রমজান এলেই সাতক্ষীরার কালীগঞ্জ উপজেলার নলতা শরীফ পরিণত হয় এক ব্যতিক্রমী মানবিক মিলনমেলায়। ধনী-গরিব, গ্রাম-শহর, ভিন্ন পেশা ও পরিচয়ের মানুষ একই কাতারে বসে প্রতিদিন প্রায় ৬ হাজার রোজাদার ইফতারে অংশ নেন। দীর্ঘ সাত দশকের বেশি সময় ধরে চলে আসা এই আয়োজন এখন দেশের অন্যতম বৃহৎ গণইফতার মাহফিল হিসেবে পরিচিত।
ঐতিহ্যবাহী নলতা কেন্দ্রীয় আহছানিয়া মিশন–এর উদ্যোগে রমজান মাসজুড়ে প্রতিদিন এই ইফতার মাহফিল অনুষ্ঠিত হচ্ছে। আয়োজকরা জানান, প্রথম রমজান থেকে ৩০ রমজান পর্যন্ত প্রতিদিন গড়ে ৫ থেকে ৬ হাজার রোজাদার এখানে অংশ নেন।
সরেজমিনে দেখা যায়, ফজরের নামাজের পর থেকেই শুরু হয় বিশাল প্রস্তুতি। প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ জন বাবুর্চি ও কর্মী শিঙাড়া, ছোলা, ডিম সিদ্ধ, ফিরনি, খেজুর, কলা ও চিঁড়া প্রস্তুতে ব্যস্ত থাকেন। বিকেল গড়ালে মিশন প্রাঙ্গণ ভরে ওঠে মানুষের উপস্থিতিতে। মাগরিবের আগে সারিবদ্ধভাবে বসে পড়েন হাজারো রোজাদার। ইফতার বিতরণে প্রায় ৩০০ স্বেচ্ছাসেবক দায়িত্ব পালন করেন। পুরো আয়োজনজুড়ে লক্ষ্য করা যায় শৃঙ্খলা ও স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ।
জানা যায়, মিশনের প্রতিষ্ঠাতা খানবাহাদুর আহছানউল্লাহ (রহ.) ১৯৩৫ সালে প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তোলেন। তাঁর উদ্যোগেই রমজানে গণইফতারের সূচনা হয়। ১৯৫০ সাল থেকে বৃহৎ পরিসরে এই আয়োজন নিয়মিতভাবে পরিচালিত হয়ে আসছে। সময়ের ব্যবধানে আয়োজনের পরিধি বেড়েছে, তবে উদ্দেশ্য একই—মানুষকে এক কাতারে আনা।
দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত বাবুর্চি মো. মুক্তার হোসেন জানান, প্রায় ৪৮ বছর ধরে তিনি এখানে শিঙাড়া তৈরির কাজে আছেন। প্রতিদিন সাড়ে ৫ থেকে ৬ হাজার শিঙাড়া তৈরি করা হয়।
ইফতারে অংশ নেওয়া স্থানীয় শিক্ষক আবু হাসান বলেন, “এখানে সবাই একসঙ্গে বসে ইফতার করি। কোনো ভেদাভেদ নেই। এটা শুধু ইফতার নয়, আত্মিক প্রশান্তির জায়গা।”
মিশনের সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম জানান, দেশ-বিদেশের ভক্ত ও শুভানুধ্যায়ীদের আর্থিক সহযোগিতায় পুরো আয়োজন সম্পন্ন হয়। প্রতিদিন ইফতারের আগে ও পরে দেশের শান্তি, সমৃদ্ধি ও মুসলিম উম্মাহর কল্যাণ কামনায় বিশেষ মোনাজাত করা হয়।
স্থানীয়দের মতে, নলতা শরীফের এই গণইফতার শুধু ধর্মীয় আয়োজন নয়, সামাজিক সম্প্রীতি ও সাম্যের এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
Leave a Reply