ এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
এলাকাবাসীর একটাই দাবি, আইন যেন শুধু কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না থাকে, বাস্তবেও তার কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করা হোক। বন্দর নগরীতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে এখনই দৃশ্যমান ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
Leave a Reply