দীর্ঘ ১০ মাস প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে সেন্টমার্টিন গেল ৩টি পর্যটকবাহী জাহাজ। পর্যটকদের জন্য থাকছে রাত্রিযাপনের সুযোগও। এজন্য মানতে ১২ টি নির্দেশনা। পরিবেশ রক্ষায় প্রতিদিন সর্বোচ্চ দুই হাজার পর্যটকের সিমা নির্ধারণ করেছে জেলা প্রশাসন। জাহাজগুলো হলো, কর্ণফুলী এক্সপ্রেস, এমভি বার আউলিয়া ও কেয়ারি সিন্দাবাদ। কক্সবাজার শহরের নুনিয়ারছড়াস্থ বিআইডব্লিউটি ঘাট থেকে এসব জাহাজ সেন্টমার্টিনের উদ্দেশ্য যাত্রা শুরু করেন।
সেন্টমার্টিন রুটের পর্যটকবাহী জাহাজ মালিকদের সংগঠন ‘সি ক্রুজ অপারেটর ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ’-এর সাধারণ সম্পাদক হোসাইন ইসলাম বাহাদুর বলেন, ” ৩ টি জাহাজ সেন্টমার্টিনের উদ্দেশ্য যাত্রা শুরু করে সকাল ৭ টায়। যাত্রী সংখ্যার বিষয়ে তিনি আরও বলেন, ‘দুই হাজারের অধিক কোনো টিকেট বিক্রি করা হবে না। সরকারি সিদ্ধান্ত মেনেই চলবে জাহাজ।”
মন্ত্রণালয়ের ১২টি নির্দেশনার মধ্যে অন্যতম হলো- বিআইডব্লিউটিএ এবং মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ছাড়া সেন্টমার্টিন দ্বীপে কোনো নৌযান চলাচলের অনুমতি পাবে না। পর্যটকদের অবশ্যই বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের স্বীকৃত ওয়েব পোর্টালের মাধ্যমে অনলাইনে টিকিট কিনতে হবে। প্রতিটি টিকিটে ট্রাভেল পাস এবং কিউআর কোড সংযুক্ত থাকবে। কিউআর কোড ছাড়া টিকিট নকল হিসেবে গণ্য হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সোমবার ( ১ ডিসেম্বর) থেকে পর্যটক নিয়ে দ্বীপের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে ৩টি জাহাজ। একইসঙ্গে আরও ৪টি জাহাজ প্রস্তুত রয়েছে। ম প্রশাসনের অনুমতি পাওয়ার পর এসব জাহাজ সের্ন্টমাটিনে চলাচলের প্রস্তুতি নেবেন৷ এসব কক্সবাজার শহরের নুনিয়ারছড়াস্থ বিআইডব্লিউটিএ-এর ঘাট থেকে শুরু করবেন। পরের দিন বেলা তিনটায় সেন্টমার্টিন থেকে সেই জাহাজ কক্সবাজারে ফিরে আসবে। আগামী ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত টানা দুই মাস পর্যটক নিয়ে সেন্টমার্টিনে জাহাজ চলাচল অব্যাহত থাকবে বলে জানায়। ঘাটে প্রস্তুত থাকা অপর ৪টি জাহাজ হলো- এমভি বে ক্রুজ, এমভি কাজল, কেয়ারী ক্রুজ অ্যান্ড ডাইন ও আটলান্টিক ক্রুজ।
এদিকে সেন্টমার্টিনের জাহাজ চলাচল শুরু হবে এই খবরে দ্বীপ জুড়ে চলছে আনন্দ। কটেজ এবং হোটেলগুলো সাজানো হচ্ছে।
সেন্ট মার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ফয়েজুর রহমান বলেন, ‘ দীর্ঘদিন পর্যটক না আসাতে পর্যটন ব্যবসায় ধস নেমেছিল। বেকার হয়ে গিয়েছে কয়েক হাজার মানুষ। এখন জাহাজের সাথে পর্যটক আসছে এমন খবরে দ্বীপজুড়ে খুশির জোয়ার বইছে।
সেন্টমার্টিনে মারমেইড রিসোর্ট’র স্বত্বাধিকারী মাহবুব উল্লাহ দৈনিক কক্সবাজারকে বলেন, ব্যবসায়ীদের বেশি ক্ষতি হয়েছে। এ ক্ষতি পুষিয়ে উঠার মত নয়। হোটেলগুলো দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় জিনিসপত্র নষ্ট হয়ে গেছে। এগুলো আবার সাজাতে হলে অনেক টাকার প্রয়োজন। এরপরেও পর্যটক আসবে এতে আমরা খুশি। বেকার হয়ে অনেক কাজ ফিরিয়ে পাবে।
জাহাজ চলাচলের অনুমতির বিষয়ে কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) মো. শাহিদুল আলম দৈনিক কক্সবাজারকে বলেন, “প্রথম ধাপে তিনটি জাহাজ সেন্টমার্টিনের উদ্দেশ্য ছেড়ে যাবে। এজন্য ১২ টি নির্দেশনা মেনে চলতে হবে। নিয়মের বাইরে গিয়ে কিছু করা যাবে না৷” তিনি বলেন, “দীর্ঘদিন মানুষের পদচারণ না থাকায় সেন্টমার্টিনে পরিবেশের আমূল-পরিবর্তন এসেছে। দিনেও দেখা মিলছে সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের। এগুলো বিনষ্ট করা যাবে না৷ এগুলো রক্ষা পেলে সেন্টমার্টিনের সৌন্দর্য দিন দিন বৃদ্ধি পাবে। এজন্য শর্ত মানতে হবে সকলকে।”
নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, পর্যটকদের ভ্রমণকালে রাতে সৈকতে আলো জ্বালানো, শব্দ সৃষ্টি বা বারবিকিউ পার্টি করা নিষিদ্ধ। কেয়াবনে প্রবেশ, কেয়া ফল সংগ্রহ বা ক্রয়-বিক্রয়, সামুদ্রিক কাছিম, পাখি, প্রবাল, রাজকাঁকড়া, শামুক-ঝিনুক ও অন্যান্য জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি করা কঠোরভাবে নিষেধ। এছাড়া সৈকতে মোটরসাইকেল, সি-বাইকসহ যেকোনো মোটরচালিত যানবাহন চলাচল সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকবে।
ভ্রমণকালে নিষিদ্ধ পলিথিন বহন করা যাবে না। একবার ব্যবহার্য প্লাস্টিক- যেমন চিপসের প্যাকেট, প্লাস্টিক চামচ, স্ট্র, সাবান ও শ্যাম্পুর মিনিপ্যাক, ৫০০ ও ১০০০ মিলিলিটারের প্লাস্টিক বোতল ইত্যাদি বহন নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। এছাড়া পর্যটকদের নিজস্ব পানির ফ্লাস্ক সঙ্গে রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজার জেলা কার্যালয়ের পরিচালক খন্দকার মাহমুদ পাশা বলেন, ” সেন্টমার্টিনে পরিবেশ রক্ষায় বেশকিছু নির্দেশনা দেওয়া আছে। জীববৈচিত্র্য রক্ষা ও পরিবেশের উপর যেন কোন প্রভাব না পড়ে সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। ” তিনি বলেন, “সেন্টমার্টিনের প্রকৃতি ফিরিয়ে আনতে অনেকদিন পর্যটক যাওয়া বন্ধ ছিল। এরমধ্যে সেখানে কাকড়া, কচ্ছপ, শামুকসহ সামুদ্রিক বহু প্রজাতির মাছের দেখা মিলেছে। এগুলো রক্ষা করতে হবে এবং সবাইকে আন্তরিকও হতে হবে। “
প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) এবং পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ছাড়া সেন্টমার্টিন দ্বীপে কোনো নৌযান চলাচল করতে পারবে না। পর্যটকদের অবশ্যই ট্যুরিজম বোর্ডের স্বীকৃত ওয়েব পোর্টালের মাধ্যমে অনলাইনে টিকিট কিনতে হবে। সেখানে প্রতিটি টিকিটে ট্রাভেল পাস এবং কিউআর কোড সংযুক্ত থাকবে। কিউআর কোড ছাড়া টিকিট নকল হিসেবে গণ্য হবে। দ্বীপে ভ্রমণের সময়সূচি এবং পর্যটক উপস্থিতিও এবার কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত থাকবে। নভেম্বর মাসে পর্যটকেরা শুধু দিনের বেলায় ভ্রমণ করতে পারবেন। রাত্রিযাপন করা যাবে না। ডিসেম্বর ও জানুয়ারি মাসে রাত্রিযাপনের অনুমতি থাকবে। ফেব্রুয়ারি মাসে দ্বীপে পর্যটক যাতায়াত সম্পূর্ণভাবে বন্ধ থাকবে। প্রতিদিন গড়ে দুই হাজারের বেশি পর্যটক দ্বীপে ভ্রমণ করতে পারবেন না।
Leave a Reply