বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট, জীবাশ্ম জ্বালানির ক্রমবর্ধমান ব্যয় এবং দেশের দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭ এ নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে অধিক বরাদ্দ, কর ও শুল্ক ছাড়, সহজ অর্থায়ন এবং কার্যকর নীতিগত সহায়তার দাবি জানিয়েছেন পরিবেশ ও উন্নয়নকর্মীরা।
এ উপলক্ষে রংপুরে অনুষ্ঠিত হয় “বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি: প্রাক-বাজেট প্রেস কনফারেন্স” শীর্ষক সংবাদ সম্মেলন। এতে বক্তারা বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে তেল, এলএনজি ও কয়লার মূল্যবৃদ্ধি, মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট এবং বিদ্যুৎ খাতে বাড়তে থাকা ভর্তুকির চাপ বাংলাদেশের জ্বালানি খাতকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।
বক্তারা উল্লেখ করেন, আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার কারণে দেশের অর্থনীতির ওপর চাপ বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয় বাড়ায় এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা ও ব্যবসা-বাণিজ্যের ওপর। একই সঙ্গে গ্যাস, কয়লা ও তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা বৈদেশিক মুদ্রার ব্যয় আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে গত এক দশকেরও বেশি সময়ে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে ক্যাপাসিটি পেমেন্ট বাবদ এক লাখ কোটি টাকার বেশি অর্থ পরিশোধ করতে হয়েছে, যা রাষ্ট্রীয় অর্থনীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করেছে।
বক্তারা বলেন, বাংলাদেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিপুল সম্ভাবনা থাকলেও সেই সম্ভাবনার যথাযথ ব্যবহার এখনো নিশ্চিত করা যায়নি। সৌরবিদ্যুৎ, সোলার ইরিগেশন, রুফটপ সোলার, এগ্রিভোল্টাইকস এবং ভাসমান সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প সম্প্রসারণের মাধ্যমে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা শক্তিশালী করা সম্ভব। পাশাপাশি নেট মিটারিং ব্যবস্থার বিস্তার এবং কমিউনিটি-ভিত্তিক নবায়নযোগ্য জ্বালানি উদ্যোগ গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে জাতীয় বাজেটে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে অধিক বরাদ্দ নিশ্চিত করা, সোলার প্যানেল, ব্যাটারি ও ইনভার্টারের আমদানি শুল্ক ও কর মওকুফ, স্বল্পসুদে ঋণ সুবিধা, সবুজ তহবিল গঠন এবং বিদ্যুৎ গ্রিড ব্যবস্থার আধুনিকায়নের দাবি জানানো হয়।
বক্তারা আরও বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের কার্বন বর্ডার অ্যাডজাস্টমেন্ট মেকানিজম (CBAM) কার্যকর হওয়ার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের রপ্তানিমুখী শিল্প খাতে সবুজ জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি অত্যন্ত জরুরি। শিল্প খাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো গেলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে এবং সম্ভাব্য কার্বন শুল্কের চাপ মোকাবিলা করা সহজ হবে।
তারা বলেন, বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতা প্রমাণ করেছে যে আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবস্থা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত ঝুঁকি সৃষ্টি করে। তাই জাতীয় বাজেট ২০২৬-২৭ এ নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে পরিবেশবান্ধব, টেকসই ও জনকল্যাণমুখী জ্বালানি রূপান্তর নিশ্চিত করতে হবে।
সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিষয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধি, নীতিনির্ধারকদের কাছে সুস্পষ্ট দাবি ও সুপারিশ তুলে ধরা, গণমাধ্যমে ইতিবাচক আলোচনা সৃষ্টি এবং স্থানীয় পর্যায়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক নতুন উদ্যোগকে উৎসাহিত করার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন আয়োজকরা।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন পরিবেশ ও উন্নয়ন সংস্থা ডপস-এর নির্বাহী পরিচালক উজ্জ্বল চক্রবর্তী, ফিড রংপুরের সভাপতি এস এম পিয়াল, পরিবেশ সুরক্ষা ফোরাম রংপুরের সদস্য সচিব ফরহাদুজ্জামান ফারুক এবং মানবাধিকার ও পরিবেশকর্মী কবির মিয়া।
Leave a Reply