1. admin@gmail.com : দৈনিক আমার সময় : দৈনিক আমার সময়
  2. admin@dailyamarsomoy.com : admin :
১২ ডিসেম্বর শ্রীপুর মুক্ত দিবস - দৈনিক আমার সময়

১২ ডিসেম্বর শ্রীপুর মুক্ত দিবস

আলফাজ সরকার,গাজীপুর
    প্রকাশিত : বৃহস্পতিবার, ১১ ডিসেম্বর, ২০২৫
১২ ডিসেম্বর গাজীপুরের শ্রীপুর মুক্ত দিবস। ধর্ষণ, গণহত্যা, বসতভিটায় অগ্নিসংযোগ, অবসরপ্রাপ্ত সেনা সদস্যদের হত্যার পরে পাকিস্তানি সেনাদের সঙ্গে চলে মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মুখ যুদ্ধ। শ্রীপুর থেকে পাকিস্তানি সেনাদের যোগাযোগের জন্য রেলপথ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়। চারদিক থেকে প্রচন্ড আক্রমণে টিকতে না পেরে লেজ গুটিয়ে ১১ ডিসেম্বর রাতের আঁধারে শ্রীপুর ছাড়ে পাকহানাদার বাহিনী আর আত্মগোপনে চলে যেতে থাকে রাজাকার ও তাদের দোসররা।১৯৭১ সালের এই দিনে শ্রীপুর উপজেলা শত্রুমুক্ত হয়ে ওড়ে লাল-সবুজের পতাকা।
স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা, শ্রীপুরের ইতিহাস ও কৃষ্টি বই সূত্রে জানা যায়, ১৯৭১ সালের ১৮ এপ্রিল হানাদার বাহিনী শ্রীপুরে অবস্থান নেয়। শ্রীপুর থানা চত্বর, গোসিংগার কাচারী বাড়ি, কাওরাইদ রেলস্টেশন, সাতখামাইর স্টেশন, গোলাঘাট ব্রিজ, ইজ্জতপুর ব্রিজ, বলদিঘাট হাইস্কুল ও গাজীপুরে গড়ে তোলা হয় আটটি পাক সেনা ক্যাম্প। রাজেন্দ্রপুর সেনানিবাস থেকে ট্রেনযোগে শ্রীপুরে ছিল হানাদারদের সহজ যোগাযোগ। শ্রীপুর থানায় ছিল হানাদারদের প্রধান ঘাঁটি। স্থানীয় রাজাকারদের সহায়তায় হানাদার বাহিনী নিরীহ নারী-পুরুষ ও মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সদস্যদের ধরে এনে এসব ক্যাম্পে বর্বর নির্যাতন চালিয়ে হত্যা করত। মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়ায় কেওয়া গ্রামের নজরুল ইসলাম আকন্দের পিতা আলমগীর বাদশা আকন্দকে ধরে এনে শ্রীপুর থানা ক্যাম্পে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়।
শ্রীপুর মুক্তিযোদ্ধা রহমত আলী বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ সংলগ্ন বদ্ধ ভূমি ও সাত খামাইরের গণকবর আজ ও হানাদার বাহিনীর বর্বরতার স্বাক্ষ্য বহন করে।
১. সাতখামাইর গণকবর। একে একে ১০ জনকে বেঁধে এনে ব্রাশ ফায়ার করে হত্যাঃ-
সাতখামাইর গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল কাদের জানান, ওই এলাকার আব্দুস ছাত্তার,ইউসুফ আলী, আজম  আলী, আব্দুল লতিফ, গিয়াস উদ্দিন, ছসু মোল্লাসহ মোট ১০ জনকে নির্যাতনের পর হত্যা করে সাতখামাইরে গণকবর দেওয়া হয়। তাদের মধ্যে সাত মাসের সন্তান সম্ভাবা সালেহা এবং অপর তরুনী শিরীনকে পাকিস্তানি সেনারা শ্রীপুরে তাদের ক্যাম্পে নিয়ে যায়। যুদ্ধ শেষে শ্রীপুরের জিনেজানের রেলসেতুর কাছ থেকে তাদের মাথার চুল, কঙ্কাল এনে গণকবরে সমাহিত করা হয়। সাত খামাইরে এক লাইনে দাঁড় করিয়ে ব্রাশ ফায়ারে হত্যা করা হয় সাত নিরীহ ব্যক্তিকে।
২.শ্রীপুরের বদ্ধ ভূমিঃ-
মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাই কমিটির ডিসির প্রতিনিধি হিসেবে (সাবেক) দায়িত্বে থাকা আব্দুল কাদের বলেন, শ্রীপুর মুক্তিযোদ্ধা রহমত আলী কলেজ মাঠের একপাশে ১২জন শহীদের গণকবর রয়েছে। কেওয়া আকন্দবাড়ীর নজরুল ইসলাম মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ায় রাজাকারদের সহায়তায় পাকিস্তানিরা বাড়ি থেকে তাঁর বাবা ফকির আলমগীর বাদশাকে ধরে এনে হত্যা করে। তাঁর বাবার সাথে আরও কমপক্ষে ১১জনকে হত্যার পর এখানে গণকবর দেয়া হয়।
পার্শ্ববর্তী উপজেলায় যুদ্ধে অংশ নেয়া শ্রীপুরের বীর মুক্তিযোদ্ধা ও বর্তমান মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সদস্য  আফতাব উদ্দিন বলেন, ১৯৭১ সালের আগস্ট মাসের এক রাতে আমি বাড়ী থেকে কাপাসিয়ার উদ্দেশ্যে হেটে রওয়ানা হলাম। কলেজ সংলগ্ন স্থানে যেতেই কারো গোংরানির আওয়াজ পেলাম। উকি দিয়ে দেখি, ১০-১৫ জনের পাকিস্তানী হায়েনার দল এক যুবককে নির্যাতন করতে করতে মেরে ফেলছে। পরে জানা গেলো তিনি উজিলাব গ্রামের আওয়ামী সমর্থক ওমর আলী।
৩.শহীদ হন কিশোর সাহাব উদ্দিন, নিহত হয় চার রাজাকার ও এক পাকিস্তানি সেনাঃ-সেকসন কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা মিয়ার উদ্দিন, ৭ ডিসেম্বর ভোর ৪টায় ফায়ারের শব্দ শোনার পর পাকিস্তানি ক্যাম্পে আক্রমণ করা হয়। পরদিন সকাল ৭টা পর্যন্ত মুহুর্মুহু গুলির শব্দে আশপাশ প্রকম্পিত হয়ে ওঠে। মুক্তিযোদ্ধারা দু’দিক থেকেই পাকসেনাদের ওপর আক্রমণ করতে থাকে। চলতে থাকে গুলি বিনিময়। রাতভর প্রচন্ড যুদ্ধে রেলসেতুর পূর্ব পাশে দলের সামনের সারিতে ছিলেন শ্রীপুরের খোঁজেখানী এলাকার বাসিন্দা ও গোসিঙ্গা উচ্চ বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির ছাত্র সাহাব উদ্দিন। গুলি বিনিময়ের একপর্যায়ে হানাদারদের বুলেটবিদ্ধ হয়ে শহীদ হন তিনি।পরে হানাদার বাহিনী বনের ভিতর পুঁতে রাখে সাহাবদ্দিনের মরদেহ। এসময় নিহত হয় একজন পাকিস্তানি সেনাসহ চার রাজাকার।
৫.পাকিস্তানি সেনাদের অবস্থান ও মুক্তিযোদ্ধাদের পরিকল্পনা এবং বিজয়ঃ-বীর মুক্তিযোদ্ধা নুরুল ইসলাম মন্ডল হানাদার বাহিনীর উপর প্রতিশোধ নিতে মুক্তিযোদ্ধরা বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে আক্রমণের ছক তৈরি করেন। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করতে নূর মোহাম্মদ ফকিরের নেতৃত্বে উড়িয়ে দেয়া হয় রাজাবাড়ির পারুলী নদীর ব্রিজ। একই সাথে  গোসিংগা, কাওরাইদ, ইজ্জতপুর, গোলাঘাট ও সাতখামাইরে দু‘টি সহ ছয়টি সম্মুখ যুদ্ধ সংগঠিত হয়। মুক্তিযোদ্ধাদের একের পর এক গেঁড়িলা হামলা ও প্রচন্ড আক্রমনের মুখে হানাদার বাহিনীর মনোবল ভেঙ্গে একপর্যায়ে বিভিন্ন ক্যাম্প থেকে পিছু হটতে শুরু করে। ৭ডিসেম্বর জেড আই সুবেদের নেতৃত্বে ইজ্জতপুর ব্রিজ সেনাক্যম্পে হামলা করে মুক্তিযোদ্ধারা। পাক সেনারা একে একে সব ক্যাম্প গুটিয়ে নিয়ে শ্রীপুর থানা ক্যাম্পে গড়ে তুলে শক্ত অবস্থান। পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী মুক্তিযোদ্ধারাও  চার দিক থেকে থানা ক্যাম্প ঘিড়ে ফেলে। শুরু হয় মুক্তিযোদ্ধাদের প্রচন্ড আক্রমণ। বন্ধ করে দেয়া হয় হানাদারদের রশদ, খাদ্য সরবরাহ। বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় যোগাযোগ।
মুক্তিযোদ্ধাদের প্রচন্ড আক্রমণে হানাদার বাহিনী বিপর্যস্ত হয়ে পরে। কিশোর সাহাব উদ্দিন শহীদ হওয়ার চারদিন পর ১১ ডিসেম্বর বিকেল পৌনে পাঁচটার দিকে মুক্তিযোদ্ধা সংগঠক নূর মোহাম্মদ ফকিরের নেতৃত্বে এক দল মুক্তিযোদ্ধা ইজ্জতপুর থেকে শহীদ সাহাব উদ্দিনের মরদেহ উদ্ধারের অভিযান চালায়। এ সময় হানাদার বাহিনীর টহল ট্রেন থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে পাল্টাপাল্টি গুলি বর্ষণ চলে। চারদিক থেকে আক্রমণে টিকতে না পেরে ১১ ডিসেম্বর রাতের আঁধারে হানাদার বাহিনী শ্রীপুর ছেড়ে পালিয়ে যায়। ১২ ডিসেম্বর ভোরে শ্রীপুর সম্পূর্ণরুপে হানাদার মুক্ত হওয়ার খবর ছড়িয়ে পরে। উল্লাসিত জনতার পদচারণায় মুখরিত হয়ে উঠে চারদিক। শ্রীপুরের মাটিতে উড়ে স্বাধীন বাংলার লাল-সবুজের পতাকা।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও পড়ুন
© All rights reserved © dailyamarsomoy.com