রংপুর জেলার মিঠাপুকুর উপজেলার নিভৃত গ্রাম এনায়েতপুরে গড়ে উঠেছে এক অনন্য সাংস্কৃতিক কেন্দ্র—“ফকির বাড়ী পল্লি জাদুঘর ও পাঠশালা”। ব্যক্তিগত উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত এই ব্যতিক্রমধর্মী সংগ্রহশালাটি ইতোমধ্যে গ্রামবাংলার হারিয়ে যেতে বসা ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও ইতিহাস সংরক্ষণের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।
মিঠাপুকুর উপজেলার কাফ্রিখাল/বালারহাট ইউনিয়নের সাতভেন্টি এনায়েতপুর গ্রামে অবস্থিত এই জাদুঘরটি রংপুর শহর থেকে প্রায় ২০–২৫ কিলোমিটার দূরে। পাকা সড়ক থেকে কিছুটা কাঁচা পথ অতিক্রম করে পৌঁছাতে হয় এখানে, যা দর্শনার্থীদের জন্য এক ভিন্নধর্মী গ্রামীণ অভিজ্ঞতা তৈরি করে।
প্রায় ২-৪
একর জমির ওপর বিস্তৃত এই জাদুঘর ঘিরে রয়েছে সবুজ প্রকৃতি, পদ্মদিঘি ও বাঁশের সাঁকো—যা একে করে তুলেছে নান্দনিক ও শান্ত পরিবেশের একটি আকর্ষণীয় কেন্দ্র।
সংগ্রামের গল্পে গড়া প্রতিষ্ঠান
এই জাদুঘরের প্রতিষ্ঠাতা লেখক ও সংস্কৃতিকর্মী আতিকুর রহমান (আদিল ফকির)। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি পুরনো ও ঐতিহ্যবাহী জিনিস সংগ্রহের প্রতি আগ্রহী ছিলেন।
২০০৫ সাল থেকে শুরু হয় তার সংগ্রহ কার্যক্রম। পরবর্তীতে ২০১৩ সালে জমি ক্রয় করে ২০১৬–১৭ সালের মধ্যে তিনি জাদুঘরের অবকাঠামো নির্মাণ সম্পন্ন করেন। তার নিরলস প্রচেষ্টায় গড়ে ওঠে এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগ, যা আজ স্থানীয়ভাবে গর্বের প্রতীক।
জাদুঘরটিতে সংরক্ষিত রয়েছে গ্রামবাংলার অতীত জীবনের নানা দুর্লভ উপকরণ, যেমন—
ঢেঁকি, লাঙলসহ কৃষি সরঞ্জাম
হারিকেন ও কুপিবাতি
গ্রামোফোন ও পুরনো রেডিও
তালপাতার পাখা ও একতারা
বিভিন্ন দেশের (প্রায় ১৮৩টি) পুরনো মুদ্রা ও ডাকটিকিট
এসব সংগ্রহ গ্রামীণ জীবনযাত্রা, কৃষি সংস্কৃতি ও লোকজ ঐতিহ্যের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে, যা নতুন প্রজন্মের জন্য অত্যন্ত শিক্ষণীয়।
জাদুঘরের সঙ্গে সংযুক্ত রয়েছে একটি পাঠশালা, যেখানে নতুন প্রজন্মকে ইতিহাস ও সংস্কৃতি সম্পর্কে সচেতন করার পাশাপাশি হাতে-কলমে শেখার সুযোগ দেওয়া হয়।
এখানে শিক্ষার্থীদের—
গ্রামীণ ঐতিহ্য সম্পর্কে ধারণা দেওয়া
সাংস্কৃতিক চর্চায় উৎসাহিত করা
গবেষণামূলক কার্যক্রমে আগ্রহ সৃষ্টি করা হয়
ফলে এটি শুধুমাত্র একটি জাদুঘর নয়, বরং একটি “জীবন্ত শিক্ষাকেন্দ্র” হিসেবে ভূমিকা রাখছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের উদ্যোগ গ্রামীণ ঐতিহ্য সংরক্ষণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। “ফকির বাড়ী পল্লি জাদুঘর ও পাঠশালা” ভবিষ্যতে একটি উল্লেখযোগ্য লোকজ গবেষণা কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।
এটি নতুন প্রজন্মকে তাদের শিকড়ের সঙ্গে পরিচিত করিয়ে দিচ্ছে এবং ইতিহাস-সংস্কৃতির প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি করছে।
প্রতিদিন বিভিন্ন এলাকা থেকে দর্শনার্থীরা এখানে এসে—
শৈশবের স্মৃতি খুঁজে পান
গ্রামবাংলার পুরনো জীবনযাত্রা কাছ থেকে দেখেন
শিক্ষামূলক অভিজ্ঞতা অর্জন করেন
অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও শিক্ষাসফরের জন্য এই স্থানটিকে বেছে নিচ্ছে।
মিঠাপুকুরের “ফকির বাড়ী পল্লি জাদুঘর ও পাঠশালা” কেবল একটি জাদুঘর নয়—এটি গ্রামবাংলার ইতিহাস, সংস্কৃতি ও সভ্যতার এক জীবন্ত দলিল। ব্যক্তিগত উদ্যোগে গড়ে ওঠা এই প্রতিষ্ঠান স্থানীয় পর্যায় ছাড়িয়ে জাতীয় সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম হচ্ছে।
এমন উদ্যোগের যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতা ও প্রচার পেলে বাংলাদেশের লোকজ ঐতিহ্য সংরক্ষণ আরও সমৃদ্ধ হবে—এমনটাই প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের।
Leave a Reply