লেখক ও সংগঠক এম.এ. সামাদ এর আত্নজীবনী
ভাষাসৈনিক সমগ্র দেশের সেরা বীমা ব্যক্তিত্ব লেখক ও সংগঠক এম.এ. সামাদ ১৯২৩ সালে সিলেটে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। এম.এ. সামাদের ছোটবেলা থেকেই লেখালেখির অভ্যাস ছিল। স্কুলের ছাত্র অবস্থায়ই তিনি স্কুল ম্যাগাজিনের সম্পাদক ছিলেন। তখনকার দিনে কলকাতা থেকে প্রকাশিত কবি নরেণ দেব সম্পাদিত ‘পাঠশালা’ ও ইংরেজী ‘মডার্ন স্টুডেন্ট’ কাগজে তিনি নিয়মিত লিখতেন। মডার্ন স্টুডেন্টের প্রবন্ধ প্রতিযোগিতায় তিনি ‘প্রথম পুরস্কার’ পেয়েছেন বহুবার। তিনি উপমহাদেশের সবচাইতে অভিজাত বিদ্যাপীঠ কলকাতার প্রেসিডেন্সী কলেজ থেকে ১৯৪৫ সালে কৃতিত্বের সাথে সম্মানসহ বি.এ. ডিগ্রী লাভ করেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে সর্বোচ্চ নম্বর পেয়ে স্বর্ণপদকসহ বহু পুরস্কারে ভূষিত হন তিনি। এরপর তিনি ‘অল ইন্ডিয়া রেডিও’ নয়াদিল্লীতে সংবাদপাঠ ও অনুবাদকের কাজ করেন। বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে জনাব সামাদের সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। চট্টগ্রাম থাকাকালে তিনি বহুদিন চট্টগ্রাম কৃষ্টিকেন্দ্রের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ১৯৪৭ সালে জনাব সামাদ অল ইন্ডিয়া রেডিও থেকে বদলী হয়ে ঢাকায় রেডিও পাকিস্তানে বাংলা সংবাদ বিভাগের দায়িত্বে নিযুক্ত হন। ঠিক সেই সময় বাংলা ভাষার উপর উর্দু চাপিয়ে দেওয়ার পাকিস্তানী শাসকবর্গের চক্রান্ত শুরু হয়। এই চক্রান্তের বিরোধিতা করে তিনি ১৯৪৮ সালের ডিসেম্বরে রেডিওর চাকুরিতে ইস্তফা দেন। ১৯৪৯ সালে ‘মিনার’নামে শিশু কিশোরদের জন্য একটি প্রগতিশীল মাসিক পত্রিকা প্রকাশ করেন। ১৯৫১ সালে যখন বীমা জগৎ অন্ধকারে আচ্ছন্ন তখন তরুণ আজিজুস সামাদ এক টুকরো আলো হাতে সেই অন্ধকারাচ্ছন্ন বীমা ব্যবসার সামাজিক অসম্মান ঘুচিয়ে ছিলেন। বীমা যে একটি সম্মানজনক ব্যবসা এই প্রত্যয় দৃঢ় হলো তাঁর অদম্য প্রচেষ্টায়। আজ যে বীমা জগতের সামাজিক মর্যাদা এবং অর্থনৈতিক প্রগতি তার অগ্রপথিক এম এ সামাদ। বীমার উপর এদেশের সর্বাধিক গ্রন্থ লিখেছেন তিনি এবং এই গ্রন্থগুলো তার জন্য বয়ে এনেছে অনেক আন্তর্জাতিক সম্মান। ইউনাইটেড নেশনস এর আঙ্কটাডের বীমা অভিজ্ঞদের নামের তালিকায় তাঁর নাম অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে। আন্তর্জাতিকভাবে তিনি এ পেশায় সম্মানিত হয়েছেন। বাংলাদেশের একমাত্র বীমা শিক্ষার ট্রেনিং প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ইনসিওরেন্স একাডেমীর তিনিই প্রতিষ্ঠাতা ডিরেক্টর। স্বাধীনতার পর তিনি সুরমা জীবনবীমা কর্পোরেশনের চেয়ারম্যান নিযুক্ত হন। এরপর তিনি বাংলাদেশ জীবন বীমা কর্পোরেশনের ম্যানেজিং ডিরেক্টর নিযুক্ত হন। ১৯৮৪ সালে তিনি ম্যানেজিং ডিরেক্টরের পদ থেকে অবসর গ্রহণ করেন। এর পরপরই ১৯৮৫ সালে বাংলাদেশের বেসরকারী খাতে প্রথম বীমা প্রতিষ্ঠান ‘বাংলাদেশ জেনারেল ইনসিওরেন্স কোম্পানী’ (বিজিআইসি) প্রতিষ্ঠা করেন এবং সেই কোম্পানীর ম্যানেজিং ডিরেক্টরের পদে অধিষ্ঠিত হন। এরপর এই কোম্পানীর ম্যানেজিং ডিরেক্টর এবং চেয়ারম্যান উভয় পদে নিযুক্ত হন। ২০০৪ সালে বিজিআইসি’র ম্যানেজিং ডিরেক্টরের পদ হতে অবসর গ্রহণ করেন এবং ২০০৫ সালের ১৭ই অক্টোবর তাঁর মৃত্যুর দিন পর্যন্ত বিজিআইসি’র চেয়ারম্যান পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। চল্লিশ দশকের শেষের দিকে তাঁর সহধর্মিনী বেগম ফওজিয়া সামাদের সম্পাদনায় তিনি বের করেছিলেন শিশু কিশোরদের জন্য এক ব্যতিক্রমধর্মী কিশোর মাসিক ‘মিনার’। বিভিন্ন জেলায় যাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল শিশু কিশোরদের প্রতিষ্ঠান ‘চাঁদেরহাট’। জীবনের সব কর্মধারাকে একই স্রোতে মিলানো এক কঠিন প্রয়াসসাধ্য ব্যাপার। যিনি পারেন তিনি একজন সিলেটের কৃতি সন্তানই নন সংগঠকও বটে, একজন সার্থক জীবনশিল্পীও।
Leave a Reply