1. admin@gmail.com : দৈনিক আমার সময় : দৈনিক আমার সময়
  2. admin@dailyamarsomoy.com : admin :
কোরবানির হাটে ওজনভিত্তিক বিক্রি - দৈনিক আমার সময়

কোরবানির হাটে ওজনভিত্তিক বিক্রি

মোঃ নজরুল ইসলাম
    প্রকাশিত : রবিবার, ২৪ মে, ২০২৬

কোরবানি শুধু পশু জবাইয়ের আনুষ্ঠানিকতা নয়। এটি ত্যাগ, তাকওয়া, সততা, ন্যায়বোধ ও মানবিক দায়িত্ববোধের শিক্ষা। ইসলামে প্রতিটি লেনদেনের ভিত্তি হলো স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতা। তাই কোরবানির পশু ক্রয় বিক্রির ক্ষেত্রেও প্রতারণা, অস্পষ্টতা কিংবা অতিরিক্ত সুযোগসন্ধানিতা ইসলাম সমর্থন করে না।
পবিত্র কোরআনে মাপে ও ওজনে কম দেওয়ার বিরুদ্ধে কঠোর সতর্কবার্তা এসেছে। ইসলামের ইতিহাসে বাজার তদারকি, সঠিক ওজন নিশ্চিত করা এবং ক্রেতা বিক্রেতার অধিকার রক্ষাকে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব হিসেবে দেখা হয়েছে। মহানবী বলেছেন, সততা ও আমানতের সঙ্গে ব্যবসা করা ব্যক্তি সম্মানিত মর্যাদা লাভ করবে। অর্থাৎ একজন মুসলমান ব্যবসায়ীর পরিচয় শুধু লাভে নয়, নৈতিকতায়ও।
আজ দেশের বহু খামারি সারা বছর গরু পালন করেন। খাদ্য, ওষুধ, শ্রম, পরিচর্যা ও পরিবহন ব্যয় বহন করতে গিয়ে তাদের বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করতে হয়। কিন্তু কোরবানির মৌসুমে হাটে এসে অনেক সময় তারা অনিশ্চয়তা, দালালচক্র ও অস্বচ্ছ দরদামের শিকার হন। আবার সাধারণ ক্রেতার মনেও প্রশ্ন থাকে, তিনি প্রকৃত মূল্য দিচ্ছেন কি না। ফলে উভয় পক্ষের মধ্যেই এক ধরনের অবিশ্বাস তৈরি হয়।
এখানেই ওজনভিত্তিক বিক্রির বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বর্তমানে দেশের অনেক আধুনিক খামার লাইভ ওয়েট অনুযায়ী গরু বিক্রি করছে। এতে পশুর প্রকৃত মূল্য নির্ধারণ সহজ হয়। ক্রেতা বুঝতে পারেন তিনি কত ওজনের পশু কিনছেন, আর খামারিও ন্যায্য দাম পাওয়ার নিশ্চয়তা পান। এটি শুধু আধুনিক পদ্ধতি নয়, ইসলামের ন্যায়নীতি ও স্বচ্ছতার সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ।
আলেম সমাজের অনেকেই মনে করেন, শরিয়তে কোরবানির পশু কেনাবেচার নির্দিষ্ট পদ্ধতি বাধ্যতামূলক না হলেও প্রতারণামুক্ত ও স্পষ্ট লেনদেন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদি ওজনভিত্তিক বিক্রি মানুষের অধিকার রক্ষা করে, বিভ্রান্তি কমায় এবং উভয় পক্ষের সন্তুষ্টি নিশ্চিত করে, তবে তা ইসলামের নৈতিক উদ্দেশ্যের বিরোধী নয়। বরং “মাপে ও ওজনে পূর্ণতা” ইসলামের অর্থনৈতিক নীতিরই অংশ।
অন্যদিকে দেশের প্রাণিসম্পদ খাত দীর্ঘদিন ধরে নানা চ্যালেঞ্জের মুখে। পার্শ্ববর্তী ভারত ও মিয়ানমার সীমান্ত দিয়ে অতীতে অবৈধভাবে গবাদিপশু প্রবেশ দেশের প্রান্তিক খামারিদের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এতে দেশীয় উৎপাদক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে এবং বহু খামারি লোকসানের মুখ দেখেছেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশীয় খামারিরা উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখালেও তাদের টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন ন্যায্য মূল্য ও সুরক্ষিত বাজার ব্যবস্থা।
দেশীয় গরু দিয়ে কোরবানি শুধু ধর্মীয় অনুভূতির বিষয় নয়, এটি জাতীয় অর্থনীতি ও আত্মনির্ভরতার সঙ্গেও জড়িত। একজন মুসলমান যখন কোরবানির পশু কেনেন, তখন তিনি কেবল ইবাদতই করেন না, দেশের একজন খামারির শ্রম ও জীবিকাকেও সহায়তা করেন। তাই কোরবানির বাজারে ন্যায়সঙ্গত মূল্য নিশ্চিত করা এক ধরনের সামাজিক দায়িত্বও।
রাষ্ট্র চাইলে প্রতিটি কোরবানির হাটে ডিজিটাল স্কেল বাধ্যতামূলক করতে পারে। হাট ইজারাদারদের নির্ধারিত ফি এর বিনিময়ে ওজনসেবা নিশ্চিত করার দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে। সরকারি তদারকি থাকলে প্রতারণা কমবে, বাজারে শৃঙ্খলা আসবে এবং সাধারণ মানুষ আস্থার সঙ্গে পশু কিনতে পারবেন।
আজ প্রয়োজন কোরবানিকে শুধু আবেগের নয়, নৈতিকতা ও দায়িত্ববোধের আলোয় দেখা। কারণ ইসলাম শুধু ইবাদতের ধর্ম নয়, এটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনেরও শিক্ষা দেয়। যেখানে খামারির শ্রমের মর্যাদা থাকবে, ক্রেতার অধিকার সুরক্ষিত হবে, বাজারে স্বচ্ছতা থাকবে এবং দেশীয় অর্থনীতি শক্তিশালী হবে। তখনই কোরবানির প্রকৃত সৌন্দর্য আরও পরিপূর্ণ হয়ে উঠবে।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও পড়ুন
© All rights reserved © dailyamarsomoy.com