নির্বাচন একটি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক শ্বাসপ্রশাস। অথচ দুঃখজনক বাস্তবতা হলো আমাদের দেশে বহু ক্ষেত্রে ভোটের দিন আসার আগেই সেই শ্বাস রোধ করে দেওয়া হয়। এই দেশে এখন আর নির্বাচন আসে না, নির্বাচনের নামে আসে একতরফা দখলদারীর উৎসব। নির্বাচন আসার কথা ছিলো জনগণের উৎসব হয়ে, অথচ বাস্তবে তা পরিণত হচ্ছে গণতন্ত্র হত্যার মহড়ায়। ভোটের দিন আসার আগেই মাঠ দখল, ভয়ভীতি, হামলা-মামলা আর প্রশাসনিক নিরবতার মধ্য দিয়ে জনগণের ভোটাধিকারকে কবর দেওয়া হচ্ছে। এ অবস্থায় প্রশ্ন জাগে- এটা কি আদৌ নির্বাচন, না কি ক্ষমতা পাকাপুক্ত করার একতরফার আয়োজন। ভোটের দিন দেখার আগেই গণতন্ত্রকে পরিকল্পিতভাবে গলা টিপে হত্যা করা হয়। ব্যানার ছেড়া, পোষ্টার ছিড়ে ফেলা, কর্মীদের হুমকি, মিথ্যা মামলা আর প্রশাসনের নিপীড়ন-এসব আর বিছিন্ন ঘটনা নয়, এগুলো এখন নির্বাচনী ব্যবস্থার নিয়মিত অস্ত্র, এসবই এখন নির্বাচনী সংস্কৃতির অঘোষিত অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে নির্বাচন থাকে কাগজে কলমে কিন্তু গনতন্ত্র নিহত হয় মাঠে ময়দানে। একটি অবাধ, সুষ্ঠ ও অংশগ্রহনমূলক নির্বাচন নিশ্চিত করা দায়িত্ব রাষ্ট্র যন্ত্রের। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে প্রশাসনের একটি অংশ নিরব দর্শকের ভুমিকায়, আবার কোন কোন ক্ষেত্রে পক্ষপাতদুষ্ট আচরণে লিপ্ত। বিরোধী মতকে দমিয়ে রাখা, নির্বাচনী প্রচারে বাধা সৃষ্টি করা ও ভয়ের পরিবেশ তৈরী করা এসবই জনগণের ভোটাধীকারদের অর্থহীন করে তোলে। যেখানে প্রতিদ্বন্ধী প্রার্থী মাঠেই নামতে পারে না, যেখানে ভোটার ভয় পেয়ে ঘরথেকে বের হতে চায় না, সেখানে নির্বাচন শব্দটি নিজেই একটি ভন্ডামিতে পরিণত হয়। সেখানে ভোটের কথা বলা নিছক তামাশা। আগে লাঠি, পরে ব্যালট- এই সূত্রে কোন গণতন্ত্র টিকে না তবু নির্লজ্জভাবে এটাকে নির্বাচন বলা হচ্ছে। ক্ষমতার লোভে গনতন্ত্রকে জবাই করে যারা নিজেদের বিজয় নিশ্চিত করতে চায় তারা আসলে রাষ্ট্রের শত্রু-এই সত্য আর আড়াল করার সুযোগ নেই। গনতন্ত্র কেবল ব্যালট বাক্সে সীমাবদ্ধ নয়। মত প্রকাশের স্বাধীনতা, সমান প্রচারের সুযোগ এবং নিরাপদ রাজনৈতিক পরিবেশ- এই তিন স্তম্ভের উপরই একটি গ্রহনযোগ্য নির্বাচন দাঁড়িয়ে থাকে। অথচ যখন একটি পক্ষ প্রকাশ্যে প্রচার চালাতে পারে আর অন্য পক্ষকে ভয় দেখিয়ে ঘরে বসিয়ে রাখা হয় তখন সেটিকে নির্বাচন বলা যায় না, সেটি ক্ষমতা পাকাপোক্ত করার এক তরফা আয়োজন মাত্র। আর উদ্বেগজনক বিষয় হলো-এসব ঘটনার বিরুদ্ধে যখন অভিযোগ উঠে, তখন তদন্তের পরিবর্তে অভিযোগ কারীকেই প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়। এতে জনগণের আস্থা ভেঙ্গে পড়ে, নির্বাচন ব্যবস্থার উপর বিশ্বাস নষ্ট হয় ও ভবিষৎ প্রজন্ম রাজনীতিতে ভয় পেতে শিখে। প্রশাসনের নিরপেক্ষতা আজ প্রশ্নবিদ্ধ নয় বরং ভেঙ্গে পড়েছে। দায়িত্ব পালনের নামে নীরবতা, আর নীরবতার আড়ালে পক্ষপাত-এই দ্বিচারিতাই গণতন্ত্র হত্যার প্রধান হাতিয়ার। আইন প্রয়োগ হয় দূর্বল কণ্ঠের বিরুদ্ধে, আর শক্তিশালীদের সামনে আইন দাঁড়িয়ে থাকে চোখ বুজে। এই নীরবতা কোন ভুল নয় এটি সচেতন সহযোগীতা। আইন যেখানে সবার জন্য সমান হওয়ার কথা, সেখানে তা হয়ে উঠেছে কেবল বিরোধী কন্ঠ দমনের হাতিয়ার। নির্বাচন কমিশনের ভুমিকা নিয়েও জনমনে তীব্র ক্ষোভ জমেছে। অভিযোগের পাহাড় জমলেও পদক্ষেপ নেই, দৃশ্যমান শাস্তি নেই। ফলে বার্তা স্পষ্ট-ভয় দেখাও, দমন করো, তারপর নির্বিঘ্নে ক্ষমতা কুক্ষিগত করো। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য এখনই প্রয়োজন শক্ত ও নিরপেক্ষ ভুমিকা। প্রশাসনকে প্রমাণ করতে হবে যে তারা কোন দলের নয়, তারা সংবিধানের পক্ষে। নির্বাচন কমিশনকে দৃশ্যমান ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। আর রাজনৈতিক দলগুলোকেও বুঝতে হবে- প্রতিপক্ষকে দমন করে নয়, জনগনের রায়েই ক্ষমতার বৈধতা আসে। আজ যদি এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাড়ানো না যায়, গণতন্ত্র হত্যার বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলা না হয় তবে আগামীকাল ভোটাধিকার নামের শব্দটি পাঠ্য বইয়ে বন্দী হয়ে পড়বে এবং শুধু স্মৃতিচারণার বিষয় হয়ে থাকবে। রাষ্ট্র, সমাজ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থেই এখনই প্রশ্ন তুলতে হবে- নির্বাচনের আগেই গণতন্ত্র হত্যার দায় কে নিবে? নাকি সবাই মিলে নীরব সম্মতিতেই এই হত্যাকে বৈধতা দেওয়া হবে। ইতিহাস বার বার প্রমাণ করেছে- আইন যখন লঠি হয় ভোট তখন নাটক হয় তাই ভোটের আগে গণতন্ত্র মরলে ভোটের দিন সুধু একটি নাটক মঞ্চস্থ হয়। রাষ্ট্রের স্বার্থেই এখন সিদ্ধান্ত নিতে হবে- আমরা কি একটি জীবিত গণতন্ত্র চাই না কি সাজানো নির্বাচনের মৃত সম্মাতি।
Leave a Reply