রাজশাহী দেশের অন্যতম পরিচ্ছন্ন ও পরিকল্পিত শহর হিসেবে এক সময় পরিচিত ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক বাস্তবতা এই গর্বিত পরিচয়কে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে। নগরীর অলিগলি, ড্রেন, নর্দমা ও ঝোপঝাড়ে যেভাবে মশার দখলদারি বেড়েছে, তা কেবল সাধারণ নাগরিকের জীবনযাত্রাকে দুর্বিষহ করে তুলছে না, বরং স্বাস্থ্যঝুঁকির মারাত্মক আশঙ্কাও তৈরি করছে। রাজশাহী সিটি করপোরেশনের (রাসিক) প্রশাসনিক স্থবিরতা, ওয়ার্ড পর্যায়ে জনপ্রতিনিধির অভাব এবং সিটি করপোরেশনের সুস্পষ্ট দায়সারা মনোভাব মিলে এই সংকটকে আরও ঘনীভ‚ত করেছে। রাজশাহীর বাসিন্দারা এখন দিনের বেলাতেও মশার কামড় থেকে রেহাই পাচ্ছেন না। একদিকে উন্নয়ন কার্যক্রম থমকে, অন্যদিকে নিয়মিত মশানিধন কর্মসূচি ও পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমেও রয়েছে চরম উদাসীনতা। পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত তথ্য থেকে জানা যায়, বর্ণালীর মোড় থেকে তেরোখাদিয়া পর্যন্ত বড় একটি ড্রেন তিন মাসেও পরিষ্কার করা হয়নি। এই ড্রেনটি এখন কার্যত মশার প্রজনন কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। আশপাশের দোকানদার ও বাসিন্দারা দিনের পর দিন কয়েল জ্বালিয়ে, মশারি টানিয়ে জীবন কাটাচ্ছেন। কারও শ^াসকষ্ট আছে, কেউ ক্রেতা হারাচ্ছেন, কেউ রাতের ঘুম হারাচ্ছেন-কিন্তু রাসিক নির্বিকার। এর চেয়েও বেশি উদ্বেগের বিষয় হলো, ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর ইতোমধ্যে তিনজন মারা গেছেন, নিয়মিত ভর্তি হচ্ছেন নতুন রোগী। চিকিৎসকেরা বলছেন, সচেতনতার অভাব এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণে নগর কর্তৃপক্ষের ব্যর্থতাই এই অবনতির জন্য দায়ী। রাসিকের প্রধান পরিচ্ছন্নতা কর্মকর্তা নিজেই স্বীকার করেছেন, মশা অনেক বেড়েছে। তিনি এর পেছনে দায় দিচ্ছেন নাগরিকদের অনীহা ও জনপ্রতিনিধির অনুপস্থিতিকে। অথচ, নাগরিকদের করের অর্থেই পরিচালিত হয় সিটি করপোরেশনের বাজেট, পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম, ওষুধ ছিটানো এবং অন্যান্য সেবামূলক কার্যক্রম। এমনকি ছাদবাগানের টবের পানি থেকে মশা জন্মায়-এই যুক্তিও অজুহাত ছাড়া কিছু নয়, যখন গোটা নগরীর ড্রেন ও নর্দমাগুলোই বছরের পর বছর অপরিচ্ছন্ন অবস্থায় পড়ে থাকে। রাজশাহীর মশা পরিস্থিতি কেবল একটি শহরের সংকট নয়, এটি পুরো নগর ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি। ডেঙ্গু প্রতিরোধে শুধু জনসচেতনতা নয়, প্রয়োজন সিটি করপোরেশনের নিয়মিত অভিযান, জরুরি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচি এবং মশানিধনে কার্যকর ওষুধ প্রয়োগ। একই সঙ্গে নাগরিকদেরও নিজেদের বাড়িঘর পরিচ্ছন্ন রাখার দায়িত্ব এড়ানোর সুযোগ নেই। রাজশাহীর এখন যেটি প্রয়োজন, তা হলো জরুরি ভিত্তিতে আন্তঃবিভাগীয় সমন্বয়ে একটি সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা। সিটি করপোরেশনের উচিত এলাকায় এলাকায় দ্রæততম সময়ে পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালানো, ড্রেন ও জলাশয়গুলো পরিষ্কার করা এবং ওয়ার্ড ভিত্তিক মশা নিয়ন্ত্রণ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা। নগরবাসীর স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার প্রশ্নে আর উদাসীনতা চলতে পারে না।
Leave a Reply