রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়ায় অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী জুয়েলসহ একই পরিবারের চারজনকে হত্যার ঘটনায় ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন নবনিযুক্ত রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের (আরপিএমপি) কমিশনার মু. মাহবুবুর রশিদ। গতকাল বৃহস্পতিবার রংপুরে যোগদানের পর আজ শুক্রবার (২৮ আগস্ট) দুপুরে তিনি চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন।
ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন পুলিশ কমিশনার। তিনি বলেন, “চার হত্যার ঘটনা বড় এবং চাঞ্চল্যকর। মামলাটি নিয়ে সারা দেশে আলোচনা চলছে। তদন্ত চলমান থাকায় নানা ধরনের তথ্য ও বক্তব্য সামনে আসতে পারে। তবে তদন্তের ধারাবাহিকতায় আমরা প্রকৃত ঘটনা খতিয়ে দেখছি।”তিনি বলেন, তদন্তে প্রাপ্ত প্রতিটি তথ্য গুরুত্বের সঙ্গে যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। ঘটনার প্রকৃত কারণ, হত্যাকাণ্ডের উদ্দেশ্য এবং এর সঙ্গে কারা জড়িত—এসব বিষয় তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত করা হবে।
কমিশনার আরও জানান, ঘটনাস্থলের কোনো আলামত ধুয়েমুছে ফেলা হয়নি। গুরুত্বপূর্ণ আলামত সংরক্ষণ করা হয়েছে। তদন্তের অগ্রগতি পর্যালোচনা করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। এ ঘটনায় পাওয়া বিভিন্ন আলামত, সাক্ষ্য, পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি ও প্রযুক্তিগত তথ্য বিশ্লেষণ করে তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
পুলিশের পক্ষ থেকে এর আগে জানানো হয়, হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের একাধিক দল মাঠে কাজ করছে। গোয়েন্দা তথ্য, ম্যানুয়াল সোর্সিং, বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ এবং প্রযুক্তিগত সহায়তায় তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় সিদ্ধার্থ দাস (১৯) ও মুগ্ধ দাস (২৩) নামে দুই যুবককে আটক করা হয়।
পুলিশ জানায়, সিদ্ধার্থ দাসকে তার চাচার বাসা থেকে আটক করা হয়। অপরদিকে মুগ্ধ দাসকে আটকের সময় সে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশ প্রায় এক ঘণ্টা অভিযান চালিয়ে তুতপাড়া এলাকা থেকে তাকে আটক করে।
আটক দুজনকে পৃথক ও মুখোমুখি জিজ্ঞাসাবাদে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ততার বিষয়ে তথ্য পাওয়া গেছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
এসব তথ্যের পাশাপাশি আলামত, সাক্ষ্য, পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতি ও অন্যান্য তথ্য-উপাত্ত যাচাই-বাছাই করে ঘটনার প্রকৃত কারণ ও জড়িতদের ভূমিকা নিশ্চিত করার কাজ চলছে।
পুলিশের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, ঘটনার দিন সকালে ইয়াবা সেবনের উদ্দেশ্যে তারা নিহত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীর বাড়িতে যায় বলে জিজ্ঞাসাবাদে তথ্য পাওয়া গেছে। সেখানে তাদের দেখে ফেলায় গণপতি চক্রবর্তীকে হত্যা করা হয় বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। পরে তার স্ত্রী, মেয়ে ও ছেলেকেও হত্যা করা হয় বলে জিজ্ঞাসাবাদে তথ্য পাওয়া যায়।
তবে হত্যাকাণ্ডের পেছনে মাদকের সংশ্লিষ্টতা ছাড়াও অন্য কোনো উদ্দেশ্য ছিল কি না, সেটিও গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। বাড়ি থেকে কোনো মালামাল নেওয়া হয়েছিল কি না এবং হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে আরও কেউ জড়িত কি না—এসব বিষয়ও তদন্তের আওতায় রয়েছে।
চার হত্যাকাণ্ডে মাদকের সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে জানিয়ে পুলিশ কমিশনার মাহবুবুর রশিদ বলেন, আগামী সাত দিনের মধ্যে এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানা যাবে। তদন্তে পাওয়া তথ্য ও আলামত বিশ্লেষণ করে মাদকের সংশ্লিষ্টতা কতটুকু ছিল, সেটিও স্পষ্ট হবে বলে জানান তিনি।
হত্যাকাণ্ডের পর বাড়ি থেকে নিয়ে যাওয়া মালামাল শ্যামাসুন্দরী খালে ফেলে দেওয়া হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে। আটক দুজনের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত সামগ্রী, নিয়ে যাওয়া মালামালসহ গুরুত্বপূর্ণ আলামত উদ্ধারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
এদিকে স্থানীয়দের দাবি, এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে আরও কেউ জড়িত থাকতে পারে। তারা বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে প্রত্যেক জড়িত ব্যক্তিকে শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন। পাশাপাশি দ্রুত তদন্ত শেষ করে চার হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত রহস্য উদঘাটনেরও দাবি জানান তারা।
পুলিশ কমিশনার বলেন, তদন্তের স্বার্থে বিভিন্ন দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে। কোনো একটি তথ্যের ওপর নির্ভর না করে আলামত ও তথ্য-উপাত্ত যাচাই-বাছাই করেই ঘটনার প্রকৃত চিত্র বের করা হবে।
তিনি আরও বলেন, “তদন্তে প্রয়োজনীয় তথ্য পেতে সাংবাদিক ও সাধারণ মানুষের সহযোগিতা প্রয়োজন। কারও কাছে এ ঘটনার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ কোনো তথ্য থাকলে তা পুলিশকে জানালে তদন্তে সহায়তা হবে।”
উল্লেখ্য, নবনিযুক্ত পুলিশ কমিশনার মু. মাহবুবুর রশিদ গতকাল বৃহস্পতিবার রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার হিসেবে যোগদান করেন। দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই নগরীর আলোচিত চার হত্যাকাণ্ডের ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে তিনি তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেন।
পুলিশ বলছে, তদন্ত এখনো চলমান। নতুন কোনো তথ্য বা আলামত পাওয়া গেলে তার ভিত্তিতে পরবর্তী আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। একই সঙ্গে তদন্তের স্বার্থে গুজব বা অসমর্থিত তথ্য প্রচার না করার জন্য সবাইকে সতর্ক করা হয়েছে।
চাঞ্চল্যকর এ চার হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ উদঘাটন, জড়িতদের শনাক্ত এবং গুরুত্বপূর্ণ আলামত উদ্ধারে পুলিশের তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। নবনিযুক্ত পুলিশ কমিশনারের ঘটনাস্থল পরিদর্শনের পর তদন্ত আরও গতিশীল হবে বলে প্রত্যাশা করছেন স্থানীয়রা।
Leave a Reply