সর্বজনীন বাসস্থান, টেকসই নগরায়ণ’—এই প্রত্যয়কে সামনে রেখে রংপুরে বিশ্ব বসতি দিবস ২০২৬ পালিত হয়েছে। পরিকল্পিত নগরায়ণ, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, সবুজায়ন ও পরিচ্ছন্ন শহর গড়ে তোলার পাশাপাশি সবার জন্য নিরাপদ ও সাশ্রয়ী আবাসন নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
সোমবার (৫ অক্টোবর) বিশ্ব বসতি দিবস উপলক্ষে রংপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের আয়োজনে এ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মো. শহিদুল ইসলাম এনডিসি, বিভাগীয় কমিশনার, রংপুর বিভাগ। সভাপতিত্ব করেন মো. সামসুজ্জামান সামু, চেয়ারম্যান, রংপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ। অনুষ্ঠানটি আয়োজন করে রংপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়, গণপূর্ত অধিদপ্তরের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী শেখ মিজানুর রহমান, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আবু জাফর সিদ্দিক ও নির্বাহী প্রকৌশলী সাকিউল আলম
বক্তারা বলেন, পরিকল্পনাহীন নগরায়ণের কারণে শহরে আবাসন, যানজট, জলাবদ্ধতা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ দূষণ ও নাগরিক সেবার ওপর চাপ বাড়ছে। তাই ভবিষ্যতের নগর গড়ে তুলতে হলে পরিকল্পিত আবাসন, পর্যাপ্ত নাগরিক সুবিধা, উন্মুক্ত স্থান, সবুজায়ন এবং পরিবেশবান্ধব অবকাঠামোর সমন্বিত উন্নয়ন প্রয়োজন।
বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ২০১১ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে শহুরে জনসংখ্যা ১ কোটি ১৫ লাখ বেড়েছে। একই সময়ে প্রায় ৬০ লাখ মানুষের নিট গ্রাম থেকে শহরে অভিবাসন হয়েছে। অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে শহরগুলোতে আবাসন ও নাগরিক সেবার ওপর চাপও বাড়ছে।
জলবায়ু পরিবর্তনও বাংলাদেশের নগরমুখী জনসংখ্যা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হয়ে উঠছে। বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চরম আবহাওয়া ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাংলাদেশে গ্রাম থেকে শহরে অভ্যন্তরীণ অভিবাসন বাড়ছে। এ কারণে আগামী বছরগুলোতে শহরগুলোতে সাশ্রয়ী আবাসনের চাহিদা আরও বাড়বে। প্রতিবেদনে ২০৩০ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের নগর এলাকায় প্রায় ১ কোটি ৫ লাখ আবাসন ইউনিট নতুনভাবে নির্মাণ বা সংস্কারের প্রয়োজনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
জাতিসংঘের হিসাবে, বিশ্বজুড়ে ৩০০ কোটির বেশি মানুষ পর্যাপ্ত আবাসন সুবিধা থেকে বঞ্চিত এবং ১০০ কোটির বেশি মানুষ অনানুষ্ঠানিক বসতি ও বস্তিতে বসবাস করছে। জলবায়ু পরিবর্তন, দুর্যোগ ও বাস্তুচ্যুতির কারণে আবাসন সংকট আরও তীব্র হচ্ছে।
বিশ্ব বসতি দিবস প্রতিবছর অক্টোবরের প্রথম সোমবার পালিত হয়। ২০২৬ সালের বিশ্ব বসতি দিবসের আন্তর্জাতিক প্রতিপাদ্য ‘Adequate Housing for All’—‘সবার জন্য পর্যাপ্ত আবাসন’। জাতিসংঘের উদ্যোগে দিবসটি নগর ও বসতির অবস্থা পর্যালোচনা এবং সবার পর্যাপ্ত আবাসনের অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা তৈরির জন্য পালিত হয়।
১৯৮৫ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ বিশ্ব বসতি দিবস প্রতিষ্ঠা করে এবং ১৯৮৬ সালে কেনিয়ার নাইরোবিতে প্রথমবার দিবসটি পালিত হয়। ওই বছরের প্রতিপাদ্য ছিল ‘Shelter is My Right’ বা ‘আবাসন আমার অধিকার’। অন্যদিকে, বসতি উন্নয়ন ও আবাসন ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অবদানের স্বীকৃতি দিতে UN-Habitat Scroll of Honour Award চালু করা হয় ১৯৮৯ সালে।
অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, শহরে নিম্ন ও মধ্যআয়ের মানুষের জন্য সাশ্রয়ী আবাসনের সুযোগ তৈরি করতে হবে। একই সঙ্গে ভাড়ার চাপ কমানো, পরিকল্পিত আবাসিক এলাকা গড়ে তোলা, খাসজমি ও সরকারি জমির যথাযথ ব্যবহার, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং নাগরিকদের জন্য পর্যাপ্ত পানি, পয়ঃনিষ্কাশন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও যোগাযোগ সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।
তারা আরও বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে গ্রাম থেকে শহরে মানুষের আগমন ভবিষ্যতে আরও বাড়তে পারে। তাই রংপুরসহ দেশের বিভাগীয় ও জেলা শহরগুলোকে এখন থেকেই জলবায়ু-সহনশীল, সবুজ ও পরিকল্পিত নগরে পরিণত করার উদ্যোগ নিতে হবে। আবাসনকে শুধু ভবন নির্মাণের বিষয় হিসেবে না দেখে মানুষের নিরাপদ জীবন, কর্মসংস্থান, পরিবেশ ও নাগরিক সুবিধার সঙ্গে সমন্বিতভাবে দেখতে হবে।
পরিকল্পিত নগরায়ণের মাধ্যমে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ বাড়ানো, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, পরিবেশ রক্ষা এবং নাগরিকদের জীবনমান উন্নয়নের পাশাপাশি সবার জন্য নিরাপদ ও সাশ্রয়ী আবাসন নিশ্চিত করা সম্ভব বলে অনুষ্ঠানে মত প্রকাশ করা হয়।
Leave a Reply