কক্সবাজারের মহেশখালীতে বালুমহাল আইন উপেক্ষার অভিযোগ, স্কেভেটর দিয়ে চলছে মাটি-বালু কাটার কাজ।
চার ব্যক্তির নেতৃত্বে উত্তোলনের অভিযোগ; ইউএনও বললেন, ‘প্রমাণ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে সরকারি জমি।
অথচ দিনের আলোতেই সেখানে চলছে স্কেভেটর দিয়ে মাটি ও বালু কাটার কাজ। স্থানীয়দের অভিযোগ, কোনো বৈধ ইজারা বা অনুমোদনের কাগজপত্র ছাড়াই কক্সবাজারের দ্বীপ উপজেলা মহেশখালীর একটি সরকারি ছরা/জমি থেকে নিয়মিত বালু উত্তোলন করে বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করা হচ্ছে। এতে সরকারি সম্পদ লুটের পাশাপাশি পরিবেশ ও স্থানীয় জনজীবনের ওপরও বিরূপ প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ফিরোজ, জাহাঙ্গীর, সেলিমুল্লাহ ও শাহাদাত কবিরের নেতৃত্বে একটি চক্র স্কেভেটর ব্যবহার করে ওই স্থান থেকে বালু ও মাটি উত্তোলন করছে। প্রকাশ্যেই কার্যক্রম চললেও তা বন্ধে প্রশাসনের তৎপরতা না থাকায় প্রশ্ন তুলেছেন এলাকাবাসী।
তবে অভিযোগে নাম আসা ব্যক্তিদের বক্তব্য এ প্রতিবেদনের সময় পাওয়া যায়নি। তাঁদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে সংযুক্ত করা হতো।
বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০-এর ধারা ২(৭) অনুযায়ী, বালুমহাল হলো পরিবেশ অক্ষুণ্ন রেখে আহরণযোগ্য বালু বা মাটি থাকা সরকারি মালিকানাধীন উন্মুক্ত স্থান, চা-বাগানের ছড়া বা নদীর তলদেশ, যা আইন অনুযায়ী জেলা প্রশাসক কর্তৃক বালুমহাল হিসেবে ঘোষিত। অর্থাৎ কোনো সরকারি জায়গায় বালু থাকলেই ব্যক্তি বা গোষ্ঠী নিজেদের ইচ্ছামতো তা উত্তোলন করতে পারে না।
আইনের ধারা ১০(১) অনুযায়ী, বালুমহাল নির্ধারিত পদ্ধতিতে উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে ইজারা দেওয়ার বিধান রয়েছে। আর ধারা ১৩ অনুযায়ী বালুমহালের ইজারার মেয়াদ এক বছর—প্রতি বঙ্গাব্দের ১ বৈশাখ থেকে ৩০ চৈত্র পর্যন্ত।
তবে কোনো বালুমহাল ইজারা দেওয়া সম্ভব না হলে ধারা ১১ অনুযায়ী বিধি নির্ধারিত পদ্ধতিতে সরকারি রাজস্ব আদায়ের উদ্দেশ্যে খাস আদায়ের মাধ্যমে বালু বা মাটি উত্তোলন, পরিবহন, বিক্রি ও সরবরাহ করা যেতে পারে। ফলে বৈধ সরকারি প্রক্রিয়া ছাড়া বালু উত্তোলনের সুযোগ আছে কি না, সেটিই এ ঘটনায় গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
আইনের ধারা ৪-এ সরকারি মালিকানাধীন উন্মুক্ত স্থান, চা-বাগানের ছড়া বা নদীর তলদেশ থেকে বালু বা মাটি উত্তোলনের বিভিন্ন নিষিদ্ধ পরিস্থিতি উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার আশপাশ, নদীর তীর ভাঙনের আশঙ্কা, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা এবং নদীর প্রাকৃতিক পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য, ফসলি জমি বা উদ্ভিদের ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।
এ ছাড়া ধারা ৫-এ ভূগর্ভস্থ বালু বা মাটি পাম্প, ড্রেজিং বা অন্য কোনো মাধ্যমে উত্তোলনের ওপর নিষেধাজ্ঞা এবং নদীর তলদেশ থেকে বালু উত্তোলনের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট পদ্ধতি অনুসরণের বিধান রয়েছে।
বালু উত্তোলনের অভিযোগ প্রমাণিত হলে বিষয়টি শুধু প্রশাসনিক অনিয়ম হিসেবে সীমাবদ্ধ নাও থাকতে পারে। আইনের ধারা ১৫(১) অনুযায়ী, আইন লঙ্ঘন করে অথবা বালু-মাটি উত্তোলনের জন্য বিশেষভাবে ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া বালু বা মাটি উত্তোলন করলে অনূর্ধ্ব দুই বছর কারাদণ্ড অথবা সর্বনিম্ন ৫০ হাজার টাকা থেকে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড, অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে।
একই ধারায় অপরাধে ব্যবহৃত ড্রেজার, বালু বা মাটিবাহী যানবাহন কিংবা সংশ্লিষ্ট সামগ্রী সরকারের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করার বিধানও রয়েছে। অপরাধের বিচার নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের ভ্রাম্যমাণ আদালত বা বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হতে পারে।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, যে জায়গা থেকে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে সেটি সরকারি জমি। তবে জমিটির প্রকৃত মালিকানা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিসের মাধ্যমে মৌজা, দাগ, খতিয়ান, জমির শ্রেণি ও মালিকানার রেকর্ড যাচাই করা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে প্রশাসনের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে—স্থানটি ঘোষিত বালুমহালের অন্তর্ভুক্ত কি না, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কোনো বৈধ ইজারা রয়েছে কি না, ইজারা থাকলে তার মেয়াদ ও শর্ত কী এবং উত্তোলনের অনুমোদিত পরিমাণ কত।
স্থানীয়দের প্রশ্ন, যদি বৈধ ইজারা বা অনুমোদন না থাকে, তাহলে সরকারি জমি থেকে কার অনুমতিতে বালু তোলা হচ্ছে? উত্তোলিত বালু কোথায় যাচ্ছে? এর বিপরীতে সরকার কোনো রাজস্ব পাচ্ছে কি না?
অভিযোগের বিষয়ে মহেশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইমরান মাহমুদ ডালিমের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বালু উত্তোলনের বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না। তবে অভিযোগের প্রমাণ দেওয়া হলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।
ইউএনওর বক্তব্যের পর স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত ঘটনাস্থলে সরেজমিন পরিদর্শন করে অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা হোক। পাশাপাশি ভূমি অফিসের মাধ্যমে জমির মালিকানা এবং বালুমহাল ব্যবস্থাপনা-সংক্রান্ত নথি পরীক্ষা করা হোক।
স্থানীয় বাসিন্দারা সরকারি সম্পদ রক্ষায় দ্রুত অভিযান পরিচালনা, বালু উত্তোলনের বৈধতা যাচাই এবং অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
তাঁদের মতে, শুধু একটি অভিযান পরিচালনা করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। সরকারি জমি থেকে অনুমোদনহীন বালু উত্তোলন বন্ধে নিয়মিত নজরদারি, ভূমি রেকর্ড যাচাই এবং উত্তোলিত বালু পরিবহনে ব্যবহৃত যানবাহনের ওপর নজরদারি প্রয়োজন।
এখন দেখার বিষয়, স্থানীয়দের অভিযোগ ও ভিডিওর ভিত্তিতে উপজেলা প্রশাসন সরেজমিন তদন্ত করে কী তথ্য পায় এবং সরকারি জমি থেকে অনুমোদনহীন বালু উত্তোলনের অভিযোগের সত্যতা কতটা পাওয়া যায়।
Leave a Reply